বাঁশবাগানের কালো ছায়া
Printed Edition
রেবা হাবিব
চাঁদ ঢাকা রাত। পুরো চরদিগন্তে নিস্তব্ধতা, শুধু বাতাসে বাঁশপাতার ঝিরঝির শব্দ। ঠিক তখনই একটা ধপ! শব্দ শুনল গ্রামের কাকুয়া দাদু। তিনি পাশের বাঁশবাগানের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, অন্ধকারে একটা কালো ছায়া ছুটে গেল নদীর দিকে।
পরদিন সকালেই খবর ছড়িয়ে গেল, গ্রামের পোস্ট অফিসে চুরি! চোর গেছে বাঁশবাগানের পথ দিয়েই। চুরি হওয়া জিনিসটা কোনো টাকা না, কোনো ডাকটিকিটও না। বরং একটা খাম। খামটার ভেতরে ছিল এক সরকারি জমির কাগজ। যেটা গ্রামেরই এক বৃদ্ধা বিধবা মহিলার নামে হওয়া কথা ছিল।
গ্রামের স্কুলে তখন টিফিন টাইম। তিন বন্ধু তামীম, নাবিলা, আর ফারহান বসে আছে স্কুলের পেছনের জামগাছের তলায়।
তামীম বলল, তুমি জানো, কাল রাতে পোস্ট অফিসে চুরি হয়েছে?
ফারহান চোখ বড় করে বলল, সত্যি? চোর কি টাকা নিলো?
‘না,’ বলল তামীম, ‘কাগজ। জমির কাগজ।’
নাবিলা ঠোঁট কামড়ে বলল, আমার মামা বলত, যে জমির কাগজ হারায়, সে জমি নিয়েই লড়াই শুরু হয়।
তামীমের মাথায় একটা আলোর ঝিলিক। সে চুপ করে বলল, চল, আমরা খুঁজে বের করি, এই চোরটা কে।
তামীমদের গ্রাম ছোট, সবাই সবার খবর জানে। তারা তিনজন সোজা গেল পোস্ট অফিসের পিওন রজব চাচার কাছে। রজব চাচা একটু অবিশ্বাস নিয়ে তাকালেন, তোমরা খোঁজ করবে?
তামীম বলল, আমরা শুধু দেখতে চাই চোর কেমন করে ঢুকেছে।
রজব চাচা হেসে বললেন, ঢোকার দরজা ভাঙা না। পেছনের জানালাটা খোলা। আর মেঝেতে পায়ের ছাপ।
তামীম নিচু হয়ে ছাপটা দেখে নিলো। ছাপ বড়, কিন্তু অসমান। যেন জুতো একপাশে কাত হয়ে আছে।
নাবিলা পেছনে তাকিয়ে বলল, এই ছাপ তো গতরাতে বাঁশবাগানের দিকেও ছিল।
ফারহান চুপচাপ একটা কথা বলল, আমার খালুদের ঘরে একজন কাজ করে, রহিম নামে। ওর জুতো এমনই একপাশে কাত হয়ে থাকে।
তামীম ধীরে বলল, তাহলে আমাদের দেখা করতে হবে রহিমের সাথে।
রহিম থাকে গ্রামের দক্ষিণপাড়ায়। তিনজন সন্ধ্যার পর চুপিচুপি গেল তার বাড়ির সামনে। বাড়ির পাশে একটা ছোট গোয়ালঘর, সেখানেই বসে রহিম হুঁকো টানছে।
তামীম ডাক দিলো, চাচা, কিছু জিজ্ঞেস করব?
রহিম হেসে বলল, এই সময়? বলো।
তামীম কৌশলে বলল, কাল রাতে চুরি হয়েছে পোস্ট অফিসে।
রহিম গম্ভীর মুখে বলল, শুনেছি। কিন্তু আমি ওই সময় কাজের জায়গায় ছিলাম।
তামীম তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, চাচা, আপনার জুতো একপাশে কাত হয়ে থাকে না?
রহিম একটু চমকে গেল।
তুমি এসব জানো কী করে?
দেখেছি, গতকাল।
রহিম হঠাৎ হেসে উঠল, তুমি বুদ্ধিমান ছেলে। তবে আমি চোর না।
নাবিলা জিজ্ঞেস করল, তাহলে ওই রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?
বাঁশবাগানের কাছে, গরু হারিয়েছিল। খুঁজছিলাম।
তামীম বলল, গরু খুঁজতে কেউ রাত ১টা পর্যন্ত থাকে?
রহিম চুপ হয়ে গেল।
পরের দিন সকালে তামীমরা গেল সেই বৃদ্ধা নারীর বাড়িতে, যার জমির কাগজ হারিয়েছে। নাম তার রহিমা খাতুন। চোখে কাচের চশমা, মুখে বলিরেখা। তামীম জিজ্ঞেস করল, খালা, আপনার কাগজটা কে নিয়ে গিয়েছিল জানেন?
রহিমা খাতুন দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, জানি না বাবা, কিন্তু ওই কাগজ না থাকলে সরকার আমার জমিটা ফিরিয়ে দেবে না। আমার একটাই টুকরো জমি ছিল।
তিনি একটু থেমে বললেন, আমার একমাত্র ছেলে তিন বছর আগে চলে গেছে ঢাকা। ওর নাম রহিম।
তিনজন চুপ। একসঙ্গে তাকিয়ে রইল।
সেদিন সন্ধ্যায় তামীম একা গেল বাঁশবাগানের দিকে। হালকা বাতাস, চাঁদের আলোয় গাছগুলো দুলছে। হঠাৎ সে দেখল এক মানুষ হাঁটু গেড়ে বসে কিছু খুঁড়ছে মাটিতে। তামীম নিঃশব্দে এগিয়ে গেল। টর্চের আলো ফেলতেই লোকটা ঘুরে দাঁড়াল, রহিম! তার হাতে কাদা মাখা খাম।
চাচা, আপনি!
রহিম স্তব্ধ হয়ে গেল।
তুমি
তামীম বলল, আপনি কেন চুরি করলেন?
রহিম কাঁপা গলায় বলল, চুরি করিনি বাবা, ওই কাগজ আমার মায়ের জমির ছিল। কিন্তু গ্রামের চেয়ারম্যান বলেছিল, ওই জমিটা আমি বিক্রি করেছি। আমি জানতাম মিথ্যে বলছে। তাই প্রমাণ লুকাতে চেয়েছিল।
তাহলে আপনি খামটা পুড়িয়ে ফেলেননি কেন?
পারিনি। মনে হচ্ছিল মা’র চোখের সামনে আমি অন্যায় করছি।
রহিম তখন কাগজটা মুছে হাতে নিয়ে বলল, তুমি এটা কাল সকালে স্কুলে জমা দিও। বলবে, বাঁশবাগানের নিচে পাওয়া গেছে।
তামীম বলল, না চাচা, আপনি নিজেই দেবেন।
রহিম তাকিয়ে থাকল, চোখে পানি।
আমার মুখ দেখলে কেউ বিশ্বাস করবে না।
তামীম বলল, আমি বলব। আমি দেখেছি সত্যি।
পরদিন সকালে পোস্ট অফিসের সামনে ভিড়। তামীম সবার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, খামটা আমি পেয়েছি বাঁশবাগানে। রহিম চাচা চুরি করেননি। কেউ তাঁকে ফাঁসাতে চেয়েছিল।
চেয়ারম্যান মুখ লাল করে চুপ করে গেল। রহিমা খাতুন চোখে জল নিয়ে বললেন, বাবা, আল্লাহ তোকে ভালো রাখুক।
রহিম সবার সামনে এগিয়ে এসে মায়ের পা ছুঁয়ে কাঁদতে লাগল। সব শেষ হবার পর তামীম একা বসে থাকে স্কুলের পেছনের জামগাছের নিচে। নাবিলা এসে বলল, তুই এমন চুপ কেন?
তামীম ধীরে বলল, সব রহস্যে জয় মানে শুধু অপরাধ ধরা না। কখনো কখনো অন্যায়ের ভেতরেও লুকানো থাকে একটা মানুষ, যে শুধু নিজের সত্যি ফেরত চায়।
নাবিলা কিছু বলল না। দুজন চুপচাপ নদীর দিকে তাকিয়ে রইল। বাঁশপাতা নড়ছে, বাতাসে যেন পুরনো কণ্ঠের প্রতিধ্বনি, সত্য লুকানো যায়, হারানো যায় না।