খামারবাড়িতে সারাদিন উত্তেজনা, রাস্তা অবরোধ
Printed Edition
কৃষিসচিব ড. এমদাদ উল্লাহ মিয়ান ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) মহাপরিচালক ছাইফুল আলমের অপসারণ দাবি করে রাজধানীর খামারবাড়ি মোড়ে রাস্তা অবরোধ করেছে দুই শতাধিক মানুষ। অন্য দিকে খামারবাড়ির ভেতরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের কিছু কর্মকর্তা প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থান কর্মসূচির পর পুলিশি বাধায় তা পণ্ড হয়ে যায়। কৃষিসচিব মুজিব শতবার্ষিকী বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগের দিন গত ৪ আগস্ট কথিত শান্তি সমাবেশে অংশ নেয়া ডিএইর ডিজিসহ আরো কিছু কর্মকর্তাকে স্বৈরাচারের দোসর হিসেবে উল্লেখ করে তাদের অপসারণের দাবি জানান আন্দোলনকারীরা।
এ দিকে খামারবাড়ি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই আন্দোলনের মূলে প্রশাসন শাখার উপপরিচালক ড. মাহবুবুর রশিদকে বদলি। গত বৃহস্পতিবার খামারবাড়ির প্রভাবশালী এই কর্মকর্তাকে মেহেরপুরের বারাদি হর্টিকালচার সেন্টারে উপপরিচালক পদে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করে কৃষি মন্ত্রণালয়। তার স্থলাভিষিক্ত করা হয় উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ উইংয়ের উপপরিচালক (আমদানি) মো: মুরাদুল হাসানকে। মূলত এটিকে ঘিরেই উত্তেজনা দেখা দেয় খামারবাড়িতে।
আগের দিন শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (কৃষি) অ্যাসোসিয়েশনের একাংশ। আর গতকাল রোববার খামারবাড়িতে সংগঠনের ব্যানারে সদস্যসচিব মো: রেজাউল ইসলাম মুকুলের নেতৃত্বে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করে। সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি বেলা ২টা পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও ১২টার আগে পণ্ড হয়ে যায়। ভেতরে অ্যাসোসিয়েশনের কিছু নেতাকে দেখা গেলেও বিপুলসংখ্যক মানুষকে আন্দোলনকারী কর্মকর্তাদের সাথে সংহতি জানিয়ে ফেস্টুন হাতে খামারবাড়ির গেটের বাইরে রাস্তা বন্ধ করে অবস্থান নিতে দেখা যায়। একপর্যায়ে তারা খামারবাড়ি মোড়ে মিরপুর রোড বন্ধ করে দেয়। খামারবাড়ির ভেতরে ও বাইরে অচলবস্থা সৃষ্টি হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই অচলাবস্থা দূর করতে সক্রিয় ভূমিকায় দেখা যায়। এ সময় সেনাবাহিনীর সদস্যদের টহলের পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের সাথেও কথা বলতে দেখা যায়।
গতকাল দুপুর ১২টার দিকে ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী শিক্ষার্থীবৃন্দ’র ব্যানারে একদল মানুষ খামারবাড়ি চত্বরের রাস্তা বন্ধ করে কৃষিসচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ানসহ ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসরদের অপসারণের দাবি জানান। নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন গণ-অধিকার পরিষদের অর্থ সম্পাদক কৃষিবিদ শহিদুল ইসলাম ফাহিম। এ সময় শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও তেজগাঁও কলেজছাত্রদলের সাবেক ও বর্তমান কিছু নেতাকর্মীও ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এই কর্মসূচিকে ঘিরে থমথমে অবস্থা দেখা দেয় পুরো খমারবাড়ি এলাকায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের ভেতরে ভীতিকর অবস্থা সৃষ্টি হয়। একজন কর্মকর্তাকে ঢাকার বাইরে বদলির পরিপ্রেক্ষিতেই খামারবাড়িতে এমন লঙ্কাকাণ্ড বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
এ দিকে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (কৃষি) অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানার ব্যবহার করে এই অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও সংগঠনের আহ্বায়ক ড. মো: সাহিনুল ইসলাম বলছেন, বিষয়টি তার জানা নেই। তাদের ফোরামে এই ধরনের কর্মসূচি পালনের কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি। এমনকি গত শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলনের বিষয়টিও তাদের ফোরামের অনুমোদন হয়নি।
গতকাল রোববার বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (কৃষি) অ্যাসোসিয়েশনের প্যাডে সংগঠনের আহ্বায়ক ড. মো: সাহিনুল ইসলাম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর নিরলস কাজ করছে। জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী পর্যায় ফ্যাসিস্টমুক্ত দেশের কৃষি উৎপাদনের ধারাকে অব্যাহত রাখার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী কাজ করছে। বিসিএস (কৃষি) অ্যাসোসিয়েশন বিশ্বাস করে ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে সার্বিক সহযোগিতার মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের সহায়তা করা একইসাথে কৃষি সেক্টরে ফ্যাসিস্টদের দোসরমুক্ত করা। এমন পরিস্থিতিতে বিসিএস (কৃষি) অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানারে কিছু কর্মকর্তা গত ১৫ মার্চ ২০২৫ তারিখে কৃষি সেক্টরকে ফ্যাসিস্টের দোসর মুক্ত করে কৃষি উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখা শীর্ষক একটি সংবাদ সম্মেলন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয়। উল্লিখিত সাংবাদিক সম্মেলনটি বিসিএস (কৃষি) অ্যাসোসিয়েশনের সম্মিলিত সিদ্ধান্তের আলোকে করা হয়নি। সাংবাদিক সম্মেলনটি একতরফাভাবে করা হয়েছে।’
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, বিসিএস (কৃষি) অ্যাসোসিয়েশনের ব্যানার অপব্যবহার করে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন করায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সাধারণ কৃষিবিদের মধ্যে শুধু বিভক্তিই সৃষ্টি করবে না, বরং কৃষি উপদেষ্টা মহোদয়ের নিকট ভুল বার্তা প্রেরণ করবে। এটি সচেতন কৃষিবিদদের কাম্য হতে পারে না। পূর্ণাঙ্গ ফোরামে আলোচনা ব্যতীত এ ধরনের কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। সংবাদ সম্মেলনে বিসিএস (কৃষি) অ্যাসোসিয়েশনের বেশির ভাগ সদস্যদের মতামত ও অংশগ্রহণ ছিল না এবং আমরা ওই সাংবাদিক সম্মেলনের সাথে একমত না। এমতাবস্থায় ভবিষ্যৎ এ ধরনের অনৈতিক ও অ্যাসোসিয়েশনের শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে আহ্বান জানানো হলো।
পুলিশ ও সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ কর্মসূচি ভণ্ডুল হয়ে যায়। ঘণ্টাখানেক পর রাস্তা থেকেও সরে যায় আন্দোলনকারীরা। বেলা পৌনে ২টার দিকে খামারবাড়ি এলাকার রাস্তা স্বাভাবিক হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর মহাপরিচালক ছাইফুল আলম বলেন, সরকারের নির্দেশনায় আমরা চলি। খামারবাড়িতে যারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে তাদের ছাড় দেয়া হবে না।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী ড. মাহবুবুর রশিদকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন ডিজি। আগামী চার দিনের মধ্যে তাকে বদলিকৃত স্থানে যোগ দিতে হবে।
খামারবাড়ি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫ আগস্ট পতিত স্বৈরশাসকের পতনের পর খামারবাড়িতে যে পরিবর্তন আসে তার অংশ হিসেবে প্রশাসন উইংয়ের উপপরিচালকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হন ড. মাহবুবুর রশিদ। বিএনপিপন্থী এই কর্মকর্তার সাথে রেজাউল ইসলাম মুকুল নামের আরেক কর্মকর্তা মিলে পুরো খামারবাড়ির শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করেন। বিএনপিপন্থী কর্মকর্তাদেরই আরেক গ্রুপ মাহবুব-মুকুলদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পদায়ন ও টেন্ডারবাণিজ্যসহ নিজস্ব প্রভাব বলয় সৃষ্টির অভিযোগ তোলেন। তবে মাহবুব মুকুল গ্রুপের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মুজিব শতবার্ষিকীতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে আসা কৃষিসচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ানের অপসারণের দাবি জানানোর কারণেই মূলত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাওয়া হয়। খামারবাড়ির অস্থিরতার দায় মাহবুব-মুকুল গ্রুপের পাশাপাশি কৃষিসচিবের রয়েছে বলে অনেকের অভিযোগ।