ন্যায়বিচারের মানদণ্ড আর মাঠের বাস্তবতা
চানখাঁরপুল মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণ
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
বিচারের চিরন্তন ও শাশ্বত আদর্শ হলো ন্যায়বিচারের নামে কোনো নির্দোষ ব্যক্তি যেন দণ্ডিত না হয়, আবার কোনো অপরাধীও যেন তার কৃতকর্মের তুলনায় অসামঞ্জস্যপূর্ণ বা লঘু সাজা পেয়ে পার না পায়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর চানখাঁরপুল এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে এই নীতিকেই ন্যায়বিচারের মূল ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
বিচারপতি মো: গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল গত ২৬ জানুয়ারি যে রায় প্রদান করেন, তার প্রতিটি ছত্রে উঠে এসেছে মাঠপর্যায়ের প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ডের অপব্যবহার, নৃশংসতা এবং তদন্ত প্রক্রিয়ার কিছু অমীমাংসিত ও গুরুতর প্রশ্ন। বিশেষ করে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে যোগ দিতে আসা তরুণ শাহরিয়ার খান আনাসের সেই আবেগঘন চিঠি, যা আদালত কক্ষে পাঠ করার সময় এক শোকাতুর পরিবেশ তৈরি করেছিল, তা এই হত্যাকাণ্ডের নৃশংসতা ও বীর শহীদদের আত্মত্যাগের গভীরতাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। আদালত স্পষ্ট বলেছেন, এই শহীদ পরিবারগুলোর ক্ষতিপূরণ করার মতো কিছু পৃথিবীতে নেই।
রায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী এবং এডিসি শাহ্ আলম মো: আখতারুল ইসলামের নাম, যাদেরকে ৬ আন্দোলনকারীকে হত্যার জন্য এককভাবে দায়ী করা হয়েছে। হাবিবুর রহমান ওয়্যারলেস বার্তার মাধ্যমে ঢাকা মহানগর পুলিশের সব ইউনিটকে আন্দোলনকারীদের হত্যা করার উদ্দেশ্যে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
অন্য দিকে এডিসি আখতারুল নিজে উপস্থিত থেকে পুরো অভিযান তদারকি করেছেন এবং তার সরাসরি তত্ত্বাবধানেই অধস্তন পুলিশ সদস্যরা গুলি চালিয়েছিলেন। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র- যেখানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশে রাজপথ রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। তবে এই রায়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো ‘মাঠের বাস্তবতা’ এবং ‘আইনি দায়’-এর মধ্যকার সূক্ষ্ম ব্যবচ্ছেদ। ট্রাইব্যুনাল রায়ে ‘অমীমাংসিত প্রশ্ন’ শিরোনামে তদন্তের কিছু অন্ধকার দিক উন্মোচন করেছেন যা প্রসিকিউশনের সীমাবদ্ধতাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।
আদালত প্রশ্ন তুলেছেন, অভিযানে অন্তত ৪০ জন পুলিশ সদস্য অংশ নিলেও কেন মাত্র ৮ জনকে আসামি করা হলো? রেজিস্টার অনুযায়ী ১৫ জনকে শর্টগান, ৮ জনকে চায়না রাইফেল ও ২ জনকে এসএমজি ইস্যু করা হয়েছিল, যার বিপরীতে বিপুল পরিমাণ গুলির হিসাব পাওয়া যায় না। অথচ মাত্র চার-পাঁচজন সদস্য তাদের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ফেরত দিয়েছিলেন।
ট্রাইব্যুনাল বিস্ময় প্রকাশ করে বলেছেন, নথিবদ্ধ প্রমাণ উপেক্ষা করে কেন কনস্টেবল অজয় ঘোষ, আবদুর রহমান ও আসিফ খানের মতো ব্যক্তিদের শুধু সাক্ষী করা হলো? বিশেষ করে এসআই আশরাফুল ইসলাম, যিনি নিজে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দিতে অভিযানে সক্রিয় থাকার কথা স্বীকার করেছেন, তাকে কেন আসামি বা সাক্ষী- কোনোটিই করা হলো না? এ ছাড়া রমনা অঞ্চলের উপকমিশনারের (ডিসি) অবস্থান ও ভূমিকা নিয়ে মামলাটি নীরব কেন, সেই প্রশ্নও রায়ে রাখা হয়েছে। এমনকি সাবেক এডিসি আখতারুল সরকার পতনের পর দীর্ঘ সময় দায়িত্বে থাকলেও তাকে কেন গ্রেফতার করা হলো না এবং শেষ পর্যন্ত তাকে পালানোর সুযোগ করে দেয়া হলো কেন, তা নিয়েও আদালত প্রশ্ন তুলেছেন।
মাঠপর্যায়ের নিম্নপদস্থ পুলিশ সদস্যদের দায় নিরূপণে আদালত অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ভূমিকা নিয়েছেন। ৩ বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত কনস্টেবল সুজনের ক্ষেত্রে আদালত পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন যে, মাত্র ২০ বছর বয়সী একজন নবীন সদস্যের পক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রের মতো পরিস্থিতিতে উচ্চপদস্থ কমান্ডিং কর্মকর্তার সরাসরি আদেশ অমান্য করা প্রায় অসম্ভব ছিল। এডিসি আখতারুল জোর করে সাক্ষী অজয় ঘোষের চায়না রাইফেল কেড়ে নিয়ে সুজনের হাতে তুলে দিয়ে তাকে গুলি করতে বাধ্য করেছিলেন। ভিডিও ফুটেজে সুজনকে গুলি চালাতে দেখা গেলেও নির্দিষ্ট করে তার গুলিতেই কেউ মারা গেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আদালত মনে করেন, সুজন ছিলেন পরিস্থিতির শিকার; যদি তাকে অস্ত্র দেয়া না হতো, তবে তিনি আজ আসামি হতেন না। একইভাবে ইমাজ ও নাসিরুলের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, তারা আদেশের অধীনে বাধ্য হয়ে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। ট্রাইব্যুনাল মনে করেন, যদিও এঁরা সরাসরি হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী নন, তবুও নৃশংসতার সময় তাদের উপস্থিতি ও সম্পৃক্ততা শাস্তিযোগ্য।
অন্য দিকে আসামি ইমরুল ও আরশাদ ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তাদের কোনো দৃশ্যমান সক্রিয় ভূমিকা পাওয়া যায়নি। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ট্রাইব্যুনাল এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, ঊর্ধ্বতনদের ‘সুপিরিয়র কমান্ড’ এবং অধস্তনদের ‘বাধ্য হওয়া’র এই জটিল সমীকরণে প্রত্যেকের সাজা হতে হবে তার সংশ্লিষ্টতার মাত্রা অনুযায়ী।
অন্য দিকে গত ১ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগ এই মামলার রায়ে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের মুক্তি না দিতে নির্দেশ দিয়েছেন।
এ ছাড়া তিন বছরের কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক কনস্টেবল সুজনের বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর্যবেক্ষণ স্থগিত করেছেন আপিল বিভাগ। তবুও এই রায়টি বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। এটি প্রমাণ করেছে যে, ন্যায়বিচারের মানদণ্ড বজায় রাখতে গেলে শুধু আবেগ নয়, বরং তথ্য-প্রমাণ ও মাঠের কঠিন বাস্তবতাকে বিচারিক নিক্তিতে পরিমাপ করা অপরিহার্য।