বিক্রয়চাপে পতন ঠেকানো যাচ্ছে না পুঁজিবাজারে
মার্জিন রুলস বাস্তবায়নের সময়সীমা বৃদ্ধির প্রস্তাব ডিবিএ-এর
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কোনো সুরাহা না হওয়ায় এর প্রভাব রয়ে গেছে পুঁজিবাজারে। বিনিয়োগকারীরা পুরোপুরি আস্থা আনতে পারছেন না বাজারের ওপর। তাই বিক্রয়চাপের মুখে একপ্রকার অস্থির আচরণ করছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। গতকাল সোমবার লেনদেনের প্রথম আধাঘণ্টা বাজারগুলো ভালো আচরণ করলেও পরবর্তীতে তা ধরে রাখতে পারেনি। বেলা পৌনে ১১টার দিকে সৃষ্টি হওয়া বিক্রয়চাপ দিনের বাকি সময় দুই বাজারকে অস্থির করে রাখে। এতে দিনশেষে উভয় বাজারেই সূচকের পাশাপাশি অবনতি ঘটে লেনদেনেরও।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৪১ দশমিক ০৩ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। পাঁচ হাজার ২৭১ দশমিক ৪০ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিন শেষে নেমে আসে পাঁচ হাজার ২৩০ দশমিক ০৩ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর অবনতি ঘটে যথাক্রমে ২১ দশমিক ৩০ ও ৩ দশমিক ০৮ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই গতকাল ৪১ দশমিক ৪৮ পয়েন্ট হারায়। এখানে দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের অবনতি ঘটে যথাক্রমে ৪৪ দশমিক ১৯ ও ২৩ দশমিক ৩৮ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপাশি গতকাল লেনদেনও কমেছে দুই পুঁজিবাজারে। ঢাকা শেয়ারবাজার গতকাল ৭৯৩ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে, যা আগের দিন অপেক্ষা ৪৪ কোটি টাকা কম। রোববার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৮৩৭ কোটি টাকা। অপরদিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজার এদিন ৪০ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হয় যা আগের দিন অপেক্ষা ১৪ কোটি টাকা কম। রোববার বাজারটির মোট লেনদেন ছিল ৫৪ কোটি টাকা।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধের ভয়াবহতা এখনো বিনিয়োগকারীরা ভুলতে পারছেন না। এক বছরেরও বেশি সময় ধরে ওই যুদ্ধের প্রভাব ছিল পুঁজিবাজারে। দীর্ঘসময় ধরে ফোর প্রাইসে আটকে ছিল পুঁজিবাজারগুলো। এখনো ওই ট্রমা থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারছে না। তবে এবার যুদ্ধবিরতির বিষয়টি সুরাহা হলে পুঁজিবাজার পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে বলে আশাবাদী তারা। আবার বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মনে করেন নিয়ন্ত্রক সংস্থায় পরিবর্তন আনা উচিত। বিষয়টি নিয়েও একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছতে হবে সরকারকে। সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই মনে করেন, নীতিনির্ধারকদের পরিষ্কার করতে হবে আগের কমিশন থাকবে কি থাকবে না। সরকার যেটিই সিদ্ধান্ত নিক তার স্পষ্ট ঘোষণা আসা উচিত। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা আর দোটানায় থাকবেন না।
এ দিকে শেয়ারবাজারে কার্যকর হওয়া নতুন ‘মার্জিন রুলস-২০২৫’ বাস্তবায়নের সময়সীমা আরো তিন মাস বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা স্টক ব্রোকার্সদের সংগঠন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ডিবিএ)। সংগঠনটির পক্ষ থেকে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদের কাছে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক আবেদন করা হয়েছে। ডিবিএর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
ডিবিএর পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত মঙ্গলবার সংগঠনের সভাপতি সাইফুল ইসলামের সই করা চিঠির মাধ্যমে এই অনুরোধ জানানো হয়েছে। ডিবিএ জানায়, গত বছরের ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (মার্জিন) রুলস-২০২৫ এর মাধ্যমে বাজারে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা, বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা বাড়ানো এবং বাজারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
তবে সংগঠনটির মতে, নির্ধারিত ছয় মাসের সময়সীমা (৩০ এপ্রিল ২০২৬) পর্যন্ত এই নতুন বিধিমালার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন বলে সংগঠনটি মনে করছে। সময়সীমা বাড়ানোর পেছনে যুক্তি হিসেবে ডিবিএ বলছে, ব্রোকারেজ হাউজগুলোর অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণ, ঝুঁকি মূল্যায়ন, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন এবং অপারেশনাল সিস্টেমে সমন্বয়ের জন্য আরো সময় দরকার। অনেক প্রতিষ্ঠান এখনো নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এর পেছনে দক্ষ জনবলের ঘাটতি, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং ক্লায়েন্টদের মতামত অন্তর্ভুক্তির প্রয়োজনীয়তা কাজ করছে।
এ ছাড়া সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের রিস্ক বেসড ক্যাপিটাল অ্যাডিকিউরি রুলস, ২০১৯-এর সাথে সামঞ্জস্য আনতে সিস্টেম উন্নয়ন, জনবল প্রশিক্ষণ এবং অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষার মতো বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তড়িঘড়ি করে বাস্তবায়ন করলে অপারেশনাল ত্রুটি কিংবা মার্জিন সেবায় সাময়িক বিঘœ সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংগঠনটি। ডিবিএ আরো উল্লেখ করেছে, বিদ্যমান বিপুলসংখ্যক ঋণ হিসাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অমার্জিনযোগ্য সিকিউরিটিজ রয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন করতে গেলে বাধ্যতামূলক বিক্রির পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা বাজারে অস্থিরতা বাড়াতে পারে এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ক্ষতির মুখে ফেলতে পারে। একই সাথে তারল্য সঙ্কটও তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সংগঠনটির মতে, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সঙ্কটজনিত প্রভাবের কারণে বর্তমান বাজার পরিস্থিতি এমনিতেই চাপের মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থায় নতুন বিধিমালা বাস্তবায়নে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হলে বাজারে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এ প্রেক্ষাপটে ডিবিএ মার্জিন রুলস, ২০২৫ বাস্তবায়নের সময়সীমা বাড়িয়ে আগামী ৩১ জুলাই পর্যন্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে। এতে ব্রোকারেজ হাউজগুলো পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নিতে পারবে এবং ধাপে ধাপে বিধিমালাটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে সংগঠনটি।
উল্লেখ্য, গত বছরের ১২ আগস্ট বিএসইসির ৯৬৭তম কমিশন সভায় শেয়ারবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সুপারিশের ভিত্তিতে এবং বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিতের লক্ষ্যে ‘মার্জিন রুলস-২০২৫’-এর খসড়া অনুমোদন দেয়া হয়। ওই বছরের ৬ নভেম্বর তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়।