সূচকের সাথে বেড়েছে ডিএসইর লেনদেনও
ফান্ডের আধুনিকায়নে বিএসইসির কমিটি গঠন
Printed Edition
অর্থনৈতিক প্রতিবেদক
চলমান নেতিবাচক প্রবণতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে দেশের পুঁজিবাজার। এরই অংশ হিসেবে গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারেই সূচকের কমবেশি উন্নতি ঘটে। বৃদ্ধি পেয়েছে ঢাকা বাজারের লেনদেনও। সূচকের বড় উন্নতি দিয়ে সকালে দুই পুঁজিবাজারের লেনদেন শুরু হলেও পৌনে এক ঘণ্টার মাথায় বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে বাজারগুলো; কিন্তু বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি বাজারের পতন থামিয়ে দেয়। এতে দিনশেষে দুই বাজারেই সূচকের উন্নতি ঘটে।
প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ২৪ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। ৫ হাজার ২৩০ দশমিক ৩৬ পয়েন্ট থেকে দিন শুরু করা সূচকটি গতকাল দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ২৫৪ দশমিক ৯৯ পয়েন্টে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৩ দশমিক ১৬ ও ৮ দশমিক ৭৩ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ২২ দশমিক ৬৩ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়। ১৪ হাজার ৭৩৩ দশমিক ৩০ পয়েন্ট থেকে সকালে যাত্রা শুরু করা সূচকটি বিকেলে ১৪ হাজার ৭৫৫ দশমিক ৬৬ পয়েন্টে স্থির হয়। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৭ দশমিক ৯১ ও ১২ দশমিক ৭৫ পয়েন্ট।
সূচকের পাশাপাশি ঢাকা শেয়ারবাজারের লেনদেনেও উন্নতি ঘটে গতকাল। ডিএসই ৮৩৬ কোটি টাকার লেনদেন নিষ্পত্তি করে যা আগের দিন অপেক্ষা ৪৩ কোটি টাকা বেশি। গত সোমবার ডিএসইর লেনদেন ছিল ৭৯৩ কোটি টাকা। তবে লেনদেন কমেছে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে। এখানে গতকাল ২৩ কোটি টাকা লেনদেন হয় যা আগের দিনের চেয়ে ১৭ কোটি টাকা কম। সোমবার সিএসইর লেনদেন ছিল ৪০ কোটি টাকা। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বিনিয়োগকারীরা এ মুহূর্তে তাকিয়ে আছেন মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধবিরতির আশায়। যুদ্ধের ভয়াবহতা হ্রাস পাওয়ায় ডিএসইর লেনদেন একটি সম্মানজনক অবস্থান ধরে রেখেছে। আর যুদ্ধবিরতি ঘটলে যেকোনো সময় বাজার আবার ভালোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারে। বুধবার ডিএসইর কয়েকটি ব্রোকার হাউজে বেশ কয়েকজন বিনিয়োগকারীর সাথে কথা বলে একই ধরনের মনোভাবের প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ দিকে শেয়ারবাজারে মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে আরো যুগোপযোগী ও আধুনিক করতে তথ্য প্রকাশের ফরম্যাট, মানদণ্ড এবং নির্দেশিকা হালনাগাদ করার নতুন উদ্যোগ নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। নতুন ‘মিউচুয়াল ফান্ড বিধিমালা-২০২৫’-এর সাথে সঙ্গতি রেখে এই খাতের সার্বিক সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করতে কমিশনের পাঁচজন কর্মকর্তার সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
বিএসইসির জারি করা সাম্প্রতিক এক আদেশের মাধ্যমে এই বিশেষ কমিটি গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। কমিশনের অতিরিক্ত পরিচালক শেখ মো: লুৎফুল কবিরকে এই কমিটির আহ্বায়ক মনোনীত করা হয়েছে। কমিটির অন্যান্য সদস্য হলেন- সুলতানা পারভীন, মো: আতিকুল্লাহ খান, মো: তৌহিদুল ইসলাম সাদ্দাম এবং সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন মো: সাগর ইসলাম।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা সূত্রে জানা গেছে, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো ফান্ডের সম্পদ মূল্যায়ন ও তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া আরো সহজ হবে এবং পুরো খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পাবে। বিশেষ করে তহবিল ব্যবস্থাপনা ও রিপোর্টিং ব্যবস্থায় কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতেই এই সংস্কারের পথে হাঁটছে কমিশন। এই কমিটিকে আগামী ৪০ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের পর্যালোচিত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। নতুন বিধিমালার আলোকে তথ্য প্রকাশের কাঠামো এবং নীতিমালাগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের প্রস্তাবনা তৈরি করবে এই কমিটি।
কমিটির কার্যপরিধিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্ট্যান্ডার্ড ট্রাস্ট ডিড তৈরি, ত্রৈমাসিক রিপোর্টিং ও পোর্টফোলিও স্টেটমেন্টের নতুন ফরম্যাট প্রণয়ন এবং ফান্ডের মার্জার বা কনভার্সন-সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করা। এর ফলে মিউচুয়াল ফান্ড খাতের নথিপত্র ব্যবস্থাপনায় একটি অভিন্ন ও শক্তিশালী কাঠামো তৈরি হবে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ডিসক্লোজার বা তথ্য প্রকাশ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হলে বাজারে শৃঙ্খলা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা দুই-ই বাড়বে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারে স্বচ্ছতা ফেরাতে বিএসইসি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, নতুন এই কমিটি গঠন সেই ধারাবাহিকতাকেই আরো বেগবান করবে বলে মনে করছেন তারা।
প্রসঙ্গত, সংশোধিত নতুন বিধিমালায় মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ডকে বেমেয়াদি ফান্ডে রূপান্তরের একটি বিধান রাখা হয়েছে। যদি কোনো ফান্ডের ইউনিটের বাজারমূল্য তার নিট সম্পদমূল্যের (এনএভি) তুলনায় ২৫ শতাংশের বেশি কমে যায়, তবে ইউনিটহোল্ডারদের স্বার্থে ট্রাস্টি ইজিএম ডাকবে। সেখানে বিনিয়োগকারীদের মতামতের ভিত্তিতে ফান্ডটি রূপান্তর বা অবসায়ন করা হবে। এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন করতেই নতুন নীতিমালা প্রয়োজন, যা এই কমিটি প্রস্তুত করবে।
গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ ছিল খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ। ৩৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৬৮ লাখ তিন হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৫ কোটি চার লাখ টাকায় ৮২ লাখ ৫৩ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল ব্যাংকিং খাতের সিটি ব্যাংক। ডিএসইর লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে একমি পেস্টিসাইডস, লাভেলো আইসক্রিম, মীর আখতার হোসাইন, গোল্ডেনসন, শাহজিবাজার পাওয়ার, ডমিনেজ স্টিল বিল্ডিং সিস্টেমস, বাংলাদেশ বিল্ডিং সিস্টেমস ও পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স।