সতর্ক থাকার অনুরোধ বাংলাদেশ দূতাবাসের
ইরাকে বাংলাদেশীদের নামে জাল ভিসা তৈরি করছে অসাধু চক্র
Printed Edition
বৈধভাবে বাংলাদেশী কর্মীদের যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে রয়েছে দীর্ঘদিন থেকেই। বিচ্ছিন্নভাবে জনশক্তি ব্যুরো থেকে মাঝেমধ্যে কিছু শ্রমিক যাচ্ছে। তবে বৈধভাবে দেশটিতে কর্মী না পাঠিয়ে মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যরা ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ একাধিক দেশ ব্যবহার করে নানা কৌশলে অসহায় বাংলাদেশীদের ইরাকে নিয়ে যাচ্ছে হরহামেশাই। আর অবৈধভাবে পাড়ি জমানো বাংলাদেশের জন্য জাল ভিসার কাগজ তৈরি করতে প্রতারক চক্র ইরাকের বাংলাদেশ দূতাবাসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নাম, জাল প্যাড, সিল ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
ইতোমধ্যে এই চক্রের অপতৎরপতা সম্পর্কে জানতে পেরে ইরাকের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে বাংলাদেশীদের সতর্কবার্তা দিয়ে এই চক্রের খপ্পড় থেকে সাবধান থাকতে অনুরোধ জানানো হয়েছে। এই মুহুর্তে বাংলাদেশের বৈধ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইনসহ অনেক দেশে কর্মী যাওয়া বন্ধের সুযোগে মানবপাচারকারী চক্র দেদারসে ইরাকে অবৈধভাবে লোক পাঠানোর (আদম পাচার) তৎপরতা চালাচ্ছে অহরহ। তারপরও যারা চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে সেই থানা পুলিশ এদের বিষয়ে অনেকটাই নির্বিকার বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ দিকে ইরাকের বাংলাদেশ কমিউনিটির সদস্যদের নিয়ে গড়ে তোলা একটি অরাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, দূতাবাসের ইচ্ছাতেই নাকি বৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে কর্মী আনার পথ বন্ধ রাখা হয়েছে। এ ছাড়াও আরো বেশকিছু অভিযোগ উল্লেখ করে সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টার কাছে লিখিত অভিযোগ পাঠানো হয়েছে। বাংলাদেশ কমিউনিটি নেতাদের দাবি দূতাবাসে বর্তমানে রাষ্ট্রদূতের অনুপস্থিতিতে যারা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূতসহ অন্যান্য দায়িত্বে আছেন তাদের বেশির ভাগই ফ্যাসিস্ট সরকার আওয়ামী লীগের চিহ্নিত দোসর। তাদের না সরালে ইরাকের বাংলাদেশ দূতাবাসের কার্যক্রমে স্বাভাবিক গতি ফিরবে না।
গতকাল মঙ্গলবার ইরাকের (স্থানীয় সময়) বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানানো হয়, সে দেশে অবস্থানরত সব বাংলাদেশীকে জানানো যাচ্ছে, কিছু অসাধু চক্র দূতাবাস কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ও সিল নকল করে জাল ভিসার কাগজ তৈরি করছে। ভিসাসংক্রান্ত বিষয় যাচাই না করে এব অসাধু চক্রের প্রলোভনে সাড়া না দিতে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দেয়া হলো। এ ছাড়া এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্যর জন্য প্রবাসী বাংলাদেশীদের দূতাবাসের মোবাইল নম্বরে (০৭৭৫৮৮২৭৭৭১) যোগাযোগ করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো। দূতাবাসের পক্ষ থেকে এমন তথ্য দিয়ে সতর্ক করায় আসলাম হোসেন নামে এক প্রবাসী বাংলাদেশী তার মন্তব্য বলেছেন, আমরা দালাল মুক্ত ইরাক চাই। আমরা প্রবাসীরা দূতাবাসের পাশে আছি। ইনশাহআল্লাহ।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকার ফকিরাপুলকেন্দ্রিক একটি মানবপাচারকারী চক্র দীর্ঘদিন থেকেই অবৈধপথে ইরাকে লোক পাঠানোর নামে গ্রামের অসহায় মানুষের সাথে প্রতারণা করে আসছে। দালালদের মাধ্যমে সংগ্রহ করা এসব মানুষ বৈধপথে বিদেশ যেতে ঢাকায় এলেও এই চক্রের সদস্যরা তাদের কাছ থেকে টাকা আদায় করে নানা ছুতায় বৈধপথে বিদেশে না পাঠিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কিছু ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ম্যানেজ করে বডি কন্ট্রাক্টের মাধ্যমে উড়োজাহাজে উঠানোর ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। অভিযোগ আছে, যাত্রীরা ঢাকার এয়ারপোর্ট পার হওয়ার পরই জানতে পারেন তারা প্রতারক ও মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়েছেন। এরপর একপর্যায়ে দুবাই বিমানবন্দর হয়ে তারা দেখতে পান ইরাকের রাজধানী বাগদাদে গেছেন। তখন আর তাদের কিছুই করার থাকে না। পরে এসব অবৈধ মানুষই অনেক চেষ্টা করে ইরাকের কন্সট্রাকশনসহ বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ নেন এবং ডলারে বেতন পাওয়া শুরু করেন। কিন্তু তারা অনেক চেষ্টা করেও দেশটিতে বৈধ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না। তাদের বৈধ করতেই ইরাকে বাংলাদেশীদের নিয়ে গড়ে ওঠে জালিয়াতি চক্র। তারাই এখন ভিসার কাগজ তৈরি করতে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সই সিল জাল করার চেষ্টা করছে।
এ দিকে গত ১৪ এপ্রিল ইরাকস্থ বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ সংস্থা নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে ‘ইরাকের বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত ফ্যাসিবাদী স্বৈরাচার দোসরদের দ্রুত প্রত্যাহার এবং দক্ষ, যোগ্য, সৎ দেশপ্রেমিক কর্মকর্তা নিয়োগ এবং সংস্কারের” আবেদন জানিয়ে সম্প্রতি ৪৮ জন ভুক্তভোগী ইরাক প্রবাসীর নাম ও টেলিফোন নম্বর উল্লেখ করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টার কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। বাংলাদেশ প্রবাসী কল্যাণ সংস্থার সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম মজিদ স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশ দূতাবাসে এখনো স্বৈরাচারের দোসররা কর্মরত আছেন। যাদের কারণে প্রবাসীরা প্রতিনিয়ত নিপীড়িত এবং প্রয়োজনীয় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আমরা প্রবাসীদের শুধু একটি ট্রাভেল ডকুমেন্ট (আউটপাস) পেতে দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তারপরও সবাই পায় না। শুধু তারাই পায়, যারা কর্মকর্তাদেরকে খুশি করতে পারেন। পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়াতে কিংবা নতুন পাসপোর্টের জন্য দূতাবাসে আবেদন করতে গেলে প্রতিনিয়ত সমস্যা হয়। মৃত শ্রমিকদের লাশ দেশে পাঠাতে সহযোগিতা তো দূরের কথা উল্টো অমানবিক নানা সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। অভিযোগে আরো বলা হয়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ দূতাবাসের ভুল তথ্য সম্বলিত একটি চিঠির কারণে ইরাকি সরকার বাংলাদেশীদের কালো তালিকাভুক্ত করে। যার কারণে বাংলাদেশের শ্রমবাজারটি তারা বন্ধ ঘোষণা করে দেয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মন্ত্রিসভার রেজুলেশন অনুযায়ী বাংলাদেশী কর্মীদের প্রবেশরোধের বিষয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংস্থাটির দাবি, ইরাকে অনেক বাংলাদেশী কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে মোট ৪৭ জন বিএমইটির স্মার্টকার্ড নিয়ে ইরাকে গেছেন। এরমধ্যে জানুয়ারি মাসে ৪০ জন এবং ফেব্রুয়ারি মাসে গেছেন সাতজন।