আ’লীগ নিষিদ্ধকরণ মঞ্চের আত্মপ্রকাশ : উত্তাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

কথা ছিল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে হবে না। কেন করা হবে না। আমরা বিপ্লবীরা কি মরে গেছি?

হারুন ইসলাম
Printed Edition
du
গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ মঞ্চ নামক সংগঠনের আত্মপ্রকাশ উপলক্ষে ঢাবিতে সমাবেশ | সংগৃহীত

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য প্রত্যাহার এবং গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটিকে নিষিদ্ধের দাবিতে গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকালও টিএসসিতে বিক্ষোভ করে ইনকিলাবমঞ্চ। এ ছাড়া রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ মঞ্চ নামে নতুন আরেকটি প্ল্যাটফর্মের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের (আইসিজি) প্রেসিডেন্ট ও সিইও কমফোর্ট ইরোর নেতৃত্বে আসা একটি প্রতিনিধিদলের সাথে আলোচনায় আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তবে দলটির যেসব নেতার বিরুদ্ধে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, তাদের বাংলাদেশের আদালতে বিচারের আওতায় আনার কথা বলেছেন তিনি।

এ ছাড়াও জুলাই অভ্যুত্থানের প্ল্যাটফর্ম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ ফেসবুক পোস্টে জানান, দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ফেরানোর ‘পরিকল্পনা’ চলছে। আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে ফেরাতে ‘আসন ভাগের’ প্রস্তাব দেয়া হয়েছে তাকে। আওয়ামী লীগকে ফেরানোর এই পরিকল্পনা ভারতের বলেও দাবি করেছেন হাসনাত।

মূলত খবরগুলো গণমাধ্যমে আসার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। গতকাল সারা দিনই নানা সংগঠনের ব্যানারে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি জানানো হয়। এ সময় প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্য প্রত্যাহার করতে হবে, ‘বিচার চাই, গণহত্যার বিচার চাই’, ‘সাঈদ ওয়াসিম মুগ্ধ, শেষ হয়নি যুদ্ধ’, ‘অবিলম্বে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ কর, করতে হবে’সহ নানা স্লোগান দেয়া হয়। শিক্ষার্থীরা জানান, আওয়ামী লীগ এদেশের মানুষের ভোটাধিকার হরণ, গুম, খুনের সাথে জড়িত। ফ্যাসিবাদী দল হিসেবে জনগণ ৫ আগস্ট তাদের প্রত্যাখ্যান করেছে। জনগণ আওয়ামী লীগের রাজনীতির ব্যাপারে রায় দিয়েছে। এখানে কোনো ‘যদি’ বা ‘কিন্তু’ নাই। যারা আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন করতে চান, তাদের হুঁশিয়ারি করতে চাই, জনগণ যেভাবে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়েছিল, যারা তাদের ফিরিয়ে আনার চক্রান্ত করবে তাদের বিরুদ্ধেও জনগণ যুদ্ধ ঘোষণা করবে।

সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এ বি জুবায়ের বলেন, যে দেশে আওয়ামী লীগ রক্ত ঝরিয়েছে, যারা গণহত্যায় জড়িত তাদের নিষিদ্ধ চায় ছাত্র-জনতা। গণহত্যার দায় নিয়ে অবশ্যই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে।

প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে শিক্ষার্থী এ বি জুবায়ের বলেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত কোনো নির্বাচন জনগণ মেনে নেবে না।

গণহত্যাকারী আ’লীগ নিষিদ্ধকরণ মঞ্চের আত্মপ্রকাশ

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) ‘গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণ মঞ্চ’ নামক একটি সংগঠনের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। শুক্রবার বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে এই প্লাটফর্মের ঘোষণা করা হয়। নতুন এই প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এ বি জোবায়ের। এ সময় তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ করার আগ পর্যন্ত এই প্ল্যাটফর্মের কার্যক্রম কর্মসূচি পালন করবে এবং আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ হওয়ার সাথে সাথে এই প্ল্যাটফর্মের কাজ সমাপ্ত হবে।

এর আগে বিকেল সোয়া ৩টায় ‘আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো পরিকল্পনা নেই’- শীর্ষক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবিতে এবং আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন তারা।

আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধের দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের বিক্ষোভ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ইনকিলাব মঞ্চ। গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে মিছিলটি শুরু হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ‘আমার সোনার বাংলায় আওয়ামী লীগের ঠাঁই নাই; আওয়ামী লীগের ঠিকানা এই বাংলায় হবে না’ ইত্যাদি নানা স্লোগান দিতে থাকেন।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান বিন হাদি বলেন, আড়াই তিন বছর বিএনপি ক্ষমতায় থাকবে। এরপর আওয়ামী লীগ ভারত ইসরাইলকে সাথে নিয়ে এমন ষড়যন্ত্র করবে; তিন বছরের মাথায় বিএনপিকে লাথি মেরে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেবে। সেই আওয়ামী লীগ ভারতের সহায়তায় ক্ষমতায় এসে দুই হাজার শহীদের বাবা-মা, ভাইবোনদের কচুকাটা করবে। ৫০ হাজার আহতের প্রত্যেককে ধরে ধরে কচুকাটা করবে। সুতরাং আহত শহীদ পরিবার এবং জুলাই যোদ্ধাদের বাঁচাতে রক্ত থাকতে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন করতে দেবো না। তাই, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়ব না।

ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অধিকার নেই : বাগছাস

আওয়ামী লীগ গণহত্যাকারী সংগঠন। রাজনীতিতে তাদের ফেরানোর দুঃস্বপ্ন কোনো দিন পূরণ হবে না বলে জানিয়েছেন জুলাই অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেয়া ছাত্রদের সংগঠন বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ (বাগছাস)। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে এ মন্তব্য ব্যক্ত করেন তারা।

সংগঠনটির মুখ্য সংগঠক সমম্বয়ক তাহমীদ আল মুদ্দাসসীর চৌধুরী বলেন, গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৬ থেকে ১৭ বছর ক্যাম্পাসে একের পর এক হত্যা সংঘটিত করেছে। জুলাই অভ্যুত্থানের পরে তাদের পতন হয়েছে। অভ্যুত্থানের স্পিরিটে গড়ে ওঠা ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানে জনগণ তাদের ব্যাপারে রায় জানিয়ে দিয়েছে।

তিনি আরো বলেন, দেশ স্বাধীনের পর প্রথম ফ্যাসিবাদ কায়েম করেছিল এই আওয়ামী লীগ। ’৭৫ এর ১৫ আগস্ট এই দেশের সিপাহি-জনতা ইতিহাসের ব্যাপারে রায় দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এদেশের অন্যান্য রাজনৈতিক দলের অদূরদর্শিতা ও ভুলের কারণে ফ্যাসিস্ট দলটি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তার ফলাফল আমরা দেখেছি। এদেশে দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদ জাতির ঘাড়ে জেঁকে বসেছিল। সর্বশেষ জুলাই অভ্যুত্থানে জনগণ তাদের হটিয়েছে। কিন্তু সেই ফ্যাসিবাদকে আবার ফেরানোর চক্রান্ত চলছে। আপনাদের এই দুঃস্বপ্ন কোনো দিনই পূরণ হবে না।

আ’লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে জবিতে বিক্ষোভ

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে সারা দেশের মতো বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরা।

গতকাল দুপুরে জুমার নামাজের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ থেকে শুরু হয়ে পুরো ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে এ মিছিল। এরপর মিছিলটি প্রধান ফটক হয়ে সদরঘাট-ভিক্টোরিয়া পার্ক ঘুরে আবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে অবস্থা নেয়।

এ-সময় ‘ওয়ান টু থ্রি ফোর, আওয়ামী লীগ নো মোর’, ‘এই বাংলায় হবে না আওয়ামী লীগের ঠিকানা’, ‘গড়িমসি বন্ধ করো, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করো’, ‘জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘আওয়ামী লীগের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে’, ‘লীগ আর বাংলাদেশ একসাথে চলে না’, ‘বাকশালের ঠিকানা, এই বাংলায় হবে না’, ‘২৪ এর হাতিয়ার, গর্জে ওঠো আরেকবার’, ‘ধরি ধরি ধরি না, ধরলে কিন্তু ছাড়ি না’, ‘ফাঁসি ফাঁসি চাই, খুনি হাসিনার ফাঁসি চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন শিক্ষার্থীরা।

সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী রায়হান রাব্বি বলেন, কথা ছিল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হবে। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে হবে না। কেন করা হবে না। আমরা বিপ্লবীরা কি মরে গেছি? জুলাই বিপ্লবে যারা আমাদের ভাইদের পাখির মতো হত্যা করেছে তাদের আমরা বেঁচে থাকতে এই বাংলাদেশে রাজনীতি করতে দেবো না। আমরা এখানে জড়ো হয়েছি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে। যত দিন না আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়, আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাবো।