আইনের ফাঁক গলে পাহাড়-টিলা সাবাড়

আবুল কালাম
Printed Edition
  • ২০ বছরে ২৫ শতাংশ নিশ্চিহ্ন
  • বাড়ছে ভূমিধসের ঝুঁকি, প্রাণহানি
  • সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত সিলেট-চট্টগ্রাম

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আইন ও প্রশাসনিক নজরদারির দুর্বলতার সুযোগে নির্বিচারে পাহাড়-টিলা কেটে সমতল করা হচ্ছে। পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি-বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত ২০ বছরে দেশের প্রায় ২৫ শতাংশ পাহাড় ও টিলা কেটে ফেলা হয়েছে। এতে ভূমিধসের ঝুঁকি প্রতি বছর ৪০০ শতাংশ হারে বাড়ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। এরই মধ্যে ভূমিধসে প্রাণহানি, নদী-খাল ভরাট, জলাবদ্ধতা, বন ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো সঙ্কট তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও সিলেট। শুধু সিলেট অঞ্চলে গত তিন দশকে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ আদি টিলা নিশ্চিহ্ন হয়েছে। এ দিকে গত ছয় বছরে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভূমিধসে ৭০০-এর বেশি মানুষের মৃত্যু এবং হাজার হাজার পরিবারের বাস্তুচ্যুত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থা, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ পাহাড় ও টিলা টিকে আছে। এর বড় অংশ পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম এলাকায়। তবে টিলা কাটার ক্ষেত্রে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে সিলেট অঞ্চল।

সিলেটে নিশ্চিহ্ন অর্ধেক টিলা

সিলেট বিভাগীয় পরিবেশ অধিদফতর ও বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) বিভিন্ন সময়ের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত তিন দশকে সিলেট অঞ্চলের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ টিলা কেটে ফেলা হয়েছে। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি খতিয়ানভুক্ত প্রায় এক হাজার ৮৭৫টি টিলা টিকে আছে। এসব টিলার মোট আয়তন প্রায় চার হাজার ৮১১ একর।

সিলেট নগর ও আশপাশের এলাকায় গত ১০ বছরেই আবাসন প্রকল্পের জন্য শতাধিক টিলা নিশ্চিহ্ন হয়েছে। আবাসন প্রকল্প ও ইটভাটায় মাটির জোগান, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সড়ক ও সরকারি স্থাপনা নির্মাণেও টিলা কাটা হচ্ছে। পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা ছাড়াই এসব কাজের অভিযোগ রয়েছে।

চট্টগ্রামে বাড়ছে পাহাড় কাটার এলাকা

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালে চট্টগ্রামে পাহাড় কাটার এলাকা ছিল ৬৭৯ হেক্টর। ২০২৬ সালের প্রাক্কলনে তা বেড়ে দুই হাজার হেক্টরের বেশি হয়েছে। বায়েজিদ, খুলশী ও আকবরশাহ এলাকায় পাহাড় কাটার তীব্রতা ৪৭ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বলে তথ্যটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। পাহাড়ের মাটি ও বালু বৃষ্টির পানিতে কর্ণফুলী নদীতে গিয়ে পড়ায় নদীর তলদেশ ভরাট ও নগরের নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে।

কক্সবাজারের ৫১টি পাহাড়ে প্রায় ২২ হাজার অবৈধ বসতি রয়েছে। এসব এলাকায় কয়েক লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাস করছেন। ২০০৮ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত পাহাড়ধসে সেখানে ৩১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৬ সালের জুলাইয়ে এক সপ্তাহের ভারী বৃষ্টিতে ২২ জনের প্রাণহানি ঘটে।

সিলেট ও মৌলভীবাজারে নগরায়ণ ও ইটভাটার কারণে বহু টিলা হারিয়ে গেছে। পাহাড়ের মাটি নদীতে গিয়ে পড়ায় সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এতে বন্যা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে। টিলার পাদদেশে আড়াই শতাধিক পরিবার ধসের ঝুঁকিতে রয়েছে।

আইনের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন

স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর (সংশোধিত ২০১০) নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় রাতের আঁধারে, এমনকি প্রকাশ্যেও পাহাড়-টিলা কাটা হচ্ছে। মাঝেমধ্যে অভিযান ও জরিমানা হলেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। পরিবেশবাদীরা বলছেন, শুধু শ্রমিক বা ট্রাকচালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে অর্থায়নকারী ও প্রভাবশালী চক্রকে আইনের আওতায় আনতে হবে।

পরিবেশ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক মো: মাহমুদুল হাসান পাপন নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে ভূমিধস, জীববৈচিত্র্য ধ্বংস, জলাবদ্ধতা ও নদী ভরাটের মতো সমস্যা বাড়ছে। পাহাড়ের মাটির বাঁধন দুর্বল হয়ে বর্ষায় আকস্মিক ধসের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সাথে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় প্রাণীরা লোকালয়ে চলে আসছে এবং স্থানীয় তাপমাত্রাও বাড়ছে।