ইনকিলাব মঞ্চের সাথে পুলিশের সংঘর্ষ
যমুনা অভিমুখী এলাকা রণক্ষেত্র আহত অর্ধশতাধিক
Printed Edition
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি
জাতিসঙ্ঘের অধীনে শরীফ ওসমান বিন হাদি হত্যার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানীর শাহবাগ এলাকার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় এলাকায় পুলিশের সাথে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান, লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে সংগঠনটির দাবি তাদের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
গতকাল শুক্রবার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে প্রথম দফায় সংঘর্ষ শুরু হয়। এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে ইনকিলাব মঞ্চ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে আসছিল। একাংশ প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন ‘যমুনা’র সামনে এবং অপর অংশ হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে অবস্থান নেয়। কর্মসূচি ঘিরে আগে থেকেই ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড়ে পুলিশের ব্যারিকেড বসানো ছিল।
এ দিন বিকেলে ইন্টারকন্টিনেন্টালের সামনে অবস্থানরত ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীদের একটি দল যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের বাধা দেয়। এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ কয়েকজন এগোতে চাইলে উভয় পক্ষের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে উঠলে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
পুলিশের পক্ষ থেকে প্রথমে জলকামান ব্যবহার করা হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আসায় পরে সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করা হয়। এতে আন্দোলনকারীরা তিনভাগে বিভক্ত হয়ে যায়।
সংঘর্ষে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবেরকে গুলিবিদ্ধ দাবি করা হয় ও রাকসুর জিএস সালাহউদ্দিন আম্মার গুরুতর হয়েছেন খবর ছড়িয়ে পড়ে। ডাকসুর নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের (জকসু) নেত্রী শান্তা আক্তারসহ একাধিক নেতাকর্মী আহত হন।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো: সাজ্জাত আলী বলেন, ইনকিলাব মঞ্চের বিক্ষুব্ধ লোকজন পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে যমুনা ঘেরাওয়ের চেষ্টা করে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশ জলকামানের ওপর উঠে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত করার চেষ্টা করে। জনস্বার্থ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।’
সংঘর্ষের পর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন ঢাকা-৮ আসনের ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তার নেতৃত্বে ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় থেকে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের হয়, যা শাহবাগ মোড়ের দিকে অগ্রসর হয়।
এরপর বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ইনকিলাব মঞ্চের নেতাকর্মীরা শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নেন। এতে শাহবাগ এলাকায় সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ মানুষ। এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের বিক্ষোভ কর্মসূচি চলছিল।
আন্দোলনকারীরা বলেন, শরীফ ওসমান হাদি হত্যার ঘটনায় এখনো কার্যকর তদন্ত ও বিচার না হওয়ায় তারা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের দাবি- সরকার বারবার আশ্বাস দিলেও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। তাই জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাবেন তারা। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত শাহবাগ মোড়ে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে এবং এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
পুলিশ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেনি : ডিএমপি
এ দিকে বিবৃতির মাধ্যমে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানায়, যমুনা ও আশপাশের এলাকায় বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে কোনো প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র বা গুলি ব্যবহার করেনি পুলিশ। জনশৃঙ্খলা রক্ষা ও প্রধান উপদেষ্টার নিরাপত্তা রক্ষার স্বার্থে যমুনা ও সংলগ্ন এলাকায় যেকোনো প্রকার সভা-সমাবেশ, মিছিল, গণজমায়েত ও বিক্ষোভ প্রদর্শন নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও শুক্রবার বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে একাধিক গোষ্ঠী পুলিশের বাধা অতিক্রম করে যমুনার দিকে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ার শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
ডিএমপি আরো জানায়, এই ঘটনা ভিন্ন খাতে নেয়ার জন্য কিছু ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছেন মর্মে আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিকভাবে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে এবং এতে কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র বা গুলি ব্যবহার করা হয়নি। এই ঘটনায় পুলিশের বেশ কয়েকজন সদস্য আহত হওয়ার পাশাপাশি কয়েকজন বিক্ষোভকারীও সামান্য আহত হয়। এ নিয়ে কোনো প্রকার অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য ডিএমপির পক্ষ থেকে সবাইকে অনুরোধ জানানো হয়।
ইনকিলাব মঞ্চের কেউ গুলিতে আহত হননি : ঢামেক পরিচালক
ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে কেউ গুলিতে আহত হননি বলে জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: আসাদুজ্জামান। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি সাংবাদিকদের এ কথা জানান।
তিনি বলেন, “আমাদের এখানে অর্ধশতাধিক রোগী এসেছে। তবে এর মধ্যে কোনো গুলির রোগী পাওয়া যায়নি। যারা আহত হয়ে এসেছেন, তাদের জরুরি বিভাগে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। অনেকে চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। আহতদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতজনিত জখম রয়েছে। আহতদের মধ্যে বেশির ভাগ রোগীর জখম ফেটে যাওয়া ও থেঁতলে যাওয়ার ধরনের। এখন পর্যন্ত ভর্তি দেয়ার মতো রোগী পাওয়া যায়নি।