দ্রুত কমছে সুপেয় পানির স্তর বাড়ছে লোনাপানির আগ্রাসন
জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত পানি উত্তোলনের প্রভাব
Printed Edition
এস এম রহমান পটিয়া-চন্দনাইশ (চট্টগ্রাম)
জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির পাশাপাশি অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভের পানি উত্তোলনের কারণে চট্টগ্রামসহ সারা দেশে দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে সুপেয় পানির স্তর। অপর দিকে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর বরফপুঞ্জ সমান তালে গলছে। এতে দ্রুত ও ক্রমাগতভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে এক দিকে সুপেয় পানির স্তর দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে, অন্য দিকে সুপেয় পানির স্তরে প্রবেশ করছে সমুদ্রের লোনাপানি। পরিণতিতে শুষ্ক মৌসুমে সারা দেশের চাষাবাদ যেমন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে, তেমনি গ্রামের পর গ্রামে হাজার হাজার টিউবওয়েলে খাবার পানি উঠছে না। এতে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেখা দিচ্ছে সুপেয় পানির অভাব। অন্য দিকে ক্রমেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সাগর উপকূল বা নদী ও খালের ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করছে। পাশাপাশি সাগর উপকূল ও নদী-খাল তীরবর্তী সব ধরনের ছোট-বড় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
সম্প্রতি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতর চট্টগ্রামের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, উপরোক্ত কারণে চট্টগ্রাম জেলায় সুপেয় পানির স্তর খুব দ্রুত নিচের দিকে ধাবিত হচ্ছে। গত ১০ বছরের তথ্য নিয়ে সমীক্ষায় বলা হয়েছে, জেলার ১৫ উপজেলার মধ্যে দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপ ছাড়া সবকটি উপজেলায় সুপেয় পানির স্তর দ্রুত নিচে নামছে। এ কারণে বিগত ১০ বছরে প্রায় ১০-১২ হাজার গভীর অগভীর নলকূপ অকেজা হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া শুষ্ক মৌসুমে জেলার প্রতিটি উপজেলায় হাজার হাজার গভীর নলকূপেও পানি উত্তোলন বন্ধ হয়ে পড়ে।
সমীক্ষায় জানা গেছে, জেলার বাঁশখালী উপজেলায় সাগর উপকূলের বাহারছড়ায় গত ১০ বছরে পানির স্তর প্রায় ১৬২ ফুট নিচে নেমে গেছে। ২০১৫ সালে যা ছিল ৭১ ফুটের মধ্যে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদফতরের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ চন্দ্র দাস জানান, ক্রমাগত সুপেয় পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। এ কারণে চট্টগ্রাম জেলায় লাখ লাখ মানুষ পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই কারণে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার পৌর সদরের পৌরসভার সরকারিভাবে পাঁচটি মৌজা অতি উচ্চ পানি সঙ্কটাপন্ন ও তিনটি মৌজা উচ্চ পানি সঙ্কটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলার তিনটি ইউনিয়নের সাতটি মৌজা অতি উচ্চ পানি সঙ্কটাপন্ন এবং ৯টি ইউনিয়নের ২৭টি মৌজা উচ্চ পানি সঙ্কটাপন্ন এলাকা এবং আটটি ইউনিয়নের ৩০টি মৌজা মধ্যম পানি সঙ্কটাপন্ন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করে গত ২৮ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়।
সাতকানিয়া, সীতাকুণ্ড, রাউজান, মিরেরসরাই, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাঙ্গুনীয়া, সন্দ্বীপ, লোহাগাড়া ও কর্ণফুলী উপজেলায় দ্রুত সুপেয় পানির স্তর নিচে নামছে। এসব উপজেলাতেও শুষ্ক মৌসূমে নলকূপে পানি উত্তোলন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। অপর দিকে শুষ্ক মৌসুমে নদী, খাল-বিলে পানির স্তর নিচের দিকে নামতে থাকায় দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, চন্দনাইশ, কর্ণফুলী উপজেলার ১০ হাজার হেক্টর জমিতে সমুদ্রের লোনাপানি প্রবেশ করার কারণে বোরো ধানের আবাদ হয় না বলে এসব উপজেলার কৃষি অফিসাররা জানিয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ৩ আগস্ট থেকে টানা ৫ দিনের অতিভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা বন্যায় নির্মাণাধীন সাতকানিয়ার তেমুহনী অংশের প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়ক ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর মধ্যে পানির তোড়ে প্রায় ৫০০ মিটার রেললাইনের পাথর সরে গিয়ে লাইন বাঁকা হয়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢল গত ৫০ বছরের ভয়াবহতাকে যেন হার মানিয়েছিল।
এ ভয়াবহ বন্যা কয়েকটি কারণে হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের বিষয়টি। সেটি হচ্ছে বর্তমানে বিশ্বে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে। সেই সাথে বেড়েই চলেছে বৈশ্বিক উষ্ণতা আর সে কারণে উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর বরফপুঞ্জ গলছে আর সেই সাথে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েই চলেছে সমুদ্রপৃষ্ঠে পানির উচ্চতা।
অপর দিকে সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত শঙ্খ নদীর প্রায় ৪৪ কিলোমিটারই অরক্ষিত, এই ৪৪ কিলোমিটারে কোন বেড়িবাঁধ নেই, সে কারণে এবার এই দুই উপজেলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেশি। বাপাউবো সুত্র বলছে, ওই বন্যার সময় গড়ে ওয়াটার লেভেল ছিল ৬.৮৮ মিটার। এদিকে যে সব উপকূলে প্রতিরক্ষা কাজ করা হয়েছে তার উচ্চতা টপকে সাগরের পানি লোকালয়ে প্রবেশ করছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মো: বরকত আলী নয়া দিগন্তকে বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার যথাসম্ভব কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করা খুবই জরুরি। কৃষিকাজে ভূউপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়িয়ে শুধু খাবার পানি ভূগর্ভ থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
খাল-বিল, নদী-নালা, জলাশয়গুলো দখল না করে সেগুলোকে সংস্কার করে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি জানান, ইতোমধ্যে তেহরান, কাবুলের মতো শহরগুলোর পানির স্তর নেমে যাওয়ায় হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে, সে কারণে আমাদের এখনই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা অতি জরুরি হয়ে পড়েছে।