দুর্নীতি বরদাশত করা হবে না : চিফ প্রসিকিউটর

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মো: আমিনুল ইসলাম। গতকাল মঙ্গলবার নিজ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এই হুঁশিয়ারি দেন। সদ্য সাবেক প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে ঘুষের বিনিময়ে আসামিকে খালাস করিয়ে দেয়ার একটি অডিও ফাঁস হওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে সৃষ্ট আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এই অবস্থান স্পষ্ট করেন।

চিফ প্রসিকিউটর জানান, সংবাদ মাধ্যমে ফাঁস হওয়া অডিওর বিষয়টি নজরে আসার পর পরই তিনি প্রসিকিউশন টিমের জরুরি বৈঠক ডাকেন। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করা হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর নিজেই এই তদন্ত প্রক্রিয়া সরাসরি তত্ত্বাবধান করবেন বলে জানিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, যে মামলার অডিও ফাঁস হয়েছে, সেই মামলার ফাইলটি তিনি নিজে তলব করেছেন এবং প্রাথমিকভাবে সেটির বিষয়ে খোঁজখবর নেয়া হয়েছে। অভ্যন্তরীণ তদন্তের স্বার্থে অনেক তথ্য এখন প্রকাশ করা সম্ভব নয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।

এই ধরনের ঘটনা ট্রাইব্যুনালের পুরো বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের সাথে একমত পোষণ করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের ঘটনা ট্রাইব্যুনালের ইমেজ সঙ্কটের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং স্বাভাবিকভাবেই বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠে। তিনি উল্লেখ করেন, ট্রাইব্যুনালের দায়িত্ব গ্রহণের শুরু থেকেই তিনি প্রসিকিউটরদের সতর্ক করে এসেছিলেন যে, কোনো ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ তিনি সহ্য করবেন না।

শুধু সাইমুম রেজা তালুকদার নয়, ৫ আগস্টের পর ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রসিকিউশনের প্রতিটি কার্যক্রম অভ্যন্তরীণ তদন্তের আওতায় আনার ঘোষণা দিয়েছেন আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, অতীতে বা বর্তমানে, এমনকি অনলাইন মাধ্যম কিংবা ফরমাল অভিযোগ যেকোনো পন্থায় আসা দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে তার সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য একটি রায়ের পর এক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির তোলা ঘুষের অভিযোগের প্রসঙ্গটিও তিনি গুরুত্বসহকারে দেখবেন বলে জানিয়েছেন।

সাবেক চিফ প্রসিকিউটরের সময়কার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পূর্বের সময়ের সফলতা বা ব্যর্থতার মূল্যায়ন করার দায়িত্ব দেশবাসীর। তবে বর্তমান তদন্তের স্বার্থে তিনি সাবেক চিফ প্রসিকিউটরের নলেজ বা তার গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে জানার জন্য তার সহযোগিতা চাইবেন।

এই অপরাধের বিচার কোন আইনে ‘ট্রাইব্যুনাল আইনে নাকি প্রচলিত আইনে হবে’ তা নির্ধারণের জন্য প্রসিকিউটর টিম খুব শিগগিরই বৈঠকে বসবে বলেও তিনি জানান। ভবিষ্যতে প্রসিকিউশনে কাজ করতে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের উদ্দেশে তিনি কড়া বার্তা দিয়ে বলেন, যদি কারো বিরুদ্ধে সামান্যতম দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া যায়, তবে তাকে আর প্রসিকিউশনে রাখা হবে না এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাকে অব্যাহতি দেয়া হবে।

এ দিকে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরে ওই বছরের ৭ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকার মো: সাইমুম রেজা তালুকদারকে সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদমর্যাদায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমে নিয়োগ দেন। এর আগে তিনি বেসরকারি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতেন। গণমাধ্যমের কাছে তালুকদার দাবি করেন, ‘আমি অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করছি। সরকার যদি লিগ্যাল ওয়েতে যায় সেটি ফেস করবো আমি।’

ঘুষ চাওয়ার যে অডিও রেকর্ডটি ফাঁস হয়েছে সেটি তার নয় দাবি করে বলেন, ‘এ জন্যই তো আমি ফেস করবো (আইনি প্রক্রিয়া)। আমি তো অপরাধ করি নাই, আমি কেন পালাবো।’

যদি ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ মিথ্যা হয় তা হলে কেন পদত্যাগ করেছেন এমন প্রশ্নে তালুকদার জানান, তিনি কয়েক দিন আগেই পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন, সেটি কাল গৃহীত হয়েছে। তালুকদার দাবি করেন, প্রসিকিউশনের একক কোনো ব্যক্তির পক্ষে এভাবে টাকা নিয়ে কাউকে জামিনে মুক্ত করিয়ে দেয়া সম্ভব না। এটা একটা টিমওয়ার্ক। মনে করেন যে, কেউ টাকা নিলো বা চাইলো বা নিলেও তার পক্ষে তখন সিঙ্গেল হ্যান্ডেডলি একটা ডিসিশন মেনিপুলেট করা বা কনসেন্ট তৈরি করা এগুলা সম্ভব না। সিস্টেমটাই এরকম না।

ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনে ‘টিম ডিসিশন’ হয় এবং পরে সিদ্ধান্ত দেন বিচারকরা তাই এককভাবে কারো পক্ষে এ ধরনের দুর্নীতি করা সম্ভব নয় বলে দাবি করেন তিনি।