মঙ্গলবারও সরগরম নিউমার্কেট ঘুরে দাঁড়াচ্ছে ব্যবসা
কেনাকাটায় উৎসবের আমেজ
Printed Edition
হাবিবুল বাশার
ঈদের আমেজে ক্রেতার আনাগোনা বাড়ছে নিউমার্কেটে। উৎসবমুখর পরিবেশে অধিকাংশই নারী ক্রেতাদের লক্ষ্য করা যায়। সাপ্তাহিক ছুটির দিন মঙ্গলবার। ঢাকা মহানগরের নিয়ম অনুযায়ী আজ ঐতিহ্যবাহী নিউমার্কেট এলাকা বন্ধ থাকার কথা। কিন্তু চিরচেনা সেই নীরবতা আজ নেই; বরং রমজান ও আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ক্রেতা-বিক্রেতাদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকা উৎসবের আমেজে ভাসছে। ক্রেতাদের সুবিধার্থে মঙ্গলবার পূর্ণদিবস খোলা রাখা হয়েছে এই মার্কেটটি। ফলে সকাল থেকেই নিউমার্কেট এলাকায় ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা গেছে।
ক্রেতা ও দম্পতিদের পদচারণায় মুখর চারপাশ : সরজমিনে দেখা যায়, দুপুরের পর থেকেই নিউমার্কেটের প্রতিটি প্রবেশপথে মানুষের ঢল নামতে শুরু করেছে। বিশেষ করে পরিবার নিয়ে আসা ক্রেতা এবং নতুন দম্পতিদের আনাগোনা ছিল চোখে পড়ার মতো। সপরিবারে কেনাকাটা করতে আসা জনাব হান্নান তার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, ‘আমি আমার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ঈদের কেনাকাটা করতে এসেছি। পোশাকের সংগ্রহ এবার বেশ ভালো। আমার কাছে মনে হচ্ছে দাম খুব একটা বাড়েনি, গত বছরের মতোই সহনশীল পর্যায়ে আছে।’
মার্কেটের ভেতরে ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ অভিভাবকই এসেছেন তাদের ছোট সন্তানদের জন্য ঈদের নতুন পোশাক কিনতে। তরুণ দম্পতিদের ভিড় বেশি দেখা গেছে ম্যাচিং পোশাক, কসমেটিকস ও জুতার দোকানগুলোতে। ক্রেতাদের এই স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ পুরো মার্কেট এলাকায় এক প্রাণবন্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।
সব বয়সীদের পোশাকের সমাহার
নিউমার্কেট মানেই সব বয়সীদের কেনাকাটার ওয়ান-স্টপ সলিউশন। এখানে নবজাতকদের নিমা ও কটন সেট থেকে শুরু করে কিশোর-কিশোরীদের জন্য টি-শার্ট, প্যান্ট ও রঙিন ফ্রকের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে। বিশেষ করে ‘বাবা-ছেলে’ একই ডিজাইনের ম্যাচিং পাঞ্জাবি সেট এবার নজর কেড়েছে সবার। নারী ক্রেতাদের প্রধান আকর্ষণ পাকিস্তানি লন, ইন্ডিয়ান জয়পুরী ও দেশী বুটিকের বাহারি থ্রিপিস। পাশাপাশি জামদানি ও সিল্কের শাড়ির দোকানেও নারীদের ভিড় উপচে পড়ছে। অন্যদিকে পুরুষদের জন্য সুতি ও কারচুপি কাজের পাঞ্জাবি এবং ট্রেন্ডি ক্যাজুয়াল শার্ট-প্যান্টের অফুরন্ত কালেকশন সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা।
ব্যবসায়ীদের মিশ্র অভিজ্ঞতা ও বিগত সময়ের প্রভাব
বাজার পরিস্থিতি নিয়ে মার্কেটের বিভিন্ন স্তরের ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কাপড় ব্যবসায়ী জসীমউদ্দীন সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, ‘এবার বেচাকেনায় বেশ ভালো চাপ অনুভব করছি। গত দুই-এক বছরের তুলনায় এ বছর আমাদের ব্যবসা অনেক ভালো চলছে এবং আশা করি সামনে আরো ভালো হবে।’ একই সুর শোনা গেল খাবারের দোকানেও। ক্যাপিটাল ফাস্টফুড অ্যান্ড রাইস সেন্টারের স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান বাদশা বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, গত বছরের তুলনায় এবার ক্রেতাদের চাপ একটু বেশি। দুই বছর আগে পাশের মার্কেটে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় যে ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছিল, এবার তা কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছি।’
তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও আছে। সাদিয়া ফ্যাশনের মালিক ইজ্জত আলী কিছুটা শঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, ‘ভেবেছিলাম নির্বাচনের পরে বিক্রি বাড়বে, কিন্তু পরিস্থিতির তুলনায় বিক্রি আসলে অনেক কম। শুক্র ও শনিবার ছাড়া তেমন কোনো বিশেষ চাপ আমরা অনুভব করছি না।’ একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান বেক্সি ফ্যাব্রিক্সের মালিক জনাব ইকবাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের প্রভাবে আগে বিক্রি কম ছিল। ১২ রমজানের পর থেকে বর্তমানে মোটামুটি নিয়মিতভাবেই বেচাবিক্রি চলছে। তবে সামগ্রিকভাবে রমজানে যে বিশাল বিক্রির প্রত্যাশা থাকে, তা এবার মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে।’
অন্যদিকে, জুয়েলারি ব্যবসায় দেখা দিয়েছে চরম মন্দা। আকাশচুম্বী দামের কারণে গয়নার বাজারে স্থবিরতা লক্ষ করা গেছে। নিউ হ্যাভেন জুয়েলার্সের ম্যানেজার জানান, এক ভরি স্বর্ণের দাম দুই লাখ টাকা ছাড়িয়ে যাওয়ায় এটি এখন বিশাল এক ইনভেস্টমেন্ট। ফলে জরুরি প্রয়োজন বা বিয়ে-শাদি ছাড়া কেউ এখন আর স্বর্ণ কিনছেন না। বিগত রমজানে জুয়েলারির উপরে একটু চাপ পড়তো। কিন্তু এবার লক্ষণীয় কোনো বিক্রি হচ্ছে না।
নি-িদ্র নিরাপত্তাব্যবস্থা
বিপুল সংখ্যক ক্রেতার সমাগম ঘিরে এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। নিউমার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী আব্দুস সামাদ হাওলাদার বলেন, ‘আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দুই শিফটে মোট ৩২ জন কর্মী নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের সহায়তায় সার্বক্ষণিক অতিরিক্ত পাঁচজন পুলিশ কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। এখন পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। আমরা সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছি যাতে ক্রেতা ও বিক্রেতারা নির্বিঘেœ কেনাকাটা করতে পারেন।’
এ ছাড়াও ট্রাফিক পুলিশ ও মার্কেট কমিটির স্বেচ্ছাসেবকরা যানজট নিরসন এবং পকেটমার রোধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছেন। ক্রেতাদের স্বাচ্ছন্দ্যে কেনাকাটা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ নজরদারি এবং মোবাইল কোর্টের তৎপরতাও লক্ষ করা গেছে।