গাজায় এক দিনে প্রাণ গেল আরো ১১২ ফিলিস্তিনির
Printed Edition
- গাজায় স্কুলে ইসরাইলি হামলায় নিহত ২৭
- দেড় বছরে এতিম হয়েছে ৪০ হাজার শিশু
- নতুন হামলার তদন্তের দাবি ১৩ ইসরাইলি আইনজীবীর
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ফের ভয়াবহ হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধবিরতির আহ্বান ও মানবিক সহায়তার দাবির মুখেও অব্যাহত রয়েছে ইসরাইলের বর্বর আগ্রাসন। গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ১১২ ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন আরো অন্তত ১৩৮ জন। তেহরান টাইমস।
এতে গত বছরের অক্টোবরে সঙ্ঘাত শুরুর পর থেকে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ৫২৩ জনে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো বহু মানুষ চাপা পড়ে আছেন, যাদের উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। আহতদের অনেকেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছেন। আহত হওয়া শতাধিক মানুষকে আল আহলি-আরব হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। গাজার জরুরি উদ্ধারকারী সংস্থার এক মুখপাত্র সংবাদমাধ্যম বলেছেন, ইসরাইলের এই গণহত্যা বন্ধে এখনই বিশ্বকে এগিয়ে আসতে হবে। যেন তারা আর কোনো নারী, শিশু এবং বৃদ্ধকে হত্যা করতে না পারে। তিনি বলেন, এটি শুধুই একটি গণহত্যা নয়। এটি ইসরাইলের উন্মত্ততা। তারা আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা নারী ও শিশুদের হত্যার জন্য পাগল। দার আল-আরকাম স্কুলে ইসরাইলি বাহিনী সরাসরি হামলা চালিয়েছে।
উদ্ধারকারী সংস্থার ওই মুখপাত্র আরো বলেন, এখানে যা হচ্ছে সেটি বিশ্ববাসীর জন্য জেগে ওঠার একটি ডাক। নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ এবং এই গণহত্যা এখনই বন্ধ হওয়া উচিত। শিশুরা এখানে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যার শিকার হচ্ছে। গত ১৮ মার্চ থেকে গাজায় ফের নতুন করে ইসরাইলি বিমান হামলা শুরু হয়। এর পর থেকে মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে আরো ১ হাজার ১৬৩ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ২ হাজার ৭০০-এর বেশি। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ইসরাইল গাজায় যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। এরপর প্রায় দুই মাস সহিংসতা কিছুটা কম থাকলেও, মার্চের তৃতীয় সপ্তাহে হামাসের সাথে মতানৈক্যকে কেন্দ্র করে ইসরাইল ফের বিমান হামলা শুরু করে।
জাতিসঙ্ঘ বলছে, এই দীর্ঘদিনের আগ্রাসনে গাজার প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ভূখণ্ডটির অন্তত ৬০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস বা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর আগে, ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিল। একই সাথে ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার অভিযোগে মামলা চলছে।
গাজায় স্কুলে ইসরাইলি হামলায় নিহত ২৭
গাজার তুহফা এলাকায় তিনটি স্কুলে ইসরাইলি হামলায় ১৮ শিশুসহ অন্তত ৩৩ জন নিহত হয়েছেন। এসব হামলায় শতাধিক ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার হামলাগুলো হয় বলে স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। গাজা সরকারের গণমাধ্যম কার্যালয় থেকে জানানো হয়, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে শুধু দার আল-আরকাম স্কুলে হামলায় ১৮ শিশুসহ ২৯ নিহত ও শতাধিক আহত হন। স্কুলটি আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হচ্ছিল। ওই স্কুলটিতে কমপক্ষে চারটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়।
সূত্র জানিয়েছে, অন্য চার ব্যক্তি নিহত হয়েছেন ফাহাদ স্কুলে হামলার ঘটনায়। তুহফা এলাকায় অবস্থিত এই স্কুলটিও বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হতো। তুহফা এলাকায় হামলার শিকার অপর স্কুলটির নাম শাবান আলরাইয়েস স্কুল। তবে সেখানে কতজন লোক হতাহত হয়েছেন তাৎক্ষণিক তা জানা যায়নি। ইসরাইলি বাহিনীর দাবি, তারা গাজার সিটিতে হামাসের একটি ‘কমান্ড সেন্টারে’ হামলা চালিয়েছে। তবে তারা এটা স্পষ্ট করেনি যে, এই স্কুলগুলোর সাথে ওই হামলার সম্পর্ক কী।
এর আগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় আরও ৯৭ জন নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছিল। ইসরাইল বলছে, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বৃহৎ অংশ দখল করতে তাদের স্থল অভিযান বিস্তৃত হচ্ছে। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেছেন, দার আল-আরকাম স্কুলে হামলায় নিহতদের মধ্যে শিশু ও নারীও রয়েছে। তিনি বলেন, যমজ সন্তানের গর্ভবতী এক নারী, তার স্বামী, তার বোন এবং তার তিন সন্তান নিখোঁজ রয়েছেন। কাছের আল-আহলি হাসপাতালের ভিডিওতে দেখা গেছে, গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুদের গাড়ি ও ট্রাকে করে সেখানে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গাজা শহরের যে স্থানে হামলা চালানো হয়েছে, সেটিকে হামাস যোদ্ধারা ইসরাইলি বেসামরিক নাগরিক ও সেনাদের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করতে ব্যবহার করছিল। বিবৃতিতে দাবি করা হয়, বেসামরিক নাগরিকদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলীয় শেজাইয়া জেলার বেশ কয়েকটি বাড়িতে রাতভর হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। তারা একটি ভিডিও পোস্ট করেছে, যাতে দেখা গেছে, একটি ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসাবশেষ থেকে দুই শিশুর মরদেহ টেনে বের করছে উদ্ধারকারীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসি আরবির গাজা লাইফলাইন প্রোগ্রামকে বলেন, তিনি যখন ঘুমিয়ে ছিলেন, তখন হঠাৎ প্রচণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠেন। পরে আবিষ্কার করেন, প্রতিবেশী আইয়াদ পরিবারের বাড়িতেই সেটা ঘটেছে। আইডিএফের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে বৃহস্পতিবার সকালে তারা শেজাইয়া এবং পার্শ্ববর্তী চারটি এলাকার বাসিন্দাদের অবিলম্বে পশ্চিম গাজা সিটিতে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। আইডিএফ তখন সতর্ক করে বলেছিল, সন্ত্রাসী অবকাঠামো ধ্বংসে তারা প্রবল শক্তি নিয়ে কাজ করছে। চলতি সপ্তাহে আইডিএফ গাজার উত্তরাঞ্চলের বেশ কয়েকটি এলাকা, দক্ষিণাঞ্চলীয় রাফাহ শহর এবং পার্শ্ববর্তী খান ইউনিসের কিছু অংশে একই ধরনের নির্দেশ জারি করে, যার ফলে প্রায় এক লাখ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়। সামরিক বাহিনী বলেছে, হেডলাইট বা জরুরি সঙ্কেত ছাড়াই যানবাহনগুলো তাদের সৈন্যদের দিকে সন্দেহজনকভাবে অগ্রসর হচ্ছিল। নিহতদের মধ্যে হামাসের এক সদস্য ও আরো আট সন্ত্রাসী রয়েছে বলে দাবি করেছে তারা। তবে বেঁচে যাওয়া মুনতাহার আবেদ জোর দিয়ে বলেছেন, গাড়িগুলো সরাসরি গোলাগুলোর কবলে পড়ার আগ পর্যন্ত সব লাইট জ্বলছিল। অ্যাম্বুলেন্সগুলোকে ঢাল হিসেবে হামাস ব্যবহার করে থাকতে পারে বলে সামরিক বাহিনী যে দাবি করছে, তা প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, জরুরি সেবার সব কর্মীই বেসামরিক নাগরিক। হামাস ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরাইলে হামলা চালালে ১২০০ জন নিহত হন এবং ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়। তার প্রতিক্রিয়ায় ইসরাইলি সামরিক বাহিনী অভিযান শুরু করে, যাতে ৫০ হাজার ৫২০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
গাজায় দেড় বছরে প্রায় ৪০ হাজার শিশু এতিম হয়েছে
গাজায় দেড় বছর ধরে ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে দখলদার ইসরাইল। এই সময়ে ৫০ হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করেছে ইসরাইলি সেনারা। এতে করে উপত্যকাটির হাজার হাজার শিশু বাবা-মা হারিয়ে এতিম হয়ে গেছে। ফিলিস্তিনের কেন্দ্রীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর বরাতে আলজাজিরা ও মিডল ইস্ট আই বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, গাজায় ৩৯ হাজার ৩৮৪ শিশু এতিম হয়েছে। যার মধ্যে ১৭ হাজার শিশুর বাবা-মা উভয়কে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। ফিলিস্তিনি শিশু দিবসের প্রাক্কালে গাজার এমন ভয়াবহ তথ্য জানিয়েছে দেশটির পরিসংখ্যান ব্যুরো।
গত জানুয়ারিতে ইসরাইলের সাথে সশস্ত্র গোষ্ঠী হামাসের যুদ্ধবিরতি হয়। কিন্তু দখলদাররা চুক্তি লঙ্ঘন করে পবিত্র রমজান মাস শুরুর পর গাজায় ফের ব্যাপক হামলা চালানো শুরু করে। এমনকি মুসলিমদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরেও হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রেখেছিল তারা। নতুন করে চালানো হামলায় রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত প্রায় ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছেন আরো অনেকে। দখলদাররা ভারী সরঞ্জাম প্রবেশ করতে না দেয়ায় ধ্বংসস্তূপের নিচে থাকা এসব মানুষকে উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। আলজাজিরা জানিয়েছে, শুধু বৃহস্পতিবারই ৬২ জনকে হত্যা করেছে ইসরাইল। মাজেদ ওবায়েদ নামে গাজা সিটির এক বাসিন্দা সংবাদমাধ্যমটিকে বলেছেন, সকালে ইসরাইলি হামলায় চারতলা একটি ভবন ধসে পড়ে। সেটির নিচে অনেকে চাপা পড়ে আছে। তিনি জানান, এ হামলায় যারা নিহত হয়েছেন তাদের ৯০ শতাংশই নিরীহ নারী ও শিশু।
গাজায় নতুন করে হামলার তদন্তের দাবি ১৩ ইসরাইলি আইনজীবীর
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি ভেঙে নতুন করে শুরু করা ইসরাইলি বাহিনীর হামলায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধের তদন্ত চেয়েছেন দেশটির ১৩ জন আইনজীবী। আনাদোলু অ্যাজেন্সি। বৃহস্পতিবার ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ জানিয়েছে, ১৩ জন ইসরাইলি আইনজীবী যুদ্ধাপরাধের সন্দেহে গাজায় নতুন করে চালানো ইসরাইলি বিমান হামলার তদন্তের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেল গালি বাহারভ-মিয়ারা ও সামরিক অ্যাডভোকেট জেনারেল ইফাত তোমের-ইয়েরুশালমির কাছে দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে বাহারভ-মিয়ারা বা তোমের-ইয়েরুশালমির তরফ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইসরাইল গত ১৮ মার্চ গাজায় আকস্মিক বিমান হামলা শুরু করে। তখন থেকে এ পর্যন্ত এক হাজার ১৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং দুই হাজার ৭০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাসের সাথে জানুয়ারিতে কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতি ও বন্দিবিনিময় চুক্তি ভেঙে ইসরাইল গাজায় তাদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ইসরাইলের আক্রমণে ৫০ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গত নভেম্বরে গাজায় যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। এ ছাড়াও গাজায় সংঘটিত যুদ্ধের জন্য আন্তর্জাতিক বিচার আদালত ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করে।