কসবা রেলস্টেশনে তরুণের আত্মত্যাগ
বৃদ্ধকে বাঁচিয়ে রেললাইনে ঝরে গেল তোফায়েলের জীবন
Printed Edition
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক ব্রাহ্মণবাড়িয়া
মাত্র কয়েক সেকেন্ডের সিদ্ধান্ত। নিজের জীবনের কথা না ভেবে ছুটে যাওয়া এক তরুণ। আর সেই সিদ্ধান্তই বাঁচিয়ে দিলো একজন বৃদ্ধকে, কিন্তু কেড়ে নিলো তার নিজের জীবন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা রেলস্টেশনে তোফায়েল আহমেদের (২০) মৃত্যু এখন কেবল একটি দুর্ঘটনার খবর নয়; এটি মানবতা, সাহস ও আত্মত্যাগের এক মর্মস্পর্শী দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় কসবা রেলস্টেশনে দিনের শেষভাগের ব্যস্ততা চলছিল। কেউ ট্রেনের অপেক্ষায়, কেউ গল্প-আড্ডায় ব্যস্ত। বন্ধুদের সাথে স্টেশনে ঘুরতে এসেছিলেন তোফায়েলও। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘটে যায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, স্টেশনের এক লাইনে চট্টগ্রামগামী চট্টলা এক্সপ্রেস দাঁড়িয়ে ছিল। ট্রেন থেকে নেমে এক বৃদ্ধ অসাবধানতাবশত মাঝের রেললাইনের ওপর গিয়ে দাঁড়ান। বয়সের ভার কিংবা শ্রবণ সমস্যার কারণে তিনি বুঝতেই পারেননি, অন্য লাইন দিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে আসছে বিরতিহীন সুবর্ণ এক্সপ্রেস।
ট্রেনের হর্ন বেজে উঠছিল। চার পাশের মানুষ চিৎকার করে সতর্ক করার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু বৃদ্ধের কোনো সাড়া ছিল না। মুহূর্তেই বিপদের গভীরতা অনুধাবন করেন তোফায়েল।
এক সেকেন্ডও দেরি করেননি তিনি। নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে দৌড়ে রেললাইনের ওপর উঠে পড়েন। দ্রুত গিয়ে বৃদ্ধকে জোরে ধাক্কা দিয়ে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দেন। বৃদ্ধ প্রাণে বেঁচে যান। কিন্তু তাকে সরিয়ে দেয়ার পর নিজের জন্য আর সময় পাননি তোফায়েল। পরক্ষণেই দ্রুতগতির সুবর্ণ এক্সপ্রেসের ধাক্কায় ছিটকে পড়েন তিনি।
স্থানীয় লোকজন ও বন্ধুরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে কসবা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
তোফায়েলের মৃত্যুর খবরে তার গ্রামের বাড়ি আকছিনায় নেমে আসে শোকের ছায়া। স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। প্রতিবেশীরা জানান, তিনি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, নম্র ও পরোপকারী একজন তরুণ। অন্যের বিপদে এগিয়ে যাওয়াই ছিল তার স্বভাব। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ঘটনার দিন সকালেও স্টেশনে এক যাত্রীকে সম্ভাব্য দুর্ঘটনা থেকে সতর্ক করে রক্ষা করেছিলেন তোফায়েল। সন্ধ্যায় আরেকজন মানুষকে বাঁচাতে গিয়ে নিজের জীবনই উৎসর্গ করতে হলো তাকে।
কসবা রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন মাস্টার মো: হানিফ মিয়া বলেন, ‘একজন বৃদ্ধকে বাঁচাতে গিয়ে যুবকটির মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক।’ আখাউড়া রেলওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম শফিকুল ইসলাম জানান, প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের আবেদনের পর লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
যে বৃদ্ধকে বাঁচাতে প্রাণপণ ছুটে গিয়েছিলেন তোফায়েল, তিনি আজ জীবিত। কিন্তু তাকে বাঁচানোর সেই কয়েক সেকেন্ডের সাহসী সিদ্ধান্ত চিরতরে থামিয়ে দিয়েছে এক তরুণের জীবনযাত্রা।
সব মৃত্যু সমান নয়। কিছু মৃত্যু মানুষের হৃদয়ে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে আত্মত্যাগের প্রতীক হয়ে। কসবার তরুণ তোফায়েলের গল্পও তেমনই- একজন মানুষকে নতুন জীবন উপহার দিয়ে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া এক নিঃস্বার্থ মানবিকতার গল্প।