নতুন বাজেটে তরুণদের প্রত্যাশা কি পূরণ হবে

হারুন ইসলাম
Printed Edition
  • এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ চালুর সিদ্ধান্ত
  • ডিজিটাল অর্থনীতিতে গুরুত্বারোপ
  • বাস্তবায়ন নিয়েই ধোঁয়াশা

বাংলাদেশের তরুণ সমাজের অন্যতম প্রধান সঙ্কট এবং দীর্ঘদিনের উৎকণ্ঠার নাম বেকারত্ব। উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করতে গিয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও হতাশার মুখে পড়ছেন লাখো চাকরিপ্রত্যাশী। প্রতি বছর প্রায় ২০ লাখের বেশি তরুণ-তরুণী শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরির বাজারে প্রবেশ করলেও, সরকারি ও বেসরকারি খাতে আনুপাতিক হারে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হওয়ায় একটি বিশাল অংশ বেকার থেকে যাচ্ছেন। এমন একটি উদ্বেগজনক প্রেক্ষাপটে বেকারত্বের ঊর্ধ্বমুখী হার নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন জাতীয় বাজেট।

গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট পেশ করেন। ‘অর্থনৈতিক গণতান্ত্রিকীকরণ ও বিকেন্দ্রীকরণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির পথে বাংলাদেশ’ শীর্ষক থিমের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত এই বাজেটের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে। তবে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ এই বাজেটে চাকরিপ্রত্যাশী তরুণদের জন্য যেসব নতুন পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, তা বাস্তবে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে এবং এটি তরুণদের প্রত্যাশা পূরণে কতটুকু সক্ষম হবে, তা নিয়ে গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

বাংলাদেশ বর্তমানে জনসংখ্যার জনমিতিক লভ্যাংশ বা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর যুগে অবস্থান করছে। দেশের কর্মক্ষম মানুষের হার এখন সর্বোচ্চ। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে উৎপাদনশীল খাতে কাজে লাগানো না গেলে তা অর্থনীতির জন্য ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তরুণরাও মেধা, সততা ও দক্ষতাকে নিয়োগের মাপকাঠি হিসেবে ধরে এমন একটি বাজেট প্রত্যাশা করেছিলেন, যা বাস্তবে কাজের সুযোগ তৈরি করবে। এই দাবির প্রেক্ষিতে অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে ২৫ লাখের বেশি নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করা হবে। এই উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য পূরণের জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল প্রণোদনা তহবিল গঠন করা হয়েছে।

গতানুগতিক চাকরির পেছনে না ছুটে বর্তমান প্রজন্মের অনেক তরুণই নিজস্ব ব্যবসা বা উদ্যোগ গ্রহণে আগ্রহী। কিন্তু মূলধনের অভাব তাদের এই স্বপ্নকে শুরুতেই বাধাগ্রস্ত করে। এবারের বাজেটে এই শ্রেণীর তরুণদের প্রতি বিশেষ নজর দিয়ে বেশ কিছু প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাতের উদ্যোক্তাদের জন্য দুই হাজার কোটি টাকার একটি সহায়তা তহবিল প্রস্তাব করা হয়েছে। নতুন উদ্যোক্তাদের মূলধন জোগাতে ২২৫ কোটি টাকার ‘উদ্যোক্তা উন্নয়ন তহবিল’ গঠন করা হয়েছে।

অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) অব্যবহৃত প্লটগুলো দ্রুত তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে বরাদ্দের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

তহবিল ঘোষণার এই বিষয়টিকে অনেকেই ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে তরুণ উদ্যোক্তারা বাস্তবমুখী কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেছেন।

ওয়াসিম শেখ নামে এক তরুণ ই-কমার্স উদ্যোক্তা গণমাধ্যমকে জানান, বাজেটে ফান্ডের কথা বলা হলেও, বাস্তবতা হলো জামানত ছাড়া ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া এখনো অনেক কঠিন। এই দুই হাজার কোটি টাকার এসএমই ফান্ডের টাকা যদি সহজ শর্তে ও লাল ফিতার দৌরাত্ম্য ছাড়া পাওয়া যায়, তবেই তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমানে একটি বড় সংখ্যক তরুণ অনলাইনে ফ্রিল্যান্সিং এবং ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি করে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। প্রযুক্তি খাতের এই নীরব বিপ্লবকে উৎসাহিত করতে বাজেটে যুগান্তকারী কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং ও কন্টেন্ট ক্রিয়েশন থেকে অর্জিত আয়কে সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে প্রতি বছর দুই লাখ নতুন চাকরি তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ফ্রিল্যান্সিং ও সৃজনশীল শিল্পের মাধ্যমে আরো আট লাখ পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে। আইসিটি খাতের সার্বিক উন্নয়নে বাজেটে আলাদাভাবে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে।

চাকরিপ্রার্থীদের তথ্যগত সঙ্কট এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় সমন্বয়হীনতা দূর করতে সরকার প্রথমবারের মতো জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ বা কর্মসংস্থান বিনিময় কর্মসূচি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এর আওতায় স্থানীয় বেকার তরুণরা নিজেদের নাম নিবন্ধন করার সুযোগ পাবেন এবং মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি শূন্য পদে তাদের নিয়োগের সমন্বয় করা হবে।

অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানের পাশাপাশি বিদেশেও জনশক্তি রফতানি বাড়ানোর দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আগামী কয়েক বছরে ধাপে ধাপে এক কোটি মানুষকে বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এবার অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জন্য এবারের বাজেটে ৪৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা গতবারের চেয়ে ৭৭ কোটি টাকা বেশি। মানবসম্পদ উন্নয়নে ‘মিরপুর-ইউসেপ শ্রম ও কর্মসংস্থান ইনস্টিটিউট’ স্থাপনের ঘোষণা দেয়া হয়েছে।

কুমিল্লার বিদেশ গমনেচ্ছুক তরুণ জামশেদ আলম এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে বলেন, শুধু লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই হবে না। বিদেশে কাজের জন্য আমাদের সঠিক কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং নিরাপদ অভিবাসনের নিশ্চয়তা দিতে হবে।

অন্যদিকে, কর্মসংস্থানের অন্যতম শর্ত মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি তরুণদের মাদক ও সমাজবিরোধী কাজ থেকে বিরত রাখতে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের জন্য ৩০০ কোটি টাকা এবং আড়াই লাখ মানুষের জন্য ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাফায়েত জামিল মনে করেন, শুধু খাতভিত্তিক বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। ক্লাসরুম, ল্যাব এবং ডিজিটাল সুবিধাগুলোর দৃশ্যমান উন্নয়ন প্রয়োজন। শিক্ষাব্যবস্থার মান বাড়লে চাকরি সংক্রান্ত দুশ্চিন্তা এমনিতেই হ্রাস পাবে।

বাজেটে কর্মসংস্থান নিয়ে বিশাল অঙ্কের বরাদ্দ এবং চমৎকার সব পরিকল্পনার কথা বলা হলেও, এর বাস্তবায়ন নিয়ে তরুণদের মধ্যে কিছুটা সংশয় রয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই অতীতের বাজেটগুলোর উদাহরণ টেনে বলছেন যে, কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি থাকলেও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতির কারণে তা অনেক সময়ই পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।