বিএডিসিতে ফ্যাসিস্ট আমলের বেপরোয়া সিবিএ নেতারা এখনো অধরা

কর্মচারীর হাতে লাঞ্ছিত হতেন কর্মকর্তারা; এখনো বিচার পাননি, হেড অফিসে এখনো বহাল

Printed Edition

কাওসার আজম

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব আর কর্তৃত্ব নির্ধারিত হয় বিধি ও পদমর্যাদায়; কিন্তু বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএডিসি) বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনামলে এমন এক ক্ষমতার কাঠামো গড়ে ওঠে, যেখানে নিয়ম মানতে চাওয়া কর্মকর্তারাই হয়ে ওঠেন হুমকি, ভয়ভীতি ও শারীরিক লাঞ্ছনার শিকার। আর কর্মচারীদের একটি প্রভাবশালী অংশ পরিণত হয় অলিখিত ক্ষমতার কেন্দ্রে। কর্মকর্তাদের গায়ে হাত তোলার একাধিক অভিযোগ ওঠার পরও আজ পর্যন্ত এসব ঘটনার বিচার হয়নি- এমন গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বিএডিসি শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি মশিউর রহমানসহ তার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। পেশায় একজন গাড়িচালক হলেও মশিউর দীর্ঘ দিন ধরে সংস্থাটির নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করেছেন। আওয়ামী শাসনের অবসান ঘটেছে প্রায় দেড় বছর হলেও কর্মকর্তাদের লাঞ্ছনার বিচার আজও অধরাই রয়ে গেছে।

ভুক্তভোগীদের একজন বিএডিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা এস এ এম এস এম সাঈব। তিনি জানান, ২০১৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর তিনি সাধারণ পরিচর্যা বিভাগে যুগ্ম পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর থেকেই তৎকালীন আওয়ামী লীগপন্থী সিবিএ গোষ্ঠীর চাপের মুখে পড়েন। ওই সময় সিবিএ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী শ্রমিক বলয় গড়ে ওঠে, যারা নিয়মবহির্ভূত দাবি আদায়ে প্রশাসনের ওপর লাগাতার চাপ প্রয়োগ করত। তখনকার সিবিএর কার্যকরী সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন গাড়িচালক মশিউর রহমান। অভিযোগে জানা যায়, মশিউর রহমান নিয়মিত গাড়ি না চালিয়েই প্রতি মাসে ওভারটাইম বিল নিতেন। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ওই বিল অনুমোদনে বাধ্য হতেন। বিষয়টি নজরে আসার পর এস এম সাঈব বিধি অনুযায়ী গাড়ি না চালিয়ে ওভারটাইম দেয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন মশিউর রহমান। ওভারটাইম পুনরায় চালুর জন্য তার ওপর বিভিন্ন দিক থেকে চাপ সৃষ্টি করা হয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও শেষ পর্যন্ত আত্মরক্ষার তাগিদে নিয়মবহির্ভূত বিল অনুমোদনে বাধ্য হন এই কর্মকর্তা।

এতেই দ্বন্দ্ব শেষ হয়নি। একজন জুনিয়র গাড়িচালক হয়েও মশিউর রহমান সিনিয়রদের উপেক্ষা করে যানবাহন সুপারভাইজার পদ দখলে নিতে চান। নিয়ম অনুযায়ী সিনিয়র গাড়িচালক এই পদ পাওয়ার কথা। এস এম সাঈব তার নোটে সে দিকেই ইঙ্গিত করেন। এতে এই কর্মকর্তার সাথে মশিউরসহ সিবিএর নেতাদের বিরোধ আরো তীব্র হয়।

এস এম সাঈব জানান, ২০২০ সালের ২৪ ডিসেম্বর ছিল তার চাকরিজীবনের সবচেয়ে ঘৃণিত ও কলঙ্কজনক দিন। সে দিন সিবিএ সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ব্যক্তিগত কাজে একটি গাড়ি বরাদ্দের দাবি জানান। যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনসাপেক্ষে গাড়ি বরাদ্দ দেয়া হলেও চিঠিতে তার পদ ‘অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর’ লেখা হয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ১০-১৫ জন অনুসারী নিয়ে তিনি এস এম সাঈবের কক্ষে ঢুকে হুমকি দেন। একপর্যায়ে শার্টের কলার ধরে তাকে টেনে-হিঁচড়ে অপদস্থ করা হয়। সৈয়দ সাকিবুল ইসলাম নামের এক কর্মকর্তা তাকে ওই সময় রক্ষা করেন। ঘটনার পর বিষয়টি তৎকালীন চেয়ারম্যান সায়েদুল ইসলামকে জানানো হলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। পরে ২২ ডিসেম্বর ২০২০ মতিঝিল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন এস এম সাঈব। কিন্তু রাজনৈতিক দাপটে অভিযুক্তরা পার পেয়ে যান। উল্টো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অফিস চত্বরে ব্যানার টানিয়ে তার বিরুদ্ধে শাস্তির দাবি তোলে কর্মচারী সিন্ডিকেট।

এর কিছুদিন পর আবারো তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়। এস এম সাঈব জানান, ২০-৩০ জন কর্মচারীর একটি দল, যার নেতৃত্বে ছিলেন সিবিএ সভাপতি সোহেল ও জাহাঙ্গীর, তার কক্ষে প্রবেশ করে। কথাবার্তার একপর্যায়ে মশিউর রহমান চেয়ার থেকে উঠে তার শার্টের কলার ধরে গালিগালাজ করতে করতে টেনে নেয়। অন্য সিবিএ সদস্যরা তাকে সহযোগিতা করে। অফিসের কেউ ভয়েই এগিয়ে আসেননি। পরে সহকারী পরিচালক সৈয়দ সাকিবুল ইসলাম তাকে উদ্ধার করতে গেলে তাকেও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।

অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, মশিউর রহমানসহ তৎকালীন সিবিএ নেতারা কর্মকর্তাদের হুমকি দিয়ে অবৈধ সুবিধা আদায় করতেন। ২০২১ সালের ২৪ জুন বিএডিসির তৎকালীন সচিবের কক্ষে ঢুকে মশিউর রহমানসহ ৩০-৪০ জন কর্মচারী টেবিল চাপড়িয়ে হট্টগোল সৃষ্টি করেন। শারীরিকভাবে নিগৃহীতের শিকার হন আরেক কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ। এ ছাড়া অসংখ্য কর্মকর্তাকে মশিউর, জাহাঙ্গীর, রফিক, দেলোয়ারসহ সিবিএ নেতারা লাঞ্ছিত করেন। দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক টানা ক্ষমতাসীন আওয়ামী আমলে বিএডিসিতে বিশেষ দাপট দেখান এই কর্মচারী সিন্ডিকেট। কর্মচারীদের নিয়োগ-পদোন্নতির পাশাপাশি কর্মকর্তাদের পদায়নেও প্রভাব বিস্তার করেন তারা। মশিউর গংদের কথার বাইরে গেলেই কর্মকর্তারা হেনস্তার শিকার হতেন।

এসব লাঞ্ছনার ঘটনা বিএডিসিতে চাপা পড়ে যায়। কারণ প্রভাবশালী মহলের সাথে মশিউর গংদের আত্মার সম্পর্ক। কিন্তু গত বছরের জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের পরও দিলকুশার কৃষি ভবনে বহাল তবিয়তে রয়েছেন বিগত সময়ের প্রভাবশালী কর্মচারীরা। সাধারণ পরিচর্যা বিভাগ থেকে নামকাওয়াস্তে বদলি হয়ে বর্তমানে পারচেজ ডিভিশনে একজন ব্যবস্থাপকের গাড়িচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মশিউর। এখন তাল মিলিয়ে চলছেন বর্তমান কর্মচারী নেতাদের সাথে। শুধু মশিউর নন, বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের দাপুটে কর্মচারী, গাড়িচালকদের কারোরই শাস্তি হয়নি। দেলোয়ার নামের একজন গাড়িচালকের শুধু খুলনায় বদলি হয়েছে।

জানা যায়, মশিউরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিগত সময়ে দুইবার তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে; কিন্তু অদৃশ্য ছায়ায় তা আলোর মুখ দেখেনি।

বর্তমানে এসব অভিযোগ তদন্ত করছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী খান ফয়সাল আহমেদ ও উপব্যবস্থাপক (ক্রয়) হাবিবুর রহমান। তারা সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। এ ব্যাপারে গতকাল সন্ধ্যায় খান ফয়সাল আহমেদকে ফোন দিলেও নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।