রিকশাচালককে মারধর, সাংবাদিকদের হেনস্তা, ডিসির কাছে লিখিত অভিযোগ

নিকলীতে এসিল্যান্ড প্রতীক দত্তের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ

Printed Edition

আলি জামশেদ বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)

কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতীক দত্তের বিরুদ্ধে একের পর এক বিতর্ক ও অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ এক রিকশাচালককে মারধর এবং সাংবাদিকদের হেনস্তার অভিযোগে জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উপজেলাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে।

ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি নিকলীতে এসিল্যান্ড প্রতীক দত্তের সামনে ভূমি সংক্রান্ত একটি বিষয় নিয়ে কথোপকথনের ভিডিও ধারণ করায় এক রিকশাচালককে মারধর করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতেই ওই রিকশাচালককে একাধিকবার থাপ্পড় মারা হয়।

ভুক্তভোগীরা দাবি করেন, ভিডিও ধারণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এবং পরে পুলিশ ডেকে এনে উপস্থিত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধাকে সাময়িকভাবে আটকে রাখা হয়। এ সময় ঘটনাটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা এবং মামলা দেয়ার ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও ওঠে।

সাংবাদিকদের হেনস্তার অভিযোগ

এই ঘটনাকে ঘিরে সাংবাদিকদের হেনস্তার অভিযোগও সামনে এসেছে। দৈনিক জবাবদিহি পত্রিকার সিনিয়র সাংবাদিক আলমগীর হোসেন অভিযোগ করেছেন, তাকে বিভিন্ন মাধ্যমে ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ করেছেন দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ পত্রিকার নিকলী উপজেলা প্রতিনিধি এবং আরো কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মী। এ বিষয়ে আলমগীর হোসেন গত ১১ মার্চ জেলা প্রশাসক বরাবর রেজিস্ট্রি এডির মাধ্যমে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানা গেছে।

মুক্তিযোদ্ধাদের জমি নিয়ে বিরোধ : স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের দাবি, প্রায় ৪০ বছর আগে সরকারিভাবে ৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে এক একর করে খাস জমি ভোগদখলের অনুমতি দেয়া হয়েছিল। এসব জমি নিকলী উপজেলার জোয়ার নিকলী, বরুলিয়া ও কুর্শা মৌজার অন্তর্গত ঘোড়াউত্রা নদী তীরবর্তী এলাকায় অবস্থিত। বীর মুক্তিযোদ্ধা আ: গণি বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে ওই জমি ভোগদখল করে আসছি। হঠাৎ করে কোনো লিখিত নোটিশ ছাড়াই জমি থেকে উচ্ছেদের কথা বলা হয়েছে।’ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, নদী খননের মাটি রাখার অজুহাতে ফসলি জমিতে লাল নিশান টানানো হয়। এতে তাদের ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। তাদের দাবি, এ বিষয়ে বারবার যোগাযোগ করলেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।

ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে মারধরের অভিযোগ : ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ সকাল প্রায় ১১টার দিকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য এ বিষয়ে কথা বলতে এসিল্যান্ডের কার্যালয়ে যান। তাদের সাথে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আ: গণির নাতি সুজন মিয়া (৩২)। অভিযোগ রয়েছে, তিনি কথোপকথনের একটি ভিডিও ধারণ করছিলেন। এ সময় তাকে থাপ্পড় মারার ঘটনা ঘটে। সুজন মিয়া বলেন, ‘ভিডিও করার কারণে আমাকে কয়েকবার থাপ্পড় মারা হয়। এরপর থেকে বাম কানে কম শুনছি এবং ব্যথা অনুভব করছি।’ তিনি এ ঘটনার বিচার দাবি করেছেন।

ঘটনায় উত্তেজনা : ঘটনার সময় উপস্থিত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য প্রতিবাদ জানালে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এ সময় পুলিশ এসে তাদের সাময়িকভাবে আটকে রাখে এবং ঘটনা নিয়ে কথা না বলার জন্য ভয়ভীতি দেখানো হয়।

স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা যায়, প্রতীক দত্ত এর আগেও বিভিন্ন ঘটনায় আলোচনায় এসেছিলেন। তিনি খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার বাসিন্দা।

ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) পড়াশোনা করেন। সে সময় ছাত্ররাজনীতির সাথে সম্পৃক্ততার কারণে বিভিন্ন সময়ে বিতর্কে জড়ানোর অভিযোগ উঠেছিল। পরে তিনি ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দেন এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। এর আগে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি নির্মাণাধীন ব্রিজের কাজ নিয়ে ঠিকাদারের সাথে বাগি¦তণ্ডার ঘটনাও গণমাধ্যমে আলোচিত হয়।

বদলির আদেশ : প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের এক অফিস আদেশে প্রতীক দত্তকে কোটালীপাড়া থেকে কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে বদলি করা হয়। অফিস আদেশে উল্লেখ করা হয়, তাকে নির্ধারিত তারিখে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হয়ে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে হবে।

স্থানীয়দের নানা অভিযোগ

নিকলীতে যোগদানের পর থেকেই তার বিরুদ্ধে ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়ম ও কঠোর আচরণের অভিযোগ উঠছে বলে দাবি করেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। তাদের অভিযোগ, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও বাজার সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।

যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রতীক দত্তের বক্তব্য জানতে ১০ মার্চ বিকেল ৫টা ১৬ মিনিটে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এছাড়া একই সময়ে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তি এবং কিশোরগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লার সাথেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তাদের সাথেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।