একই দিনে মূল্যবৃদ্ধি ও সংশোধন ঘটছে পুঁজিবাজারে
মৌলভিত্তির দুই কোম্পানি এবার ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
ধারাবাহিকভাবেই ভালো আচরণ করছে দেশের পুঁজিবাজার। মঙ্গলবার টানা তৃতীয় দিনের মতো সূচকের উন্নতি ধরে রেখেছে পুঁজিবাজার। এর আগে রোববারও দেশের দুই পুঁজিবাজার সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। তবে সম্প্রতি বাজার আচরণে যে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখো যাচ্ছে তা হলো এ সময়ে বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও সংশোধন দু’টোই ঘটছে একই দিনে। হয়তো আগের দিন মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানিগুলোর বেশ কিছুু দরপতনের শিকার হচ্ছে আর নতুন করে কোনো কোনো খাতের কিছু কোম্পানি উঠে আসছে মূল্যবৃদ্ধির তালিকায়। এ আচরণকে কিছুটা অস্বাভাবিক বলে মনে হলেও বাজারবিশ্লেষকরা মনে করছেন এর মাধ্যমে বাজারে ভারসাম্য ফিরবে।
দীর্ঘ মন্দার পর নতুন বছরের শুরু থেকে দেশের পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। এখনো পুরোপুরি আস্থায় না ফিরলেও সাম্প্রতিক সময়ে ধারাবাহিকভাবে ভালো অবস্থা পার করছে দেশের দুই পুঁজিবাজার। এর মধ্যে বাজার আচরণেও এসেছে কিছুটা পরিবর্তন। গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পুঁজিবাজারে হাতেগোনা কয়েকটি স্বল্প মূলধনী কোম্পানির একচ্ছত্র দাপট থাকলেও সম্প্রতি এ পরিস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটেছে। সম্প্রতি ব্যাংক, বীমা ও অন্যান্য খাতের মৌলভিত্তিসম্পন্ন বেশির ভাগ কোম্পানির নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে পুঁজিবাজার। ফলে এ মুহূর্তে পুঁজিবাজার কমবেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফিরতে শুরু করেছে। আবার বাজারের ভারসাম্য ধরে রেখে একই দিনে ঘটছে মূল্যবৃদ্ধি ও সংশোধন। হয়তো একদিন ব্যাংকিং খাতের মূল্যবৃদ্ধি বাজার সূচককে এগিয়ে নিচ্ছে, অন্য দিকে বীমা বা অন্যান্য খাতগুলোতে ঘটছে সংশোধন। আবার দ্বিতীয় দিনে এসে ব্যাংকিং খাতে সংশোধন ঘটলেও অন্যান্য খাতগুলো উঠে আসছে মূল্যবৃদ্ধি তাািলকায়। আর এভাবে বাজারগুলো একদিনে সূচকের বড় ধরনের অবনতি থেকে যেমন বেঁচে যাচ্ছে তেমনি বিনিয়োগকারীরাও বিনিয়োগ থেকে নিজেদের মুনাফা তুলে নেয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স ১৮ দশমিক ৯২ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ২৪৭ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট থেকে লেনদেন শুরু করা সূচকটি ওই দিন লেনদেনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ২৬৬ দশমিক ৬৭ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৩ দশমিক ৮৭ ও ১৪ দশমিক ৫৩ পয়েন্ট।
ডিএসইতে সকালে সূচকের উন্নতি দিয়ে লেনদেন শুরু হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারটি। সকালে সাড়ে ১০টার আগেই প্রধান সূচকটি নেমে আসে আগের দিনের অবস্থানে। কিন্তু পরে এ চাপ সামলে আবার ঊর্ধ্বমুখী হয় সূচক। বেলা পৌনে ১টার দিকে সূচকটি দিনের সর্বোচ্চ ৫ হাজার ২৮৩ পয়েন্টের ঘর অতিক্রম করে। এ পর্যায়ে সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় ৩৬ পয়েন্টের বেশি। তবে দিনের শেষ ভাগে এসে নতুন করে বিক্রয়চাপ সৃষ্টি হলে সব সূচকের উন্নতিতেই লেনদেন শেষ করতে সক্ষম হয় ডিএসই।
দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই মঙ্গলবার ৬৭ দশমিক ৩৪ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। ১৪ হাজার ৬৯৩ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি ওই দিন লেনদেনশেষে স্থির হয় ১৪ হাজার ৭৬০ দশমিক ৯৭ পয়েন্টে। একই দিন সিএসইর দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৩৫ দশমিক ৮৪ ও ৩৮ দশমিক ৬৫ পয়েন্ট।
এ দিকে ১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে তাুিলকাভুক্ত খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি হিসেবে পরিচিত এএমসিএল (প্রাণ) ও ২০২৪ সালে ওষুধ ও রসায়ন খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানি টেকনো ড্রাগস আজ থেকে ‘এ’ ক্যাটাগরি থেকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে অবনয়ন ঘটেছে। অনুমোদিত ডিভিডেন্ড নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিতরণে ব্যর্থ হওয়ায় দুই ‘এ’ ক্যাটাগরি থেকে অবনমিত করে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আজ ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) ২০ মে ২০২৪ তারিখে জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অনুমোদিত লভ্যাংশ বিতরণ না করায় কোম্পানি দু’টিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে স্থানান্তর করা হয়েছে।
১৯৯৬ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির পর থেকে এএমসিএল একটি ভালো মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানি হিসেবে বিনিয়োগকারীদের কাছে পরিচিতি পেয়ে আসছে। তালিকাভুক্তির পর প্রতি বছরই কোম্পানিটি বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ দিয়ে আসছে। গত অর্থবছরেও কোম্পানি ৩২ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করে। কিন্তু সিকিউরিটিজ আইন অনুসারে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা শেয়ারহোল্ডারদের কাছে সাধারণ সভায় অনুমোদিত এ লভ্যাংশ বিতরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। একই সাথে কোম্পানিটি মার্জিন রুলসের বিধি অনুসারে আজ থেকে কোম্পানিটির শেয়ার ক্রয়ে কেউ মার্জিন ঋণ পাবে না। একইভাবে ২০২৪ সালে তালিকাভুক্ত টেকনো ড্রাগস লি. ২০২৪ সালে ১২ শতাংশ ও ২০২৫ অর্থবছরে ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করলেও ২০২৫ সালের এ লভ্যাংশ যথাসময়ে শেয়ারহোল্ডারদের হাতে পৌঁছতে ব্যর্থ হয়েছে। কারণে ‘জে’ ক্যাটাগরিতে অবনয়নের পাশাপাশি ওষুধ ও রসায়ন খাতের এ কোম্পানিটিও আজ কোনো মার্জিন ঋণ পাচ্ছে না।
মঙ্গলবার ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষে ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের কোম্পানি এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ। এদিন ২৯ কোটি ১২ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৪৬ লাখ ২ হাজার শেয়ার হাতবদল হয়। ২২ কোটি ৪২ লাখ টাকায় ১৪ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে লেনদেনের দ্বিতীয় স্থানে ছিল ইসলামী ব্যাংক। ডিএসইতে লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, ব্র্যাক ব্যাংক, সিমটেক্স ইন্ডাস্ট্রিজ, প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স ও সিটি ব্যাংক।
একইদিন ডিএসসির মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল টেক্সটাইলস খাতের শাশা ডেনিমস। ওই দিন কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ১০ শতাংশ। ৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল আল আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক। মূল্যবৃদ্ধিতে ডিএসইর শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বিডি থাই ফুডস, জনতা ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ফু ওয়াং সিরামিকস, সিএপিএম আইবিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, কনফিডেন্স সিমেন্ট, সামিট পাওয়ার, বিডি থাই অ্যালুমিনিয়াম ও ওয়ালটন হাইটেক ইঞ্জিনিয়ারিং।