সংবাদ সম্মেলনে ড. খলিলুর রহমান

রোহিঙ্গাদের ফেরাতে দরকার আরাকানে স্থিতাবস্থা

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
1st-3
প্রধান উপদেষ্টার হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমান সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন : পিআইডি
  • জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানেই হবে সমাধান
  • আগামী বছরের ঈদ তারা দেশে করবে, সব পক্ষের সাথে আলোচনা চলছে
  • আমাদের ঘাড়ে আরেকটা গাজা বসে আছে, এটা নিয়ে কোনো আলাপ-আলোচনা নাই
  • দোভালের সাথে কী আলাপ হলো জানাব আমার স্মৃতি কথায়

প্রধান উপদেষ্টার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান বলেছেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ফেরাতে জাতিসঙ্ঘসহ সব পক্ষের সাথে আলোচনা অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ। প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন, ‘আগামী বছরের ঈদ তারা দেশে গিয়ে করবে’- সেটাই আমাদের লক্ষ্য। তবে তিনি এ-ও জানান, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য আরাকানে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে সেটার অভাব রয়েছে। এটা নিরসনে জাতিসঙ্ঘ, বিভিন্ন সংস্থা ও দেশের সাথে এ নিয়ে আলোচনা চলছে।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডের ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে গত ৩ ও ৪ এপ্রিল থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিমসটেক সম্মেলনের সার্বিক বিষয় নিয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে খলিলুর রহমান এসব কথা বলেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, উপপ্রেস সচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীর উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান উপদেষ্টার উচ্চপর্যায়ের এ প্রতিনিধি জানান, এ সম্মেলনে আমাদের একটা বড় অর্জন হলো প্রধান উপদেষ্টা আগামী ২ বছরের জন্য বিমসটেক-এর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, বিমসটেককে একটি গতিশীল সংস্থা হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার। বিমসটেক সদস্যদের মধ্যে যেমন দক্ষিণ এশিয়ার দেশ আছে, তেমনি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার থাইল্যান্ডও আছে। সুতরাং এ দু’টি অঞ্চলের একটি যোগসূত্র এবং দুই অঞ্চলের ইকোনমিক ডায়নামিজম (অর্থনৈতিক গতিশীলতা/প্রাণচাঞ্চল্য) অর্জন করার প্রটেনশিয়াল তার আছে। আগামী দুই বছর বিমসটেক-এর চেয়ারম্যান ও সচিবালয় দুটোই ঢাকায় থাকবে। আমরা একযোগে কাজ করতে পারব আশা করছি। বিশেষ করে বিমসটেক-এর এফটিএ (ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট), যেটা নিয়ে অনেক বছর ধরে কথাবার্তা হচ্ছে। যদিও অগ্রগতি খুব একটা হয়নি। এ ক্ষেত্রে আমরা প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করতে চেষ্টা করব।

খলিলুর রহমান বলেন, বিমসটেক সম্মেলনে সদস্যভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট করপোরেশন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আশা করছি আগামী বছরগুলোতে এ দেশগুলোর মধ্যে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন, বন্দর ব্যবস্থাপনা-আঞ্চলিক সহযোগিতা আরো দৃঢ় হবে। কানেক্টিভিটি আরো ইনক্লুড হবে। শুধু সমুদ্র উপকূলবর্তী নয়, সকল দেশই উপকৃত হবে। এ ছাড়া এ সম্মেলনের ফাঁকে প্রধান উপদেষ্টা ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ভুটান, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেছেন। ড. ইউনূসের সাথে দেখা করেছেন মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া পররাষ্ট্র উপদেষ্টা ও পররাষ্ট্র সচিব তাদের কাউন্টার পার্টের সাথে বৈঠক করেছেন।

মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিমসটেক সম্মেলনের সাইড লাইনে আমার সাথে আলোচনা করেছেন। একটা বড় অগ্রগতি হয়েছে, সেটা হলো আমরা ২০১৮-২০ সালে ৬ কিস্তিতে ৮ লাখ রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছিলাম, তারা জানালেন ২ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা রিভিউ করেছে। তার মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে তারা আইডেন্টিফাই করেছে যে, এরা মিয়ানমার থেকে এসেছে (বাংলাদেশে)। বাকি ৭০ হাজার রোহিঙ্গার ছবি এবং নাম নিয়ে কনফিউশনে আছে তারা। এটা নিয়ে উভয়পক্ষই আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাব। একই সাথে তারা আমাদের বলেছেন যে, বাকি ৫ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গার তালিকা রিভিউ দ্রুততার সাথে সম্পন্ন করবেন।

১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা ফেরাতে কতদিন লাগতে পারে- এমন প্রশ্নের জবাবে ড. খলিলুর রহমান জানান, এরা (১ লাখ ৮০ হাজার) কালকেই চলে যাবে, এমনটা নয়, একটা প্রক্রিয়া আছে। তারা যেখানে যাবেন, সেখানকার এখন কী অবস্থা, জীবন-জীবিকার সংস্থান আছে কি না, শুধু রোহিঙ্গা প্রত্যাবসন নয় যেকোনো প্রত্যাবাসনে এ ধরনের বিষয়গুলো আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে। আমরা সব পক্ষের সাথে যোগাযোগ রাখছি। তাদের ফিরিয়ে দেয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে আমরা রাখাইনের আরাকান আর্মির সাথেও আলাপ আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। একথা বলতে পারি ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরাতে পারব, তবে সময় লাগবে। এ জন্য মিয়ানমারের সংশ্লিষ্ট বা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এবং আমাদের যেসব বন্ধু দেশ রয়েছে, সবার সাথে মিলে কাজ করতে হবে। আমাদের প্রধান উপদেষ্টা বলেছেন যে, ‘আগামী বছরের ঈদ তারা দেশে গিয়ে করবে- সেটাই আমাদের লক্ষ্য’।

আমাদের ঘাড়ে আরেকটা গাজা বসে আছে : দেশে যখন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের নিয়ে সরকার সম্মেলন করছে সেই মুহূর্তে বেশ কয়েকটি বিদেশি কোম্পানি/ প্রতিষ্ঠানে হামলা/ লুটপাটের ঘটনা ঘটছে- এ প্রসাথে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধান উপদেষ্টার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি বলেন, আমরা একটা জিনিস লক্ষ করেছি। আমরা যখন ভালো কাজ করতে গেছি, অকস্মাৎ কিছু সমস্যা উদ্ভব হয়েছে। ভালো কাজগুলো ডিলে করার প্রচেষ্টা বলেই ধারণা। তিনি বলেন, গাজাতে ইসরাইলি কর্মকাণ্ডে সারা বিশ^ ক্ষুব্ধ, বাংলাদেশে শক্ত প্রতিক্রিয়া আছে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক যেটা মনে হয় যে, আমাদের ঘাড়ে একটা গাজা বসে আছে। রোহিঙ্গা- এটা নিয়ে আমাদের মিছিল মিটিং নাই। এটা নিয়ে আলাপ আলোচনা নাই। আছে হলো এগুলো (গাজা নিয়ে) রাস্তায় নেমে লুটপাট করা। এটা বন্ধ করতে হবে। আমার ঘরের সমস্যা আগে মিটমাট করতে হবে।

দোভালের সাথে কী আলাপ হলো : ব্যাংককে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সাথে খলিলুর রহমানের একান্ত আলাপের ছবি ভাইরাল হয়েছে- কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর দু’দিন আগে আমেরিকার ডেপুটি ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজারের সাথে আমার আলাপ হয়েছে। সেখানে নানান বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি হোয়াইট হাউজে বসেন। মিস্টার দোভালের সাথে আমার অনেকক্ষণ আলাপ হয়েছে। আমি সব জানাব, আমার স্মৃতি কথায়।

জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানেই সমাধান : আরাকানের ৮০ শতাংশ আরাকান আর্মির দখলে। সেক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন বিলম্বিত করবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার কমিশনার বলেছেন যে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান। তারপর জাতিসঙ্ঘের মহাসচিব এলেন, তিনিও একই কথা বললেন। আমরা গেলাম চীনে, সেখানে জয়েন্ট স্টেটমেন্টে দেখবেন, সেখানেও বলা হলো প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান। একই সাথে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে প্রথমবারের মতো আমরা একটা সংখ্যা (১ লাখ ৮০ হাজার) পেলাম। গত ৮ বছরে এ সংখ্যাটা ছিল না। তিনি বলেন, আপনি তো একটা জনগোষ্ঠীকে আগুনের মধ্যে ঠেলে দিতে পারেন না। তার নিরাপত্তা আপনাকে দেখতে হবে। সেখানে গিয়ে যাতে তারা জীবনযাত্রা শুরু করতে পারে, এটা নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। আমরা একা পারব না। সবাইকে সাথে নিয়ে করতে হবে। আমরা এ কাজটিই করছি। আরাকানে যাতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা দ্রুত ফিরে আসে, সেখানে যে মানবিক সমস্যা আছে সেটা নিরসনে আমরা আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের সাথে কাজ করছি। চেষ্টা করছি সেখানকার মানবিক সমস্যা দ্রুত নিরসনের। সেজন্য দরকার সেখানকার বিবদমান দু’পক্ষের যুদ্ধবিরতি। আমরা এবং জাতিসঙ্ঘ যখন সেখানে মানবিক সহায়তা দেবে, আশা করছি যে, দুই পক্ষই যুদ্ধাবস্থা পরিহার করবে এবং তা থেকেই একটা স্থিতির সূচনা হবে বলে আমরা আশা করছি। সেই মুহূর্তের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তবে খুব বেশি দেরি নেই। সেই সময় থেকে আমরা প্রত্যাবাসনে বাস্তব আলোচনা করতে পারব।

এক প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, আমি জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের কাছে বলেছি, রাখাইনে যে মানবিক সমস্যা ও সঙ্কট সেটা মোকাবেলার জন্য আন্তর্জাতিক সাহায্যের বিকল্প নাই। সে কাজটি জাতিসঙ্ঘের তত্ত্বাবধানেই হবে। বাংলাদেশ হচ্ছে একমাত্র চ্যানেল, যার মাধ্যমে এটা করা সম্ভব। তিনি বলেন রাখাইনরা নির্যাতিত হয়েছে, সেটা যেমন অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়। তেমনি আরাকানিদের অনেকে না খেয়ে আছে, ওষুধপত্র পাচ্ছে না। এ যুদ্ধে তাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উভয় পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের সাহায্য সহযোগিতা করা আমাদের দায়িত্ব।

রাখাইনে শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ কাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক কাজই গত ৮ বছর আমরা করি নাই। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের জন্য আরাকানে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি। একটা শান্তিময় পরিবেশ তৈরি না হলে যুদ্ধের মধ্যে ঠেলে দিতে পারেন না। সবাই যাওয়ার জন্য মুখিয়ে আছেন। জাতিসঙ্ঘ মহাসচিব রোহিঙ্গা ক্যাম্পে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন তোমরা কি যেতে চাও? সবাই বলেছে যেতে চায়; কিন্তু এ যাওয়াটা যেন সবাই নিজের ইচ্ছায় যায়। বর্তমান যে যুদ্ধাবস্থা বা স্থিতির অভাব রয়েছে, এটা নিরসন না হলে তো হচ্ছে না। এ বিষয়ে সবাই আমাদের সাথে আছেন।

সার্ক শক্তিশালী করার বিষয়ে তিনি বলেন, সার্ককে ক্রিয়াশীল বা শক্তিশালী করতে প্রধান উপদেষ্টার চেষ্টার কমতি নেই।

শেখ হাসিনার ফেরত আনা প্রসাথে এক প্রশ্নের জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। তিনি বাংলাদেশ ও সরকারের বিরুদ্ধে যে বিষোদগার করছেন, সেই সুযোগ যেন ভারত সরকার তাকে না দেয়।

তিনি বলেন, সংখ্যালঘুর বিষয়টি আজকের নয়। এক সম্প্রদায়কে আরেক সম্প্রদায়ের পেছনে লাগিয়ে দেয়া, এটা ব্রিটিশের তৈরি। আমরা দুই পক্ষই ভিক্টিম। কোনো দেশের সংখ্যালঘুকে দাবিয়ে রাখা মানে হচ্ছে একটা জনগোষ্ঠীকে মূলস্রোতে আনতে পারছেন না। যেদেশেই এটা হচ্ছে, এটা লস।

এক প্রশ্নের জবাবে খলিলুর বলেন, গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ আগামী বছরই শেষ হচ্ছে। আমরা দু’পক্ষই যোগাযোগ রাখছি যাতে এ বিষয়ে আলোচনা স্মুথলিই শুরু হয়। আমাদের ধারণা ভারতের কাছ থেকে আমরা এ ব্যাপারে ভালো সহযোগিতা পাবো।

তিস্তার বিষয়েও তাদের জানিয়েছি। আমাদের দেশের ১৪ শতাংশ মানুষ তিস্তা অববাহিকায় বসবাস করে। তাদের জীবনজীবিকা-ভবিষ্যৎ-সবকিছুই নির্ভর করছে ওই এলাকার পানি প্রাপ্যতার ওপর। তিস্তা অববাহিকায় যাতে মিনিমাম পানি পাওয়া যায়, এটা নিশ্চিত করা বাংলাদেশ সরকারের বড় অগ্রাধিকার। ভারতের সাথে তিস্তা (পানি) চুক্তির চেষ্টা করছি। চুক্তি হলে তো আমাদের অন্যকিছু (মহাপরিকল্পনা) দরকার পড়ে না। একই সাথে অন্য অপশনগুলোতেও আগাচ্ছি। আমরা সব পক্ষের সাথে আলোচনা করছি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি স্পষ্ট করেই বলেছেন যে, বাংলাদেশের সাথে যে সম্পর্ক সেটা ব্যক্তি বা কোনো দলের সম্পর্ক নয়। এটা রাষ্ট্রের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্ক। আমরা কিন্তু তাই-ই মনে করি। এ পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ককে এগিয়ে নেবো।