গাজার উদ্দেশে আবার যাত্রা করবে ‘গ্লোবাল সুমুদ ফোটিলা’

- পশ্চিমতীরে ৩২ ফিলিস্তিনি আটক বাড়ি ধ্বংস

- ইসরাইলের জেল থেকে ফিরল ৫৪ ফিলিস্তিনির লাশ

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছে দিতে আগামী ২৯ মার্চ স্পেনের বার্সেলোনা থেকে আবার যাত্রা শুরু করবে ‘গ্লোবাল সুমুদ’ এইড ফোটিলা। বৃহস্পতিবার দণি আফ্রিকার জোহানেসবার্গে আয়োজিত এক অনলাইন সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেয়া হয়। খবর আনাদোলু এজেন্সির।

গ্লোবাল সুমুদের কর্মী সুমেইরা আকদেনিজ অর্দু জানান, এবারের যাত্রা হবে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত ও আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণে সমৃদ্ধ। তিনি বলেন, ‘বার্সেলোনা থেকে যাত্রা শুরু করে বহরটি তিউনিসিয়া, ইতালি এবং ভূমধ্যসাগরের আরো কয়েকটি বন্দর হয়ে গাজার দিকে অগ্রসর হবে।’ সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো জানান, এবারের অভিযানে হাজারো মানুষ অংশ নেবেন, যাদের মধ্যে এক হাজারের বেশি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী থাকবেন। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব নির্মাণ বিশেষজ্ঞ (ইকো-বিল্ডার) এবং যুদ্ধাপরাধ তদন্তকারীরাও এই বহরে যুক্ত থাকবেন, যা আগের অভিযানের তুলনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন সংযোজন। আয়োজকদের মতে, গাজায় চলমান মানবিক সঙ্কট, স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিপর্যয় এবং বেসামরিক মানুষের দুর্ভোগ বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরাই এই অভিযানের মূল ল্য। একই সাথে অবরোধের মধ্যে থাকা গাজায় জরুরি চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তা পৌঁছে দেয়ার ওপর জোর দেয়া হবে। গ্লোবাল সুমুদ কর্তৃপ আশা করছে, এই বহর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করবে এবং গাজায় মানবিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে চাপ তৈরি করবে।

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত

যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি সেনাবাহিনীর হামলা অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ হামলায় দণি গাজার খান ইউনুসে এক ফিলিস্তিনি নিহত এবং একজন নারী আহত হয়েছেন বলে স্বাস্থ্য সূত্র ও প্রত্যদর্শীর বরাতে জানিয়েছেন আনাদোলু এজেন্সি। খান ইউনুসের পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে একজন ফিলিস্তিনি নিহত হন। একই এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের জন্য স্থাপিত তাঁবু ল্য করে হামলা চালানো হলে ২৮ বছর বয়সী আয় খাদের বুরেইহ নামের এক নারী আহত হন। প্রত্যদর্শীরা জানান, ওই সময় হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো হয় এবং উপকূলীয় এলাকায় নৌযান থেকেও গোলাবর্ষণ করা হয়। এ দিকে গাজা সিটির তুফাহ এলাকায় ইসরাইলি বিমান হামলায় বেশ কয়েকটি ভবন ও স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকাতেও বিমান হামলার খবর পাওয়া গেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় ৫৫৬ জন নিহত এবং প্রায় এক হাজার ৫০০ জন আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মহল যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুললেও হামলা বন্ধে কার্যকর কোনো পদপে দেখা যাচ্ছে না

নিহত বেড়ে ২৪

গত বুধবার থেকে গাজা উপত্যকার বিভিন্ন এলাকায় দখলদার বাহিনীর হামলায় অন্তত ২৪ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। চিকিৎসা সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা। নিহতদের মধ্যে একাধিক শিশু রয়েছে বলে জানিয়েছে সূত্রগুলো। তাদের মধ্যে ১১ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুও রয়েছে। গাজা সিটির তুফফাহ ও জেইতুন এলাকায় ইসরাইলি গোলাবর্ষণে অন্তত ১৪ জন নিহত হন। দণি গাজার খান ইউনুসের দেিণ কিজান আবু রাশওয়ান এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের আশ্রয় নেয়া তাঁবুতে হামলায় আরো চারজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া আল-মাওয়াসি উপকূলীয় তাঁবু শিবিরে ইসরাইলি বিমান হামলায় আরো দুইজন নিহত হন। ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি জানিয়েছে, নিহতদের একজন ছিলেন জরুরি সেবাকর্মী হুসেইন হাসান হুসেইন আল-সুমাইরি। খান ইউনিস থেকে আলজাজিরার প্রতিবেদক তারেক আবু আজ্জুম জানান, গাজা সিটিতে একাধিক আবাসিক ভবনে কোনো পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই সরাসরি ল্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তারেক আবু আজ্জুম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত ‘অস্ত্রবিরতি’ কার্যকর থাকার কথা থাকলেও এসব হামলার ফলে গাজার ফিলিস্তিনিরা কোনো ধরনের স্বস্তি পাচ্ছেন না। গত কয়েক ঘণ্টায় গাজাজুড়ে ইসরাইলের মরণ ছোবল হঠাৎ বেড়েছে। আমরা আকাশে ইসরাইলি ড্রোনের শব্দ শুনতে পাচ্ছি, যা আরো হামলার আশঙ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছে।’

প্রায় চার মাস আগে ‘অস্ত্রবিরতি’ কার্যকর হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় ৫২০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর আগ্রাসন শুরুর পর থেকে ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৭১ হাজার ৮০০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসঙ্ঘের একটি তদন্ত কমিশন গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা চলমান রয়েছে।

ইসরাইলের জেল থেকে ফিরল ৫৪ ফিলিস্তিনির লাশ

ইসরাইলের জেলে থাকা ৫৪ ফিলিস্তিনির লাশ এবং মানব দেহাবশেষসংবলিত ডজনখানেক বাক্স ফেরত দিয়েছে দখলদার দেশটি। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) মাধ্যমে গাজায় লাশ হস্তান্তর করা হয়েছে। সূত্র টিআরটি ওয়ার্ল্ড। বুধবার এক বিবৃতিতে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রেড ক্রসের যানবাহনে ৫৪টি লাশ ও মানব দেহাবশেষ থাকা ৬৬টি বাক্স গাজার আল-শিফা মেডিক্যাল কমপ্লেক্সে পৌঁছেছে।

খবরে বলা হয়েছে, লাশ পৌঁছানোর সাথে সাথেই চিকিৎসা দল অনুমোদিত চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ করে ফরেনসিক প্রক্রিয়া শুরু করে। এই প্রক্রিয়া শেষ হলে নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী নিহতদের পরিবারগুলো লাশ শনাক্ত করার সুযোগ পাবে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপ ও বিশেষায়িত কমিটির সমন্বয়ে লাশগুলোর পরীা-নিরীা ও নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের মতে, ১০ অক্টোবর কার্যকর হওয়া ধাপে ধাপে যুদ্ধবিরতি চুক্তি ইসরাইলের ধারাবাহিক লঙ্ঘনের মধ্যেই এই লাশ হস্তান্তরের ঘটনা ঘটেছে।

পশ্চিমতীরে ইসরাইলি অভিযানে ৩২ ফিলিস্তিনি আটক, আরো একটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ধ্বংস

অধিকৃত পশ্চিমতীরজুড়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর অভিযানে অন্তত ৩২ জন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। ফিলিস্তিনি বন্দিবিষয়ক প্রেস অফিস এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির। আটকদের মধ্যে হেবরনের সাবেক আইনপ্রণেতা হাতিম কাফিশেহ, এক শিশু এবং আগে মুক্তি পাওয়া বন্দীরাও রয়েছেন। অভিযানের সময় সেনারা বাড়িঘরে তল্লাশি চালিয়ে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সংস্থাটি বলছে, এসব অভিযান ফিলিস্তিনিদের ওপর সম্মিলিত শাস্তি প্রয়োগের অংশ। অক্টোবর ২০২৩ থেকে গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিমতীর ও পূর্ব জেরুসালেমে অভিযান, গ্রেফতার ও সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফিলিস্তিনি সূত্র অনুযায়ী, এই সময়কালে হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং কয়েক হাজার আহত হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইসরাইলি বাহিনীর এই অভিযানকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করেছে।

তা ছাড়া অধিকৃত পশ্চিমতীরের বেইত আওয়াওয়া শহরে আরো একটি ফিলিস্তিনি বাড়ি ধ্বংস করেছে ইসরাইলি বাহিনী। প্রত্যদর্শীরা জানান, অভিযানের সময় এলাকাটির প্রবেশ ও বহির্গমন পথ বন্ধ করে দেয়া হয়। খবর আনাদোলু এজেন্সির। ধ্বংস হওয়া বাড়িটি মুহাম্মদ আভনি আল-সুয়েইতির মালিকানাধীন বলে জানা গেছে। প্রায় ৬০০ বর্গমিটার আয়তনের দুইতলা ভবনটির নিচতলায় দোকান ছিল এবং ওপরের তলা নির্মাণাধীন ছিল। ইসরাইল কর্তৃপ ‘অনুমতির অভাব’ দেখিয়ে বাড়িটি ভেঙে ফেলে। পিএলওর ওয়াল অ্যান্ড সেটেলমেন্ট রেজিস্ট্যান্স কাউন্সিলের তথ্যে জানা গেছে, গত মাসে ইসরাইল ৫৯টি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, যাতে ১২৬টি স্থাপনা তিগ্রস্ত হয়েছে। ফিলিস্তিনিরা বলছেন, এসব ধ্বংসযজ্ঞ পরিকল্পিতভাবে ভূমি দখল ও বাস্তুচ্যুত করার অংশ।

রাফাহ সীমান্তে গাজায় ফেরা ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতন

দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর রাফাহ সীমান্ত আংশিকভাবে আবার খোলার পর গাজায় ফিরতে গিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। প্রত্যদর্শী ও ভুক্তভোগীদের বর্ণনায় উঠে এসেছে চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ, শারীরিক নিপীড়ন, অপমান এবং ব্যক্তিগত সামগ্রী জব্দ করার ঘটনা। সূত্র মিডলিস্ট আই। ৫৭ বছর বয়সী হৃদরোগী হুদা আবু আবেদ বলেন, মিসরে চিকিৎসা শেষে গাজায় ফেরার সময় তিনি কেবল দীর্ঘ অপোর আশঙ্কা করেছিলেন; কিন্তু বাস্তবে তাকে চোখ বেঁধে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তার মেয়েকে মারধর করা হয়। তার ও অন্যান্যের ওষুধ, মোবাইল ফোন, এমনকি শিশুদের খেলনাও জব্দ করা হয়। নতুন ব্যবস্থায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের সীমান্ত সহায়তা মিশনের তত্ত্বাবধানে যাত্রীদের তল্লাশি করা হলেও, শেষ সিদ্ধান্ত আসে ইসরাইলি কর্তৃপরে কাছ থেকে। ভুক্তভোগীরা জানান, নিজেদের দেশেই প্রবেশের জন্য তাদের ইসরাইলের অনুমোদনের অপো করতে হয়েছে। অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী সীমান্ত খোলার কথা থাকলেও ইসরাইল কঠোর কোটা আরোপ করেছে। প্রতিদিন মাত্র ৫০ জন গাজায় ফিরতে পারছেন, ফলে কায়রোতেই নিবন্ধিত ৩০ হাজার মানুষের ফিরতে প্রায় দুই বছর লেগে যাবে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, এই আচরণ ফিলিস্তিনিদের মানসিকভাবে ভেঙে দিয়ে গাজা ছাড়তে বাধ্য করার কৌশলের অংশ। তবে ইসরাইলি কর্তৃপ এসব অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।