লুটেরাদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগ সমন্বয়ের দাবি
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক : এস আলমের দখলমুক্তি ও সুরক্ষা কামনা
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শরিয়াভিত্তিক ব্যাংক আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক পিএলসি। একসময় যে প্রতিষ্ঠানটি সুদমুক্ত অর্থনীতি, ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং ক্ষুদ্র বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরির লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, তা এখন দীর্ঘ দিনের দখল, অনিয়ম ও লুটপাটের অভিযোগে সঙ্কটে পড়েছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় উঠে এসেছে- ব্যাংক লুটের সাথে জড়িতদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে বিক্রির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত বিনিয়োগ সমন্বয়ের দাবি।
১৯৯৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর সাবেক সচিব ও ইসলামী অর্থনীতিবিদ এ জেড এম শামসুল আলমের নেতৃত্বে ব্যাংকটির যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠালগ্নে এর মূল লক্ষ্য ছিল- সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা গড়ে তোলা; সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে ক্ষুদ্র বিনিয়োগ প্রদান এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখা। ২০০৬ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতার নেতৃত্বে শরিয়াহ নীতিমালা অনুসরণ করে ব্যাংকটি সাফল্যের সাথে পরিচালিত হয় এবং দেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করে।
দখল ও ক্ষমতার পালাবদল
২০০৭ সালের পর আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন শুরু হয়। এ সময় আনোয়ার হোসেন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তবে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়ম ও অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালে তিনি অপসারিত হন। এর পরপরই ব্যাংকটির পরিচালনায় অস্থিরতা তৈরি হয়, যা ২০০৯ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আরো তীব্র আকার ধারণ করে।
জানা গেছে, ওই সময় চট্টগ্রামভিত্তিক দুই প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম গ্রুপ ও কেডিএস গ্রুপ ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। এই প্রক্রিয়ায় ঢাকা-কেন্দ্রিক ৯ জন উদ্যোক্তা পরিচালককে জোরপূর্বক অপসারণ করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন কৌশল, জালিয়াতি ও প্রভাব খাটিয়ে তাদের শেয়ার দখল করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এভাবে ধাপে ধাপে ব্যাংকটির প্রায় ৩৭.২৫ শতাংশ শেয়ার ওই দুই গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। ফলে পরিচালনা পর্ষদের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ব্যাংকটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। এর মাধ্যমে ব্যাংকের করপোরেট গভর্ন্যান্স দুর্বল হয়ে পড়ে এবং পরবর্তীতে অনিয়ম ও বিতর্কের পথ সুগম হয়।
অনিয়ম, লুটপাট ও আর্থিক ঝুঁকি
সূত্রগুলো জানায়, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তার ঘটে, যা ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তিকে দুর্বল করে তোলে। এই সময়ে অযোগ্য, নামসর্বস্ব ও ভুয়া প্রতিষ্ঠানের নামে বিপুল অঙ্কের ঋণ অনুমোদন করা হয়, যার অনেকগুলোই শুরু থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। একই সাথে নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে তা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে, যেখানে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো নিজেদের স্বার্থে ব্যাংকের অর্থ ব্যবহার করেছে।
এ ছাড়া করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল বিভিন্ন উপায়ে অপব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকের প্রকৃত খেলাপি ঋণের তথ্য গোপন রেখে আর্থিক অবস্থাকে ভালো দেখানোর চেষ্টা করা হয়, যা স্বচ্ছতার বড় ঘাটতি নির্দেশ করে। অন্য দিকে বিপুল পরিমাণ ঋণ ‘রাইট অফ’ বা অবলোপন করা হয়, যার অনেক ক্ষেত্রেই যথাযথ যাচাই-বাছাই ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে।
এসব অনিয়মের ফলে ব্যাংকটির সুশাসন ভেঙে পড়ে এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের বোঝা ক্রমেই বাড়তে থাকে। এতে আমানতকারীদের আস্থা কমে যাওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকটির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাও হুমকির মুখে পড়ে।
ইন্টারচেঞ্জ ঋণ কেলেঙ্কারি
ব্যাংকটির আর্থিক অনিয়মের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি হলো পারস্পরিক ঋণ লেনদেন বা তথাকথিত ‘ইন্টারচেঞ্জ লোন’ ব্যবস্থা। সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, একটি পক্ষ এক্সিম ব্যাংক থেকে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঋণ সুবিধা পায়, আর একই সময় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক থেকে অন্য একটি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে প্রায় ৬৬০ কোটি টাকা ঋণ প্রদান করা হয়। এই দুই ঋণ কার্যত পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে- যা স্বাভাবিক ব্যাংকিং নীতির সাথে সাংঘর্ষিক।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ইন্টারচেঞ্জ লোনে ঝুঁকি মূল্যায়ন, গ্রাহকের সক্ষমতা যাচাই এবং স্বচ্ছতা- সবকিছুই উপেক্ষিত হয়। ফলে ঋণ প্রদানের প্রকৃত উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে দেখা যায়, উভয় ঋণই খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বিশেষ করে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের ক্ষেত্রে এই খেলাপি ঋণ তার মূলধন সক্ষমতা, তারল্য ব্যবস্থাপনা এবং সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিয়েছে। এ ধরনের অনিয়মিত লেনদেন শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বরং ব্যাংকিং খাতে আস্থার সঙ্কটও তৈরি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে পুরো খাতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
পরিচালনা বোর্ড ও সুশাসনের সঙ্কট
২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা কাঠামোতে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব সুস্পষ্টভাবে দৃশ্যমান ছিল। এ সময় ২০ সদস্যের পরিচালনা পর্ষদের মধ্যে অন্তত ১৫ জনই সংশ্লিষ্ট দু’টি ব্যবসায়ী গ্রুপের প্রতিনিধিত্ব করতেন, ফলে বোর্ডের ভারসাম্য ও স্বাধীনতা কার্যত নষ্ট হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ নির্বাহী ও নীতিনির্ধারণী পদগুলোতেও বাইরের কোনো পেশাদার বা স্বাধীন ব্যক্তিকে সুযোগ দেয়া হয়নি, যা করপোরেট গভর্ন্যান্সের মৌলিক নীতির পরিপন্থী। এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া একমুখী হয়ে পড়ে এবং ব্যাংকের স্বার্থের পরিবর্তে গোষ্ঠীগত স্বার্থ প্রাধান্য পায়।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা হলেও নতুন বোর্ড নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে, নতুন বোর্ডে প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের প্রতিনিধিত্ব না থাকায় তাদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি, অতীতের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এ ছাড়া নতুন নিয়োগে পক্ষপাতিত্ব, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর প্রভাব বজায় রাখা এবং যোগ্যতার পরিবর্তে আনুগত্যকে প্রাধান্য দেয়ার অভিযোগও উঠেছে। এসব কারণে বোর্ড পরিবর্তনের পরও কাক্সিক্ষত সংস্কার ও আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি, বরং ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরো বেড়েছে।
পুনরুদ্ধারের প্রস্তাব : শেয়ার বাজেয়াপ্ত ও বিক্রি
বর্তমান পরিস্থিতিতে আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংককে পুনরুদ্ধারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে প্রস্তাবটি সামনে এসেছে, তা হলো ব্যাংক লুটপাটের সাথে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর মালিকানাধীন শেয়ার বাজেয়াপ্ত করে তা বিক্রির মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক খাত পুনর্গঠন করা। এই প্রস্তাব অনুযায়ী, অভিযুক্তদের দখলে থাকা শেয়ার বিক্রি করে প্রাপ্ত অর্থ ব্যবহার করা হবে খেলাপি বিনিয়োগ সমন্বয়, ইন্টারচেঞ্জ লোনের ক্ষতি পূরণ এবং ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণের কাজে।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে প্রথমত দায় নিরূপণ নিশ্চিত হবে। দীর্ঘ দিন ধরে যেসব ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যাংক লুটপাটের অভিযোগ রয়েছে, তাদের সরাসরি জবাবদিহির আওতায় আনা সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, বিক্রয়লব্ধ অর্থ ব্যাংকের আর্থিক ক্ষতি আংশিক হলেও পূরণ করতে সহায়ক হবে, যা ব্যাংকের তারল্য ও মূলধন কাঠামো পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তৃতীয়ত, এটি সুশাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি শক্ত বার্তা দেবে। ভবিষ্যতে কোনো গোষ্ঠী যাতে একই ধরনের অনিয়মে জড়াতে সাহস না পায়, সে জন্য এটি একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। সর্বোপরি, প্রকৃত শেয়ারহোল্ডারদের কাছে ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে দেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
তবে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, শক্তিশালী আইনি কাঠামো এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর তদারকি। অন্যথায় এই উদ্যোগ কাক্সিক্ষত ফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
ভবিষ্যৎ করণীয়
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে হলে দ্রুত ও কার্যকর কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। প্রথমত, ব্যাংকের অতীত অনিয়ম, ঋণ জালিয়াতি ও শেয়ার দখলের অভিযোগগুলো নিয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করতে হবে, যাতে প্রকৃত চিত্র উদঘাটিত হয়। দ্বিতীয়ত, তদন্তে প্রমাণিত দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা পায় এবং ভবিষ্যতে এমন অনিয়মের পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
তৃতীয়ত, ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে প্রকৃত উদ্যোক্তা শেয়ারহোল্ডারদের অন্তর্ভুক্ত করে একটি দক্ষ, অভিজ্ঞ ও দায়বদ্ধ বোর্ড গঠন করা জরুরি। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভারসাম্য ও স্বচ্ছতা ফিরে আসবে। একই সাথে বাংলাদেশ ব্যাংককে কঠোর নজরদারি জোরদার করতে হবে, যাতে ব্যাংকের কার্যক্রম নিয়মনীতি অনুযায়ী পরিচালিত হয়।
সবশেষে, দীর্ঘ দিন ধরে জমে থাকা খেলাপি ঋণ পুনর্গঠন ও কার্যকরভাবে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিতে হবে। এতে ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে এবং আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান সঙ্কট কেবল একটি ব্যাংকের সমস্যা নয়; এটি দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের গভীর সঙ্কটের প্রতিফলন। ব্যাংক লুটের সাথে জড়িতদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত ও বিক্রির প্রস্তাব এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে শুধু এই ব্যাংক নয়, পুরো আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।