আবারো বিতর্কিত সেই প্রকৌশলী বগুড়ায়

ফুঁসে উঠেছে নেসকো কর্মচারীরা

Printed Edition

বগুড়া অফিস

নেসকোর শ্রেণী পরিবর্তনে কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতিসাধনকারী বিতর্কিত বিদ্যুৎ প্রকৌশলী পদোন্নতি নিয়ে আবারো বগুড়ায় ফিরেছেন। তিনি হলেন বগুড়া বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ এর সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী ইমদাদুল হক। এবার তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হয়ে বগুড়ায় আসায় ফুঁসে উঠেছে নেসকো কর্মচারীরা। ভোক্তাদের হাজারো অভিযোগের প্রেক্ষিতে তাকে বদলি করা হলেও দুই মাসের ব্যবধানে তিনি বগুড়ায় ফিরে এসেছেন। পদোন্নতিপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ইমদাদুল হক মুঠোফোনে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি কোনো বক্তব্য মিডিয়াতে দিবেন না। তার অফিসে উপস্থিত হয়ে কথা বলতে হবে।

প্রকৌশলী ইমদাদুল হকের বগুড়া যোগদানের প্রতিবাদে নেসকো জাতীয়তাবাদী বিদ্যুৎ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন মানববন্ধনের ডাক দিয়েছে। নেতৃবৃন্দরা বলছেন, এ দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা বগুড়ায় যোগদান করলে তারা লাগাতার কর্মসূচি দিবেন। প্রয়োজনে কর্মবিরতি করে বগুড়ার নেসকো অচল করে দেয়া হবে। তবে নেসকোর কর্মকর্তারা বলছেন, যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হচ্ছে তিনি একজন সৎ এবং দক্ষ কর্মকর্তা। বগুড়ার উন্নয়নের স্বার্থে তাকে বগুড়ায় পদোন্নতি দিয়ে আনা হয়েছে।

নেসকো কর্মচারীদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো) বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগ-২ বগুড়ার তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী ইমদাদুল হকের বিরুদ্ধে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিদ্যুৎ সংযোগে শ্রেণী পরিবর্তন করে সরকারের বিপুল রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। ইমদাদুল হক গত তিন বছরে বগুড়ার নিশিন্দারা উপশহর হাউজিং এস্টেট, স্নিগ্ধা আবাসিক, শিববাটি এলাকায় অন্তত সাতটি বহুতল ভবনে এইচটি (উচ্চচাপ) সংযোগের পরিবর্তে এলটি (নিম্নচাপ) সংযোগ দিয়েছেন। নেসকোর নিয়ম অনুযায়ী ১৬ হাজার বর্গফুটের বেশি আয়তনের বা ৮০ কিলোওয়াট লোডের উপরের ভবনে এলটি সংযোগ দেয়া যায় না। কিন্তু নিয়ম ভঙ্গ করে অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে এলটি সংযোগ দেয়ায় সংযোগ ফি, মাসিক বিল, ডিমান্ড চার্জ ও ভ্যাট বাবদ সরকার কোটি টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। ওই সময় ২৭ হাজার বর্গফুট ভবনে এইচটির পরিবর্তে এলটি সংযোগ দেয়া হয়, যেখানে সরকার পেত এক লাখ ২০ হাজার টাকা। অথচ পেয়েছে মাত্র এক হাজার টাকা। ৩২ হাজার বর্গফুট স্থপতিয়া হাউজিং কমপ্লেক্সে ভবন নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ১৮টি চাইল্ড মিটার বসানো, ৪০ হাজার বর্গফুট বন্ধন টাওয়ার, ৩৬ হাজার বর্গফুট স্থপতিয়া এলিট টাওয়ার-১১ এবং ৪৫ হাজার বর্গফুট সেবা টাওয়ার। সব জায়গায় একইভাবে এলটি সংযোগ দিয়ে রাজস্ব ক্ষতি করেন। এ ছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, সংযোগ ফাইল অনুমোদনের জন্য তিনি অবৈধ সুবিধা গ্রহণ করেছেন।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ইমদাদুল সরাসরি নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পান এবং দলের বিশ্বস্ত লোক হিসেবে বিবেচিত ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পালানোর দিনে আওয়ামী ক্যাডারদের বিদ্যুৎ ভবনে আশ্রয় দেয়া ও রাতে নিরাপদে পালিয়ে যেতে সহায়তা করার অভিযোগও রয়েছে এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া জাতীয় শ্রমিক লীগ সমর্থক ছাড়া অন্য শ্রমিকদের বিল-ভাউচার আটকে রাখা এবং সরকারি গাড়ি ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

বিদ্যুৎ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের নেতারা বলেছেন, প্রকৌশলী ইমদাদ সে সময় অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করে বগুড়া শহরের সেউজগাড়ী এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন। শুধু বগুড়ায় নয়; রাজধানী ঢাকাতেও নামে-বেনামে তার একাধিক ফ্ল্যাট এবং বাড়ি রয়েছে বলে জানা গেছে। এত কিছুর পরও দুর্নীতিগ্রস্ত এ কর্মকর্তা তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেয়ে আবারো বগুড়ায় যোগদান করছেন। তার যোগদানের খবর ছড়িয়ে পড়ায় ফুসে উঠেছে নেসকো কর্মচারী ইউনিয়নসহ সচেতন মহল।

নেসকো জাতীয়তাবাদী বিদ্যুৎ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা মো: সোহরাব হোসেন লাইজু বলেছেন, যে প্রকৌশলী সরকারের কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট করেছেন তিনি আবার বগুড়ায় এলে শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেবেন। তার বগুড়া যোগদানের প্রতিবাদে নেসকো জাতীয়তাবাদী বিদ্যুৎ শ্রমিক কর্মচারী ইউনিয়ন কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন। প্রয়োজনে কর্মবিরতি করে বগুড়ার নেসকো অচল করে দেয়া হবে।

উল্লেখ্য, দৈনিক নয়া দিগন্তে তার বিরদ্ধে দুর্নীতির সংবাদ প্রকাশ হলে নেসকোর কর্মচারীদের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এরপর তাকে নওগাঁ জেলায় বদলি করা হয়।