প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিতে চান প্রধান নির্বাচক বাশার

Printed Edition

জসিম উদ্দিন রানা

এমন এক অস্থির সময়ে জাতীয় দলের প্রধান নির্বাচকের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন হাবিবুল বাশার সুমন, যখন বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড নিজেই নানা বিতর্কে জর্জরিত। মাঠের বাইরের এই অস্থিরতা স্বাভাবিকভাবেই প্রভাব ফেলে মাঠের ভেতরের সিদ্ধান্তেও। তার ওপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রল, যেখানে যুক্তির চেয়ে আবেগ আর ব্যঙ্গই বেশি জায়গা পায়। নতুন নির্বাচকের পথটাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

তবে বাশারের জন্য এটি একেবারেই অচেনা মঞ্চ নয়। দেশের ক্রিকেটের দীর্ঘদিনের সৈনিক হিসেবে চাপ সামলানোর অভিজ্ঞতা তার কম নেই। প্রশ্ন হলো, নির্বাচক হিসেবে তিনি কতটা দৃঢ় থাকতে পারবেন নিজের পরিকল্পনায়। কারণ এই পদে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো জনপ্রিয়তার চেয়ে প্রয়োজনকে প্রাধান্য দেয়া। সমালোচনা এড়িয়ে চলা নয়, বরং তা থেকে সঠিক বার্তা নেয়ার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সফলতার চাবিকাঠি। বাশার জানান, ‘সবার আগে দেশ। ভালোর জন্য কি কি করা দরকার সেটিই করতে হবে, নিজের জনপ্রিয়তা মুখ্য নয়-প্রয়োজন অনুযায়ী দলকে কিভাবে ঢেলে সাজিয়ে সুবিধা/জয় আদায় করা যায় সে দিকেই মনোযোগটা থাকবে।’

বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাশারের সামনে দুটো পথ। চাপে নতি স্বীকার করা, অথবা নিজের ক্রিকেট-বোধে আস্থা রেখে সাহসী সিদ্ধান্ত নেয়া। যদি তিনি দ্বিতীয় পথটি বেছে নিতে পারেন, তবে ট্রল এক সময় থেমে যাবে, আর তার কাজই কথা বলবে। সময়ই বলে দেবে, এই ঝড়ো সময়ে তিনি কেবল একজন নির্বাচক, নাকি সত্যিকারের একজন স্থপতি।

আগে থেকে অনুমেয় ছিল বিসিবির প্রধান নির্বাচক হতে যাচ্ছেন সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন। গত সোমবার বিসিবি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিশ্চিত করেছে বাশারই জাতীয় ক্রিকেট দলের প্রধান নির্বাচক। এ ছাড়া তার সহকারী হিসেবে আছেন হাসিবুল হোসেন শান্ত, নাদিফ চৌধুরী এবং নাঈম ইসলাম। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ৫৩ বছর বয়সী বাশারের নির্বাচক হিসেবে আগেও কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। জাতীয় দল ও নারী দলের নির্বাচক প্যানেলে দায়িত্ব পালন করেছেন। খেলোয়াড়ি জীবনে ছিলেন দেশের অন্যতম সেরা ব্যাটার। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে টেস্টে তিন হাজার রান করার কৃতিত্বও তার।

বাংলাদেশ ক্রিকেটে নির্বাচক প্যানেল মানেই যেন এক উত্তপ্ত কড়াই, যেখানে প্রতিনিয়ত বয়ে চলে আলোচনা আর সমালোচনার ঝড়। সেই ঝড়ের কেন্দ্রে এবার বসলেন দেশের ইতিহাসের অন্যতম সফল অধিনায়ক হাবিবুল বাশার সুমন। ১ এপ্রিল থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে প্রধান নির্বাচকের দায়িত্ব নিতে যাওয়া বাশার স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, বাইরের কোনো চাপে নয়, বরং নিজের বিচার-বুদ্ধি আর হৃদয়ের ডাক শুনেই দল গড়বেন তিনি। বিসিবির প্রধান নির্বাচক হওয়া মানেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রলিং আর সমালোচনার শিকার হওয়া- এটি এখন বাংলাদেশের ক্রিকেটে এক অলিখিত নিয়ম।

তবে ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় অধিনায়ক ও পরে নির্বাচক হিসেবে কাটানো বাশার এতে বিচলিত নন।

গতকাল তিনি জানালেন, ‘আমি জানি আমি সবসময় সঠিক হবো না, আমি মানুষ, ভুল আমারও হতে পারে। কিন্তু আমার জাজমেন্ট বা আমার হৃদয় যেটা বলবে, আমি সেটাই করবো। সেটার জন্য যদি কথা শুনতে হয়, তবে শুনবো। আমি এটা মেনেই দায়িত্ব নিয়েছি যে দশজনের মধ্যে পাঁচজন আমাকে ঠিক বলবে আর পাঁচজন বলবে ভুল। ট্রল হোক কিংবা লেখালেখি, এগুলো নিয়ে আমি মোটেও চিন্তিত নই। আমি যখন অধিনায়ক ছিলাম, তখনও এসবের মধ্য দিয়ে গিয়েছি। আমার মূল লক্ষ্য থাকবে টিম নিয়ে কাজ করা, কে কী লিখলো তা আমার কাজকে বাধাগ্রস্ত করবে না।’

আপনি কতটুকু খুশি এবং কি চ্যালেঞ্জ দেখছেন। জবাবটা সহজেই দিলেন, ‘নির্বাচক প্যানেলে তো নতুন নই। অনেক বছর যাবতই আছি। শুধু পজিশনটা পরিবর্তন হয়েছে এবং দায়িত্বটা আরো বেড়েছে। আগে যেমন উপরের জনের সাথে আলাপ করতে হতো, এখন সে জায়গাটার অভিভাবক আমি নিজেই। এটাই চ্যালেঞ্জ। দায়িত্বে থেকে দেশকে রিপ্রেজেন্ট করা, দলকে রিপ্রেজেন্ট করা, সুফল বয়ে আনা আরো বেশি গর্বের।

নতুন এই নির্বাচক প্যানেলের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ পর্যন্ত। দীর্ঘমেয়াদী এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বাশারের ভাবনায় রয়েছে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক। শুধু ১৫ জনের স্কোয়াড নয়, বরং ব্যাক-টু-ব্যাক সিরিজের চাপ সামলাতে অন্তত ২৫ জনের একটি শক্তিশালী খেলোয়াড় পুল তৈরি করতে চান তিনি।

নতুন চার সদস্যের নির্বাচক প্যানেল আসন্ন নিউজিল্যান্ড সিরিজ থেকেই তাদের কার্যক্রম শুরু করবে। নাঈম ও নাদীফের মতো ঘরোয়া ক্রিকেটের অভিজ্ঞদের নিয়ে গড়া এই প্যানেল পাইপলাইনের ওপর কড়া নজর রাখবে। গাজী আশরাফ হোসেন লিপুর ফেলে যাওয়া দুই বছরের পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেই নিজের ইনপুট দিতে চান। ঘরোয়া ক্রিকেটের অবকাঠামো এবং উইকেট নিয়ে তার নিজস্ব দর্শন রয়েছে, যা তিনি নির্বাচক হিসেবে প্রয়োগ করতে আগ্রহী। বাশারের হাত ধরে নির্বাচক প্যানেলে এক নতুন সাহসী সংস্কৃতির সূচনা হতে যাচ্ছে।

প্রায় দুই বছর ধরে প্রধান নির্বাচকের দায়িত্বে ছিলেন গাজী আশরাফ হোসেন লিপু। তার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আরও এক মাস দায়িত্ব পালনের অনুরোধ জানানো হয় তাকে। মার্চ মাসেই তার দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটছে। লিপুর সময়ের নির্বাচক প্যানেলে শুরুতে হান্নান সরকার ও আবদুর রাজ্জাক ছিলেন। পরবর্তীতে যুক্ত হন হাসিবুল হোসেন শান্ত, যিনি এবারও নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন। রাজ্জাক পরে বোর্ড পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব নেন।

৫৩ বছর বয়সী হাবিবুল বাশার এর আগে বাংলাদেশ পুরুষ ও নারী দলের নির্বাচক হিসেবে কাজ করেছেন। খেলোয়াড়ি জীবনে তিনি ছিলেন দলের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ব্যাটার এবং টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রথম ৩০০০ রান সংগ্রাহক।

চার সদস্যের নির্বাচক কমিটিতে নাদিফ ও নাঈমও ঘরোয়া ক্রিকেটে পরিচিত মুখ। ছক্কা নাঈম হিসেবে খ্যাতি ছিল তার। পাশাপাশি ঘূর্ণি জাদুতে ব্যাটারদের কাবু করতেন। প্রায় ২০ বছরের ক্যারিয়ারে ২০ হাজারের বেশি রান করেছেন নাঈম। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে সর্বোচ্চ ৩৪ সেঞ্চুরির রেকর্ডও তার। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ৮ টেস্ট, ৫৯ ওয়ানডে ও ১০ টি-২০ খেলেছেন তিনি। টেস্টে একমাত্র সেঞ্চুরি মিরপুরে করেছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে।

নাদিফ আন্তর্জাতিক টি-২০তে তিন ম্যাচ খেলেছেন। তবে তার ২০ বছর খেলার অভিজ্ঞতা রয়েছে। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটে ১৩২ ম্যাচ, লিস্ট ‘এ’ তে ১৫০ ও টি-২০তে ৬১ ম্যাচ খেলেছেন। আর হাসিবুল হোসেন শান্ত ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর থেকেই বিসিবির নির্বাচক প্যানেলে ছিলেন। ঈদের আগে শেষ হওয়া বাংলাদেশ-পাকিস্তান সিরিজ দিয়ে লিপুর মেয়াদ শেষ হয়েছে।