ভয়ঙ্কর আর্থিক ঝুঁকিতে ১২২ সরকারি প্রতিষ্ঠান
মোট দায় ৮.৩৩ লাখ কোটি টাকা
Printed Edition
দেশের ১২২টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান তীব্র আর্থিক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। বিগত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা অপশাসন, অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পুঞ্জীভূত দায়ের পরিমাণ এখন দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ কোটি টাকায়। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক ‘আর্থিক ঝুঁকি বিবৃতি’ পর্যালোচনায় এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের পর নতুন করে আর কোনো সমন্বিত ঝুঁকি বিশ্লেষণ না হলেও বর্তমানে এই সম্মিলিত দায়ের পরিমাণ ১০ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি, শিল্প ও বিমান খাতের আর্থিক বিপর্যয় এখন চরম পর্যায়ে।
প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোট দায়ের মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশটিই রয়েছে সরকারের কাছে বকেয়া। ‘সাবসিডিয়ারি লোন অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এসএলএ) এবং ‘লোন অ্যাগ্রিমেন্ট’ (এলএ)-এর অধীনে বাংলাদেশ সরকারের কাছে বকেয়া দায়ের পরিমাণ ৩ লাখ ৫০ হাজার ৬৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা, যা মোট দায়ের ৪২.০১%। এর বাইরে ২০২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট প্রচ্ছন্ন দায়ের পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ৪৩৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ১২২টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান (এসওই) এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার সুশাসন ও কর্মক্ষমতার বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলোকে ঝুঁকির মাত্রাভেদে নি¤েœাক্তভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এতে খুব উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৯টি যার শতকরা হার ১৫%; উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩০টি (২৫%); মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৫০টি (৪১%); কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১৮টি (১৫%); আর একেবারে কম ঝুঁকিপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা পাঁচটি (৪%)।
ঝুঁকিতে থাকা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম বড় সমস্যা হলো আর্থিক জবাবদিহিতার অভাব ও চরম অস্বচ্ছতা। ফিন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) দেশের ৩৯২টি সরকারি কোম্পানি, সংস্থা, করপোরেশন ও কর্তৃপক্ষকে তাদের অডিট করা আর্থিক প্রতিবেদন জমা দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ২৮৪টি প্রতিষ্ঠানই প্রতিবেদন জমা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এফআরসি কর্মকর্তাদের ধারণা, আর্থিক হিসাব সঠিকভাবে তৈরি না করার কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলো তা জমা দিতে পারছে না। এমনকি অর্থ বিভাগের মূল্যায়নে থাকা ১২২টি প্রধান প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও অনেকেই সময়মতো অডিট রিপোর্ট দেয়নি।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক অভিঘাত ও ঝুঁকির কারণ
অর্থ বিভাগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ নানাবিধ সামষ্টিক অর্থনৈতিক সঙ্কটের কারণে ‘এসওই’ বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে গেছে। প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে :
জিডিপি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি : বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ প্রবৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ায় বিভিন্ন খাতে সরকারি সেবার চাহিদা কমে গেছে, যা সরাসরি রাজস্ব আদায়ে আঘাত করছে।
মূল্যস্ফীতি ও ডলারের অবমূল্যায়ন : উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক বাজারে ভোগ্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং টাকা-ডলারের বিনিময় হারের অস্থিরতার কারণে উৎপাদন, পরিচালন এবং ঋণ পরিশোধের ব্যয় আকাশচুম্বী হয়েছে।
উচ্চ সুদের হার : ব্যাংকিং খাতে উচ্চ সুদের হারের কারণে নতুন ঋণের সহজলভ্যতা সীমিত হয়ে পড়েছে, যা তারল্য সঙ্কটকে আরো ঘনীভূত করেছে।
নীতিগত ও আইনি জটিলতা : আইনি গ্যাঁড়াকলের কারণে সময়মতো শুল্ক বা ট্যারিফ (বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে) সমন্বয় করা যায় না। ফলে আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে।
রেমিট্যান্সের প্রভাব : সামগ্রিক অর্থনীতিতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের প্রবাহ কমলে এই ঝুঁকি স্থায়ী আর্থিক বোঝায় পরিণত হয়, যা সামাল দিতে শেষ পর্যন্ত সরকারকে জরুরি রাষ্ট্রীয় তহবিল বা করদাতাদের টাকা দিয়ে ‘বেইল-আউট’ করতে হয়।
অর্থ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, “২০২৩-২৪ অর্থবছরের পর সামগ্রিক পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, অপশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির খেসারত দিচ্ছে এই খাতগুলো। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বিমান কিংবা শিল্প খাতের লোকসান যেভাবে বাড়ছে, তাতে দ্রুত বড় ধরনের কাঠামোগত ও আইনি সংস্কার না করলে এই বিশাল দায় পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ৮.৩৩ লাখ কোটি টাকার দায় প্রকারান্তরে জাতীয় বাজেটের ওপর বিশাল চাপ। সরকার যখন ঘাটতি বাজেট মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন এই প্রতিষ্ঠানগুলোর দায় মেটাতে গিয়ে এডিপি বা উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ কাটছাঁট করতে হতে পারে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশই এই দুর্বল সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কারণে। ফলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা কর্মসংস্থান ও বেসরকারি বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিচ্ছে।
সরকারি খাতের বৈদেশিক ঋণ কমেছে
এ দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুনে সরকারি খাতের মোট বৈদেশিক ঋণ ছিল ৯৩ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার। ২০২৬ সালের মার্চে তা কমে হয়েছে ৯০ দশমিক ৯১ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রায় ২ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন ডলার হ্রাস পেয়েছে।
এর মধ্যে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক ঋণ ৮০ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৭৯ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। সরকারি ঋণের প্রধান অংশই বিদেশী উন্নয়ন সহযোগী ও বহুপক্ষীয় সংস্থার ঋণ, যা মার্চ ২০২৬-এ দাঁড়িয়েছে ৭৯ দশমিক ১৬ বিলিয়ন ডলারে।
অন্য দিকে সরকারি বন্ডের দায়ও কমেছে। ২০২৫ সালের জুনে সরকারি বন্ডের পরিমাণ ছিল ৬৬১ মিলিয়ন ডলার, যা মার্চ ২০২৬-এ কমে ৫৬১ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে।
রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈদেশিক দায়ও কমেছে। ২০২৫ সালের জুনে এ খাতে মোট দায় ছিল ১৩ দশমিক ২২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৬ সালের মার্চে কমে হয়েছে ১১ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলার।
বিশেষ করে দীর্ঘমেয়াদি দায় ৮ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৮ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছে। একই সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দীর্ঘমেয়াদি বৈদেশিক দায় ৩ দশমিক ৫৫ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার সরকারের বিদেশী দায়-দেনা কমানোর ব্যাপারে বিশেষ দৃষ্টি দেয়ায় সরকারি বিদেশী ঋণ কমেছে বলে জানা গেছে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বৈদেশিক দায় কমা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য ইতিবাচক সঙ্কেত হলেও এসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগ দক্ষতা বাড়ানো এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।