গণহত্যাকারীদের বিচার হতেই হবে : ডা: শফিক
Printed Edition
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী আগ্রাসনের পর এবার দেশবাসী ভিন্ন আঙ্গিকে ঈদ উদযাপন করছে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেকের ঘরেই ঈদের আনন্দ নেই। অনেক মা তার সন্তানের জন্য কান্না করছেন। জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে যারা গণহত্যা চালিয়েছে এবং মানুষ হত্যা করেছে, তাদের বিচার হতেই হবে।
গত ৩১ মার্চ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে অনুষ্ঠিত ঈদের প্রথম জামাতে নামাজ শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, আমরা শহীদদের রূহের মাগফেরাত কামনায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে যারা জড়িত তাদের বিচার হতেই হবে। তাহলে এই শহীদদের পরিবার কিছুটা হলেও সান্ত¡না পাবে। তিনি বলেন, আমরা আগামীতে এমন একটি বাংলাদেশ প্রত্যাশা করি, যেখানে রক্তের হোলি খেলা হবে না। যেখানে মানুষের জীবনকে তুচ্ছ হিসেবে গণ্য করা হবে না। যেখানে মানুষ ভালোবাসা, সম্মান, মর্যাদা এবং সমতার ভিত্তিতে বসবাস করতে পারবে। এখানে ধর্ম বিবেচনায় মানুষকে প্রমাণ করা হবে না এবং তার অধিকার কেড়ে নেয়া হবে না।
জামায়াতের আমির বলেন, একজন নাগরিক হিসেবে সবাই সেখানে সমান অধিকার ভোগ করবে। আর এসব শুধু আল্লাহর কুরআনের আইন বাস্তবায়নের মাধ্যমে সম্ভব। আমরা এই সমাজের জন্য লড়াই করছি। আমরা ক্ষুধামুক্ত একটি সমাজ চাই।
এর আগে জামায়াত আমির ঈদের জামায়াতে অংশগ্রহণ করেন। ঈদের সালাত আদায় শেষে তিনি সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মুসল্লিদের সাথে ঈদের কুশলবিনিময় করেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের নায়েবে আমির ড. অ্যাডভোকেট হেলাল উদ্দিন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি ড. আব্দুল মান্নান ও কামাল হোসাইনসহ স্থানীয় জামায়াত নেতৃবৃন্দ।
শহীদ পরিবারের সাথে ঈদ কাটল জামায়াত আমিরের : জুলাই আন্দোলনে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান। গত সোমবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ঈদের জামাতে নামাজ শেষে শহীদদের বাসায় যান তিনি। এ দিন নামাজের পর জুলাই আন্দোলনের শহীদ ফারহানের পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন জামায়াত আমির। তিনি শহীদ ফারহানের মা-বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে শহীদ ফারহানের রূহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন।
একই দিন ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবরে আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের হামলায় শহীদ হওয়া সাইফুল্লাহ মো: মাসুম ও হাফেজ শিপনের পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান। তিনি শহীদ মাসুম ও শিপনের মা, বাবা ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে ঈদের কুশল বিনিময় করেন ও পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে তাদের রূহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন। এ ছাড়া সোমবার বিকেলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ দশম শ্রেণীর ছাত্র শাহরিয়ার খান আনাসের পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদের কুশলবিনিময় করেন তিনি। তিনি শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও তাদের সার্বিক খোঁজখবর নেন। এর আগে রোববার সন্ধ্যায় ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ ছয় বছরের শিশু জাবির ইব্রাহিমের পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন জামায়ত আমির। তিনি শহীদ জাবির ইব্রাহিমের বাবা, মা ও ভাইয়ের সাথে ঈদের কুশল বিনিময় করেন, পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে তার রূহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলনের শহীদ পিকআপ ভ্যানচালক রানা তালুকদারের পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করে তার মাতা, স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের সার্বিক খোঁজখবর নেন তিনি। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের আরেক শহীদ জুবায়েরের পরিবারের সদস্যদের সাথেও সাক্ষাৎ করেন ডা: শফিকুর রহমান। তিনি শহীদ জুবায়েরের বাবা এবং দুই সন্তানের সাথে ঈদের কুশল বিনিময় করেন ও পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং মহান আল্লাহর দরবারে শহীদ জুবায়েরের রূহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন। একই দিন জুলাই আন্দোলনের শহীদ আসাদুল্লাহর পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমান। তিনি শহীদ পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদের কুশলবিনিময় করেন, পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন। জামায়াত আমির শহীদ আসাদুল্লাহর স্ত্রীর সাথে কথা বলেন এবং তাদের সদ্যজাত সন্তানকে কোলে তুলে নেন ও পরম স্নেহ-মমতায় আদর করেন। জামায়াত আমির পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে শহীদ আসাদুল্লাহর রূহের মাগফেরাত কামনায় দোয়া করেন। জুলাই আন্দোলনে পানি বিতরণ করার সময় শহীদ মীর মুগ্ধের বাসায়ও যান জামায়াত আমির। তিনি শহীদ মীর মুগ্ধর বাবা, ছোট ভাইসহ পরিবারের অন্য সদস্যদের সাথে ঈদের কুশলবিনিময় করেন, পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে শহীদ মীর মুগ্ধর রূহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নিহত শহীদ তামীম ও শহীদ সিফাতের পরিবারের সদস্যদের সাথে ঈদের কুশলবিনিময় করেন ডা: শফিকুর রহমান। তিনি মিরপুরে শহীদ তামীম ও শহীদ সিফাতের বাবা, মা ও পরিবারের সদস্যদের সাথে সাক্ষাৎ করেন।
তিনি শহীদ পরিবারের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন, তাদের সার্বিক খোঁজখবর নেন এবং সবাইকে নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে শহীদদের রূহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির আব্দুর রহমান মূসাসহ স্থানীয় জামায়াত নেতৃবৃন্দ।
সরকারি তত্ত্বাবধানে ঈদ আনন্দ মিছিলে মূর্তি প্রদর্শনীতে নিন্দা জ্ঞাপন : সরকারি তত্ত্বাবধানে ঈদ আনন্দ মিছিলে মূর্তি প্রদর্শনীতে নিন্দা জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে সাধারণ মানুষের মাঝে ঈদ নিয়ে আলাদা ধরনের উৎসাহ উদ্দীপনা ছিল না। কিন্তু এবারের ঈদ সকলের মাঝেই যেন প্রকৃত ঈদ হয়ে ফিরে এসেছে। সরকারি উদ্যোগে সুলতানী আমলের মতো করে ঈদ উদযাপন আমাদের জীবনে আনন্দের নতুন মাত্রা তৈরি করেছে। কিন্তু ঢাকায় ঈদ মিছিলে মূর্তিসদৃশ প্রতীক নিয়ে অংশগ্রহণ আমাদের গভীরভাবে মর্মাহত করেছে। ঈদ মুসলিম উম্মাহর জন্য একটি পবিত্র উৎসব এবং ইসলাম মূর্তি, প্রতিমা বা কোনো দৃশ্যমান অবয়বের মাধ্যমে ধর্মীয় আনন্দ প্রকাশের অনুমতি দেয় না। ইসলামের ইতিহাসে এমন কোনো দৃষ্টান্ত নেই, যেখানে রাসূল সা:, সাহাবা বা পরবর্তী খলিফারা ঈদ উদযাপনে মূর্তি বা প্রতিমা বহন করেছেন। আমরা সংশ্লিষ্ট সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই-ঈদ আমাদের ধর্মীয় আবেগের বিষয়। একে সাংস্কৃতিক পরীক্ষাগারে পরিণত করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। ইসলামী ঐতিহ্যের বাইরে গিয়ে প্রতিমা সংস্কৃতি অন্তর্ভুক্তির প্রচেষ্টা ঈদকে ঘিরে সরকারি উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এই আনন্দ মিছিলকে জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সম্প্রতি ঈদ মিছিলে মূর্তিসদৃশ প্রতীক বহনের ঘটনা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা ও ঈদের পবিত্রতার পরিপন্থী। যারা ঈদ আয়োজনে অপ্রয়োজনীয় এই বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান করে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।
রিউমার স্ক্যানার ফ্যাক্ট চেক : মার্চে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের শিকার জামায়াতে ইসলামী : বাংলাদেশের ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার বলছে, এ বছর মার্চ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারকে জড়িয়ে ১৫টি এবং প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে জড়িয়ে ২২টি ভুল তথ্য ছড়ানো হয়েছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্যের শিকার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। চলতি বছরের মার্চ মাসে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ২৯৮টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে রিউমার স্ক্যানার। রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে। এর আগে গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে শনাক্ত হয় যথাক্রমে ২৭১ ও ২৬৮টি ভুল তথ্য। রিউমার স্ক্যানারের ওয়েবসাইটে গত মার্চে প্রকাশিত ফ্যাক্ট চেক থেকে গণনাকৃত এই সংখ্যার মধ্যে রাজনৈতিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি (১০৫) ভুল তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মিলেছে, যা মোট ভুল তথ্যের ৩৫ শতাংশ। এ ছাড়া জাতীয় বিষয়ে ১০৩টি, আন্তর্জাতিক বিষয়ে ১২টি, ধর্মীয় বিষয়ে ৩৬টি, বিনোদন ও সাহিত্য বিষয়ে তিনটি, শিক্ষা বিষয়ে তিনটি, প্রতারণা বিষয়ে ১২টি, খেলাধুলা বিষয়ে ১৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে মার্চে। এসব ঘটনায় ভিডিওকেন্দ্রিক ভুলই ছিল সবচেয়ে বেশি, ১৪৩টি। এ ছাড়া তথ্যকেন্দ্রিক ভুল ছিল ১১০টি এবং ছবিকেন্দ্রিক ভুল ছিল ৪৫টি। শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলোর মধ্যে মিথ্যা হিসাবে ১৬৮টি, বিভ্রান্তিকর হিসাবে ৯৭টি এবং বিকৃত হিসাবে ৩১টি ঘটনাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে। রিউমার স্ক্যানার গেল মাসের ফ্যাক্ট চেকগুলো বিশ্লেষণে দেখেছে, এই সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীকে (৭) জড়িয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসব ভুল তথ্যের ৮৬ শতাংশই দলটির প্রতি নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি করার সুযোগ রেখেছে। দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমানকে জড়িয়ে এই সময়ে দুইটি অপতথ্য (সবগুলোই বিপক্ষে) প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে এই সময়ে ৬টি (সবগুলোই বিপক্ষে) অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। প্লাটফর্ম হিসেবে গত মাসে ফেসবুকে সবচেয়ে বেশি ভুল তথ্য ছড়িয়েছে, সংখ্যার হিসেবে যা ২৭৩টি। এ ছাড়া এক্সে ৬২টি, টিকটকে সাতটি, ইউটিউবে ৪৪টি, ইনস্টাগ্রামে ২৬টি, থ্রেডসে অন্তত পাঁচটি ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। ভুল তথ্য প্রচারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি দেশের গণমাধ্যমও। ১৬টি ঘটনায় দেশের একাধিক গণমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রচার হতে দেখেছে রিউমার স্ক্যানার।