ইতিহাস বদলের মঞ্চে ব্রাজিল
Printed Edition
ক্রীড়া প্রতিবেদক
বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব মানেই ভুলের কোনো সুযোগ নেই। একটি রাত, একটি ম্যাচ, একটি মুহূর্ত সব কিছুই বদলে দিতে পারে ভাগ্যের চিত্র। আজ রাত ২টায় শেষ ষোলোর লড়াইয়ে যখন পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল মুখোমুখি হবে নরওয়ের, তখন লড়াইটা শুধু কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার নয়, এটি ইতিহাস ভাঙা আর ইতিহাস ধরে রাখারও।
কাগজে-কলমে ব্রাজিল স্পষ্ট ফেবারিট। বিশ্বকাপের সর্বকালের সফলতম দল, আক্রমণে ভিনিসিয়াস জুনিয়র, নেইমার, মাতেউস কুনিয়া, মাঝমাঠে ব্রুনো গিমারাইস, গোলপোস্টে অ্যালিসনের মতো তারকায় ঠাসা দল। কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে ব্রাজিল ধীরে ধীরে নিজেদের ছন্দ ফিরে পেয়েছে। জাপানের বিপক্ষে রাউন্ড অব ৩২-এ ২-১ গোলের জয়ও এসেছে শেষ মুহূর্তের নাটকীয়তায়। কিন্তু ব্রাজিলের সামনে আজ এমন এক প্রতিপক্ষ, যাদের বিপক্ষে ইতিহাস কখনোই কথা বলেনি সেলেসাওদের পক্ষে। এখন পর্যন্ত চারবার মুখোমুখি হয়েছে দুই দল। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, একবারও জিততে পারেনি ব্রাজিল। দু’টি ম্যাচে জয় নরওয়ের, বাকি দু’টি ড্র। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে নরওয়ের ২-১ গোলের সেই ঐতিহাসিক জয় এখনো ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য এক তিক্ত স্মৃতি। বিশ্বকাপে এই দুই দলের সেটিই একমাত্র সাক্ষাৎ আর এবার ২৮ বছর পর আবারো বিশ্বকাপ মঞ্চে মুখোমুখি তারা।
অবশ্য পরিসংখ্যানের এই গল্পে বর্তমানের বাস্তবতাও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এই বিশ্বকাপে ব্রাজিলের আক্রমণভাগ ধীরে ধীরে ভয়ংকর হয়ে উঠছে। ভিনিসিয়াস জুনিয়র প্রতিপক্ষ রক্ষণে নিয়মিত আতঙ্ক ছড়াচ্ছেন। মাতেউস কুনিয়া গোল করার পাশাপাশি আক্রমণ তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। জাপানের বিপক্ষে বদলি নেমে ম্যাচ জেতানো গোল করেছেন গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লি। অন্যদিকে ইনজুরি কাটিয়ে নেইমার পুরোপুরি প্রস্তুত। ফলে ব্রাজিলের আক্রমণে বিকল্পের অভাব নেই।
তবে নরওয়ের সবচেয়ে বড় ভরসার নাম আলির্ং হলান্ড। এই বিশ্বকাপে গোলের পর গোল করে দুর্দান্ত ছন্দে আছেন ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার। আইভরি কোস্টের বিপক্ষে শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করা ম্যাচেও করেছেন জয়সূচক গোল। শুধু গোল করাই নয়, তাঁর শারীরিক শক্তি, বক্সে উপস্থিতি এবং অল্প সুযোগ থেকে ম্যাচ ঘুরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা নরওয়েকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। তাকে সমর্থন দিচ্ছেন অধিনায়ক মার্টিন ওডেগার্ড, যিনি মাঝমাঠ থেকে পুরো দলের ছন্দ নিয়ন্ত্রণ করছেন। নরওয়ের আত্মবিশ্বাসের আরেকটি কারণ তাদের সাম্প্রতিক অর্জন। ১৯৯৮ সালের পর এবারই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেয়েছে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দলটি। আইভরি কোস্টকে ২-১ গোলে হারিয়ে তারা দেখিয়ে দিয়েছে, বড় মঞ্চে চাপ সামলানোর মানসিকতা তাদের আছে।
তবে অভিজ্ঞতার পাল্লা এখনো অনেক ভারী ব্রাজিলের দিকেই। বিশ্বকাপে এটি তাদের অসংখ্য নকআউট ম্যাচের আরেকটি অধ্যায়। অন্যদিকে নরওয়ের জন্য প্রতিটি ম্যাচই যেন নতুন ইতিহাস লেখার সুযোগ।
মাঝমাঠের লড়াইটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। ব্রুনো গিমারাইস ও কাসেমিরোর অভিজ্ঞতার বিপরীতে ওডেগার্ডের সৃজনশীলতা ম্যাচের গতি নির্ধারণ করতে পারে। একই সাথে দুই গোলরক্ষক অ্যালিসন ও নওরইয়ান নাইল্যান্ড নিজ নিজ দলের জন্য বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। আরেকটি বিষয় ব্রাজিলকে ভাবাচ্ছে। ২০০২ সালের পর ইউরোপিয়ান দলের বিপক্ষে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে প্রত্যাশামতো সফল হতে পারেনি সেলেকাওরা। আনচেলত্তির দল সেই আক্ষেপও ঘোচাতে চাইবে এই ম্যাচে।
সব মিলিয়ে এটি শুধু ব্রাজিল বনাম নরওয়ের ম্যাচ নয়। এটি বিশ্ব ফুটবলের ঐতিহ্য বনাম সাহসী চ্যালেঞ্জারের লড়াই। একদিকে ষষ্ঠ শিরোপার স্বপ্নে বিভোর ব্রাজিল, অন্যদিকে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় লিখতে মরিয়া নরওয়ে। পরিসংখ্যান বলছে নরওয়ের দিকে, শক্তিমত্তা বলছে ব্রাজিলের দিকে। শেষ পর্যন্ত জিতবে কারা। গল্প ইতিহাস, নাকি বর্তমান? উত্তর মিলবে আজ রাতের ৯০ মিনিটেই।
সম্ভাবনার পাল্লা কার দিকে?
পরিসংখ্যানের খাতা নরওয়ের পক্ষেই কথা বলে। ব্রাজিলের বিপক্ষে চার দেখায় অপরাজিত স্ক্যান্ডিনেভিয়ানরা। আবার চলতি বিশ্বকাপে আর্লিং হলান্ডের দুর্দান্ত ফর্ম এবং মার্টিন ওডেগার্ডের সৃজনশীলতা তাদের স্বপ্ন দেখাচ্ছে আরো একবার ব্রাজিল-বধের। তবে নকআউট ফুটবলে ইতিহাসের চেয়ে বর্তমান ফর্মই অনেক সময় বড় হয়ে ওঠে। সেই জায়গায় ব্রাজিলের স্কোয়াডের গভীরতা, বেঞ্চের শক্তি এবং বড় ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে এগিয়ে। কার্লো আনচেলত্তির কৌশলী পরিকল্পনা, ভিনিসিয়াস জুনিয়রের গতি, নেইমারের অভিজ্ঞতা এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ ব্রাজিলকে সামান্য হলেও এগিয়ে রাখছে।
তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এই ম্যাচ একপেশে হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। নরওয়ে রক্ষণে শৃঙ্খলাবদ্ধ থেকে পাল্টা আক্রমণে সুযোগ খুঁজবে, আর ব্রাজিল বলের দখল রেখে ধৈর্যের পরীক্ষা নেবে প্রতিপক্ষের। প্রথম গোলটি যে দল করবে, ম্যাচের নিয়ন্ত্রণও অনেকটা তাদের হাতেই চলে যেতে পারে। সব কিছু বিবেচনায় এটি অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত গড়ানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে যদি ব্রাজিল নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দে খেলতে পারে এবং হলান্ডকে কার্যকরভাবে আটকে রাখতে পারে, তাহলে সেলেকাওদের কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট পাওয়ার সম্ভাবনাই একটু বেশি।