রাষ্ট্রপতিকে নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ তুঙ্গে
Printed Edition
মোহাম্মদ জাফর ইকবাল
সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন এবং দফায় দফায় রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বৈঠকের পর গণভোটে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে কিছু প্রস্তাব সাংবিধানিক সংশোধনের মাধ্যমে এবং কিছু সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ এই ৮৪টি ধারা বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে- এমন শর্তও সেখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়। গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দেশবাসী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে সংস্কার প্রস্তাবের পক্ষে রায় দিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন নিয়ে ইতোমধ্যে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
সূত্র জানায়, গণভোটে মূলত চারটি বিষয়ে জনগণের সম্মতি পাওয়া গেছে। প্রথমত, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা। দ্বিতীয়ত, আগামী জাতীয় সংসদকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট করা এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা। একই সাথে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব রয়েছে।
তৃতীয়ত, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার করা, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা পুনর্নির্ধারণসহ তফসিলে বর্ণিত ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে যে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে। চতুর্থত, জুলাই জাতীয় সনদে উল্লিখিত অন্যান্য সংস্কার প্রস্তাব রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।
তবে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বিজয়ী হলেও সংস্কার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য স্পষ্ট হয়ে উঠছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বলছে, যেসব বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলোকেই অগ্রাধিকার দিয়ে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এগিয়ে নিতে হবে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হবে, সেগুলো নিয়েই আমাদের এগোতে হবে। সব বিষয়ে সবাই একমত হবে- এমনটা বাস্তবে সম্ভব নয়। যেসব বিষয়ে আপত্তি থাকবে, সেগুলো নিয়ে কাউকে জোর করা যায় না। তাই একমতের বিষয়গুলো নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই বাস্তবসম্মত।’
বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান সংস্কারের প্রস্তাবগুলো এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক দল অত্যধিক ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠতে না পারে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ দিন ধরে সাধারণ মানুষ যে উদ্বেগ অনুভব করে আসছে, বিশেষ করে ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ ও অপব্যবহারের আশঙ্কা, সেগুলোর মোকাবেলা করা সম্ভব হতে পারে। তাদের মতে, সংবিধানের কাঠামোগত পরিবর্তন না হলে অতীতে যে ধরনের ক্ষমতার অপব্যবহার দেখা গেছে, তা পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যাবে।
বর্তমানে সংস্কার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রধানমন্ত্রী পদটি দীর্ঘ দিন ধরেই অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অনেকেই মনে করেন, এর পেছনে অন্যতম কারণ হলো দেশের এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা। যিনি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হন, কার্যত কোনো কার্যকর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই তিনি নীতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রায় একচ্ছত্র ক্ষমতা ভোগ করেন। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি হয়।
এই সমস্যার সমাধান কেবল ব্যক্তি বা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করতে পারে না; বরং সংসদের কাঠামোগত সংস্কারের মধ্য দিয়েই একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এখানে ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ বা ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার নীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমান এককক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থায় সেই ভারসাম্যের ঘাটতি রয়েছে, যা প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করে।
উদাহরণ হিসেবে বিশ্লেষকরা উল্লেখ করেন, অতীতে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের সময় নির্বাচনে কারচুপি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজনৈতিক ব্যবহার, ব্যাংক খাত থেকে অর্থ আত্মসাৎ এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর কঠোর দমন-পীড়নের মতো অভিযোগগুলো মূলত ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণেরই প্রতিফলন ছিল। এমন পরিস্থিতি এড়াতে ক্ষমতার কাঠামোয় বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত জরুরি বলে তারা মনে করেন।
এই প্রেক্ষাপটে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা একটি বাস্তবসম্মত সমাধান হিসেবে সামনে এসেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, বিদ্যমান জাতীয় সংসদ নি¤œকক্ষ হিসেবে থাকবে এবং এর সদস্যরা সরাসরি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হবেন। পাশাপাশি একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে, যা আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় একটি ভারসাম্য রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করবে।
সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী, উচ্চকক্ষের ১০০টি আসন আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির (প্রপোরশনাল রিপ্রেজেন্টেশন বা পিআর) ভিত্তিতে বণ্টন করা হবে। অর্থাৎ, নিম্ন কক্ষের নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দল মোট যে পরিমাণ ভোট পাবে, তার শতাংশ অনুযায়ী উচ্চকক্ষে আসন পাবে। এখানে ন্যূনতম এক শতাংশ ভোট পাওয়ার শর্ত রাখা হয়েছে। ফলে সরাসরি আসনভিত্তিক নির্বাচনে পিছিয়ে পড়া ছোট রাজনৈতিক দল বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান বিশ্লেষক সালাহ্দীন ইমাম এক প্রবন্ধে লিখেছেন, বাংলাদেশের জন্য দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা একটি যুগান্তকারী সংস্কার প্রস্তাব হতে পারে, যার মূল লক্ষ্য গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা এবং ক্ষমতার কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে উচ্চকক্ষের গঠনপ্রক্রিয়া এবং তাকে দেয়া ক্ষমতার ওপর। তার মতে, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক আইনসভা গঠনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করলেও এর বাস্তব প্রয়োগে নানা চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক বিতর্ক থাকবে।
তিনি আরো বলেন, এই প্রস্তাব কেবল একটি কাঠামোগত পরিবর্তন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার প্রকৃতি নির্ধারণের একটি মৌলিক পরীক্ষা। একদিকে এতে বৃহত্তর জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা রয়েছে, অন্যদিকে আইন প্রণয়নের দীর্ঘসূত্রতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে একটি নিরপেক্ষ ‘রেফারি’ বা নিরাপত্তা ভালভ হিসেবে উচ্চকক্ষ কাজ করলে নীতি ও নিয়ম মেনে চলার সংস্কৃতি জোরদার হতে পারে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য স্থিতিশীল ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের পরপরই প্রয়াত সিরাজুল আলম খান রাষ্ট্রব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য ১৫ দফা প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সেখানে ফেডারেল রাষ্ট্রব্যবস্থা, জাতীয় সরকার, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, প্রদেশভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন এবং নির্দলীয় রাষ্ট্রপতি-উপরাষ্ট্রপতি ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু বাহাত্তরের সংবিধান প্রণেতাসহ পরবর্তী কোনো সরকারই সেসব প্রস্তাব বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়নি।
পরে ১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পরও রাষ্ট্রীয় কাঠামো সংস্কারের একটি সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছিল। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতা ও সিদ্ধান্তহীনতার কারণে সেই সুযোগও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি।
এ দিকে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনকে ঘিরেও নতুন রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। প্রধান বিরোধী দলগুলো তাকে “ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগী” আখ্যা দিয়ে সংসদে তার ভাষণ দেয়ার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগের দাবি এবং তার সংসদীয় ভাষণকে কেন্দ্র করে বিষয়টি বড় ধরনের রাজনৈতিক সঙ্ঘাতে রূপ নিচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা: সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের এমপি বলেছেন, রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিন ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর ছিলেন, তাই সংসদে তার ভাষণ দেয়ার নৈতিক অধিকার নেই। বিরোধী পক্ষ নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগের দাবি জানিয়ে সরকারকে সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছে।
তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার এই মুহূর্তে রাষ্ট্রপতি মো: সাহাবুদ্দিনকে অপসারণ বা পরিবর্তনের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছে না বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি বলেও জানা গেছে।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেছেন, বর্তমান রাষ্ট্রপতির মেয়াদের এখনো উল্লেখযোগ্য সময় বাকি রয়েছে। ফলে সংবিধান অনুযায়ী এখনই নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রশ্ন ওঠে না। তাদের প্রশ্ন- রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রসঙ্গ হঠাৎ করে সামনে আনা হচ্ছে কেন?
সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ বহাল থাকলে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করা পর্যন্ত অথবা সংসদের মাধ্যমে অভিশংসন বা অপসারণ না হওয়া পর্যন্ত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের কোনো আইনগত সুযোগ নেই। ফলে রাষ্ট্রপতিকে ঘিরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, তার সমাধান মূলত রাজনৈতিক সমঝোতার মধ্য দিয়েই আসতে পারে।