গাজায় ট্রাম্পের শান্তি প্রক্রিয়ায় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন নেতানিয়াহু

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

  • ধ্বংসস্তূপ থেকেই আবার ঘুরে দাঁড়াবে গাজা : আমিনা এরদোগান
  • নামাজরত ফিলিস্তিনি যুবককে গাড়িচাপা দেয়ার ভিডিও ভাইরাল

গাজায় যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে ক্রমেই হতাশ হয়ে পড়ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টারা। ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তাদের একাংশের ধারণা, নেতানিয়াহু ইচ্ছে করেই শান্তি প্রক্রিয়া ধীরগতির করে দিচ্ছেন এবং যুদ্ধবিরতি দুর্বল করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক খবরে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের ‘ইনার সার্কেল’ বা ঘনিষ্ঠ বলয়ের সদস্য ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার, শান্তিদূত স্টিভ উইটকফ এবং হোয়াইট হাউজের চিফ অব স্টাফ সুজি ওয়াইলস- সবাই নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে ‘ক্রমবর্ধমান হতাশা’ অনুভব করছেন। তারা মনে করছেন, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী গাজা যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়নে গড়িমসি করছেন এবং প্রক্রিয়াটি ব্যাহত করার মতো পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

তবে এক ইসরাইলি কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এই ইস্যুতে উইটকফ ও কুশনারের তুলনায় মার্কো রুবিও নেতানিয়াহুর অবস্থানের কিছুটা কাছাকাছি রয়েছেন। হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তার বরাতে খবরে আরো জানানো হয়, নেতানিয়াহু কার্যত ট্রাম্পের মূল উপদেষ্টা দলের সমর্থন হারিয়েছেন। যদিও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজে চুক্তিটি দ্রুত এগিয়ে নিতে আগ্রহী এবং এই মুহূর্তে তিনিই নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় সমর্থক হিসেবে পাশে রয়েছেন।

খবরে উল্লেখ করা হয়েছে, শান্তিদূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের প্রস্তাবিত পরিকল্পনা, বিশেষ করে গাজাকে নিরস্ত্রীকরণ করার ধারণা নিয়ে নেতানিয়াহু স্পষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এই নিরস্ত্রীকরণ প্রস্তাবটি বহুধাপের শান্তি পরিকল্পনার অন্যতম প্রধান অংশ। মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাথে মতবিরোধের বিষয়টি জানা সত্ত্বেও নেতানিয়াহু আগামিকাল সোমবার মার-এ-লাগোতে ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাৎ করবেন। সেখানে তিনি প্রেসিডেন্টকে আরো কঠোর অবস্থান গ্রহণের জন্য রাজি করানোর পরিকল্পনা করছেন বলে জানিয়েছেন একজন জ্যেষ্ঠ ইসরাইলি কর্মকর্তা।

চুক্তির প্রথম ধাপটি ১০ অক্টোবর কার্যকর হয়, যেখানে ইসরাইলি বন্দীদের মুক্তির বিনিময়ে ফিলিস্তিনি বন্দীদের মুক্তি দেয়া হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, এই ধাপে যুদ্ধবিরতি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি ইসরাইল পুরোপুরি রক্ষা করেনি। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরাইলি হামলায় অন্তত ৪১১ ফিলিস্তিনি নিহত এবং এক হাজার ১১৮ জন আহত হয়েছেন। চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে গাজা পরিচালনার জন্য একটি অস্থায়ী কারিগরি কমিটি গঠন, পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু, একটি শান্তি কাউন্সিল প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন, গাজা থেকে ইসরাইলি সেনা আরো প্রত্যাহার এবং হামাসকে নিরস্ত্রীকরণের বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

জাতিসঙ্ঘের হিসেবে, ইসরাইলি হামলায় বিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনে প্রায় সাত হাজার কোটি (৭০ বিলিয়ন) ডলার ব্যয় হবে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলের এই হামলায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৭১ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ।

ধ্বংসস্তূপ থেকেই আবার ঘুরে দাঁড়াবে গাজা : আমিনা এরদোগান

তুরস্কের ফার্স্ট লেডি আমিনা এরদোগান বলেছেন, ফিলিস্তিনিদের মতো তুরস্কও বিশ্বাস করে গাজা ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই আবার ঘুরে দাঁড়াবে। শুক্রবার ইস্তাম্বুলে ‘কালানলার (দ্য রেমন্যান্টস) প্যালেস্টাইন এক্সিবিশন’ শীর্ষক প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ক্যালিয়ন ফাউন্ডেশন ও তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের যৌথ আয়োজনে এই বিশেষ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়েছে। খবর আনাদোলুর।

অনুষ্ঠানে আমিনা বলেন, ‘মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের গাজা আজ ইতিহাসের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী, সবচেয়ে নিষ্ঠুর ও সবচেয়ে পদ্ধতিগত গণহত্যার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যা কোনো বিবেক সহ্য করতে পারে না। ভয়াবহ ধ্বংসের পরও সেখানে প্রায় ২০ লাখ মানুষ টিকে আছে, যারা কল্পনাতীত কঠিন পরিস্থিতিতে বেঁচে থাকার এবং গাজাকে টিকিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।’

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে ইসরাইলি বিমান হামলায় নিহত ফিলিস্তিনি কবি রিফাত আলারিরের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের দায়িত্ব হলো অবশিষ্টদের গল্প বলা, আন্তর্জাতিক আইন বাস্তবায়ন এবং এ নিষ্ঠুরতা অবিলম্বে বন্ধের জন্য আওয়াজ তোলা।’ ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনিরা নীরব নয় উল্লেখ করে তিনি একটি ঘটনার উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, ‘যে চিত্রশিল্পী তার আঁকার উপকরণ হারিয়েছেন, তিনি ফুটন্ত হাঁড়ির কালি দিয়ে ক্ষুধার ছবি আঁকেন। এভাবেই শিল্পের অনস্বীকার্য বাস্তবতা দিয়ে তিনি ধারণার খেলাকে ভেঙে দিচ্ছেন।’

তিনি আরো বলেন, ‘এক নারী কৃষি প্রকৌশলী জ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে সমুদ্রের পানি পানযোগ্য করেছেন, যা জ্ঞান দিয়েই অবরোধ পাশ কাটানোর চমৎকার উদাহরণ। ফিলিস্তিনকে রক্ষা করা মানে শুধু ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়, বরং সমগ্র মানবতা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সর্বোপরি মানুষ হিসেবে টিকে থাকার অধিকারকে রক্ষা করা।’

ক্যালিয়ন ফাউন্ডেশনের সভাপতি রেহান কালিয়নকু আনাদোলুকে জানান, প্রদর্শনীটি ফিলিস্তিনি জনগণের মর্যাদা, বিশ্বাস ও অস্তিত্ব রক্ষার চলমান সংগ্রামকে দৃশ্যমান করতেই আয়োজন করা হয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আঙ্কারায় নিযুক্ত ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত নাসরি আবু জাইশ, তুর্কি রেড ক্রিসেন্টের প্রেসিডেন্ট ফাতমা মেরিক ইলমাজ এবং কালিয়ন হোল্ডিংসের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান জামাল কালিয়নকু উপস্থিত ছিলেন। ইস্তাম্বুলের ক্যালিয়ন কালচারে আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে ছয়টি ভিন্ন ইনস্টলেশন ও একটি অভিজ্ঞতামূলক অংশ রাখা হয়েছে, যা আগামী ৩০ মার্চ পর্যন্ত চলবে। ফিলিস্তিন পরিস্থিতি সম্পর্কে দর্শনার্থীদের সচেতনতা বাড়াতে সেখানে ফিলিস্তিনি স্যুপ, বাগেল, জলপাই ও খেজুর পরিবেশন করা হয়।

নামাজরত ফিলিস্তিনি যুবককে গাড়িচাপা দেয়ার ভিডিও ভাইরাল

পশ্চিম তীরে রামাল্লার কাছে নামাজরত এক ফিলিস্তিনি যুবকের ওপর গাড়ি উঠিয়ে দেয় এক সশস্ত্র ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী। অস্ত্রধারী ওই ইসরাইলি নাগরিকের ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়িচাপা দেয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। জানা গেছে, বৃহস্পতিবার পশ্চিম তীরের দেইর জারির গ্রামে ঘটনাটি ঘটেছে।

ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়, অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন ইসরাইলি নাগরিক ও রিজার্ভ সেনাসদস্য। ঘটনার সময় তিনি বেসামরিক পোশাকে ছিলেন। একই দিনে ওই গ্রামে একটি গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটে। ওই ঘটনার সাথে একই ব্যক্তির সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে বলে তদন্তে নিশ্চিত করা হয়েছে। ইসরাইলের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এই হামলা ছিল তার ক্ষমতার গুরুতর অপব্যবহার। ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনায় অভিযুক্তের অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে এবং তার সামরিক দায়িত্ব বাতিল করা হয়েছে। ইসরাইলি আর্মি রেডিও জানিয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি দু’জন ফিলিস্তিনিকে গুলি করেছে।

একই দিন পশ্চিম তীরের বিভিন্ন এলাকায় আরো সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। হেবরনের দক্ষিণে মাসাফের ইয়াত্তায় সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা সেনাবাহিনীর পোশাক পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের আটক ও নির্যাতন করে বলে অভিযোগ করেছেন মানবাধিকারকর্মী ওসামা মাখামরা। পরে ইব্রাহিম আল-আদ্রা ও আব্দ মাহমুদ আল-আদ্রা নামে দুই ভাইকে সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেয়া হয় এবং তাদের গ্রেফতার করা হয়। এদিকে নাবলুসের বেইত ফুরিক এলাকায় সামরিক অভিযানের সময় ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরকে গুলি করে আহত করা হয়। একই অভিযানে টিয়ার গ্যাসের কারণে শ্বাসকষ্টে ভোগেন আরো বেশ কয়েকজন ফিলিস্তিনি।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলা দীর্ঘ দিন ধরেই চলমান। গাজায় যুদ্ধ শুরুর পর এসব হামলা আরো বেড়েছে। বিশেষ করে ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে এসব হামলা আরো তীব্র হয়েছে। ফিলিস্তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় অন্তত আট হাজার গাছ ধ্বংস হয়েছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৭০ লাখ মার্কিন ডলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। উত্তর ও মধ্য পশ্চিম তীরের কৃষিজমি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত দুই বছরে ইসরাইলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় পশ্চিম তীরে এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ২১৭ জন শিশু।

পশ্চিম তীরে বাড়ছে সহিংসতা ও আটক

প্রেস টিভি জানিয়েছে, পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও আটক অভিযান আরো তীব্র হয়েছে। ওয়াফা সংবাদ সংস্থার তথ্যমতে, গাজার পূর্বে হাফসা স্কুলের সামনে বসে থাকা অবস্থায় ইসরাইলি সেনারা উদাই আল-মাকাদমাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। পরে হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসকরা তার মৃত্যু নিশ্চিত করেন।

গত ১০ অক্টোবর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরাইল গাজায় হামলা চালিয়ে অন্তত ৪১১ জনকে হত্যা করেছে এবং এক হাজার ১১২ জনকে আহত করেছে। এর আগে চলতি সপ্তাহে গাজা সিটির পূর্বে শুজাইয়া এলাকায় ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে আরো দুই ফিলিস্তিনি নিহত হন। পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা ও সেনাদের অভিযান বেড়েই চলেছে। নাবলুসের কাছে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় শুক্রবার এক ফিলিস্তিনি পৌর কর্মচারী আহত হয়েছেন। ইসরাইলি সেনারা তুবাসের পূর্বে কৃষিজমিতে কাজ করা ফিলিস্তিনি কৃষকদের আটক করেছে। ইয়ারজা গ্রামের পরিষদ প্রধান জানিয়েছেন, সেনারা কৃষকদের কয়েক ঘণ্টা ধরে বন্দী করে রেখেছে এবং বসতি স্থাপনকারীরা তাদের মারধর করে জমিতে প্রবেশে বাধা দিয়েছে। ইয়াত্তা এলাকা ও আল-খালিলের কাছে বেইত উম্মারে ইসরাইলি অভিযানে আরো কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। আটক হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন নারী, চার শিশু ও এক বৃদ্ধ রয়েছেন। ফিলিস্তিনি কর্মীরা জানিয়েছেন, বসতি স্থাপনকারীরা ওই বৃদ্ধের বাড়ির বেড়া ভেঙে ফেলার পর তাকে বন্দী করা হয়।