মিয়ানমার-থাইল্যান্ডে শক্তিশালী ভূমিকম্প
Printed Edition
- মিয়ানমারে শতাধিক মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা, ব্যাংককে ৭০ শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন
- জুমার নামাজের সময় মসজিদ ধসে ২০ জন নিহত
- আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে সাহায্য চায় মিয়ানমারের জান্তা সরকার
- থাইল্যান্ডে ৩০ তলা ভবন ধস, ভেতরে আটকা ৪৩ কর্মী
মিয়ানমারে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। রিখটার স্কেলে এই কম্পনের মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ৭। পরে সেখানে আরেকটি কম্পন অনুভূত হয়। দ্বিতীয় ওই কম্পনের মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৪। মিয়ানমারের পাশাপাশি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককসহ এই অঞ্চলের অন্যান্য স্থানেও কম্পনের খবর পাওয়া গেছে। শক্তিশালী এই কম্পনের পর মিয়ানমারের ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককেও। বিবিসি ও এএফপি।
ভূমিকম্পে মিয়ানমারে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ভূমিকম্পে ভবন ধসের ঘটনায় নিখোঁজ শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৭০ জন হয়েছে। শুক্রবার বিবিসি বার্মিজ সার্ভিসকে মান্দালাই অঞ্চলে কর্মরত উদ্ধারকারী দলের একজন সদস্য বলেছেন, ‘ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি’। তিনি বলেন, ‘মৃত্যুর সংখ্যাও অনেক বেশি, আমরা এখন শুধু এটুকুই বলতে পারি। কারণ উদ্ধার অভিযান চলছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘হতাহতদের সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি। তবে এটি অন্তত শতাধিক।’
অন্য দিকে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে ভূমিকম্পে ভবন ধসের ঘটনায় নিখোঁজ শ্রমিকের সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৭০ জন হয়েছে। মিয়ানমারে যে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয় তা থাইল্যান্ডেও অনুভূত হয়েছে। ক্রমাগত এর কারণে ক্ষয়ক্ষতির হিসাব বাড়ছে। থাইল্যান্ডের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ইমার্জেন্সি মেডিসিন বলছে, নির্মাণাধীন ৩০ তলা ভবন ধসের ঘটনায় আগে যেখানে ৪৩ জন নিখোঁজ হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছিল, এটি বেড়েছে। ধসের সময় সেখানে প্রায় ৩২০ জন কর্মী ছিলেন এবং তাদের মধ্যে ২০ জনের মতো লিফটে আটকা পড়েছেন। ওই ভবনের নিচে পড়ে মৃত্যুর সংখ্যা অস্পষ্ট। উদ্ধারকারীরা জীবিতদের সন্ধান চালিয়ে যাওয়ার কারণে ঘটনাস্থলে একটি অস্থায়ী হাসপাতাল স্থাপন করা হয়েছে।
তবে স্কাই নিউজ জানায়, যে ব্যাপক শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে, তাতে মোট নিহতের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতত্ত্ব জরিপ ও গবেষণা সংস্থা ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস)। নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেয়া এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে সংস্থাটি। ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, ‘যে মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে, তাতে আমারা ধারণা করছি যে মিয়ানমারের বিস্তৃত অংশজুড়ে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং এক হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।’
ভূমিকম্পের পর মিয়ানমারের হালনাগাদ অবস্থা সম্পর্কে এখনো বেশি তথ্য পাওয়া যায়নি; তবে থাইল্যান্ডে ক্ষয়ক্ষতির বিভিন্ন চিত্র, ভিডিও ও তথ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে এবং এসব থেকে বোঝা যাচ্ছে যে ভূমিকম্পটি বেশ বিধ্বংসী ছিল।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, প্রথম কম্পনের ১২ মিনিট পর ৬.৪ মাত্রার আরো একটি ভূমিকম্প অনুভূত হয়। থাইল্যান্ডের সংবাদমাধ্যম থাই পিবিএস জানিয়েছে, ব্যাংককের চাতুচাক জেলায় নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবনে একজন নিহত হয়েছেন। ধ্বংসস্তূপে আটকা পড়েছেন ৪৩ জন।
এ দিকে মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইলেভেন মিডিয়া গ্রুপ জানিয়েছে, দেশটির টাউঙ্গু শহরে একটি মঠ ধসে পড়ে পাঁচজন বাস্তুচ্যুত শিশু নিহত হয়েছে। এ ছাড়াও শুক্রবারে নামাজের সময় মান্দালয় অঞ্চলের শোয়ে ফো শিং মসজিদে ভূমিকম্পে কমপক্ষে ২০ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মিয়ানমার-ভিত্তিক বার্তা সংস্থা খিত থিত মিডিয়া।
একজন উদ্ধারকর্মী জানিয়েছেন, ‘আমরা যখন নামাজ পড়ছিলাম তখন এটি ধসে পড়ে। প্রায় তিনটি মসজিদ ধসে পড়ে। সেখানে মানুষ আটকা পড়ে আছে। এখন পর্যন্ত কমপক্ষে ২০ জন মারা গেছেন। নিহতের সংখ্যা আরো বেশি হতে পারে। শোয়ে ফো শিং মসজিদটিও ধসে পড়েছে।’ রাজধানী নেপিদওয়ের একটি প্রধান হাসপাতালেও অনেক হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।
মিয়ানমার রাষ্ট্র পরিচালিত এমআরটিভি তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে রাজ্য প্রশাসন পরিষদের এক বিবৃতির উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সাগাইং অঞ্চল, মান্দালয় অঞ্চল, ম্যাগওয়ে অঞ্চল, উত্তর-পূর্ব শান রাজ্য, নে পি তাও কাউন্সিল এলাকা ও বাগো অঞ্চলের ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। অন্য দিকে থাই পিবিএস নিউজের খবরে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের পর থাই কর্তৃপক্ষ ব্যাংকককে ‘জরুরি অঞ্চল’ ঘোষণা করেছে।
বার্তাসংস্থাটি বলছে, ভূমিকম্পের পর ছয়টি অঞ্চলে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে মিয়ানমারের জান্তা সরকার। দেশটির সরকারি এক বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ভয়াবহ এই ভূমিকম্পের পর আন্তর্জাতিক সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে মিয়ানমারের জান্তা।
অন্য দিকে শক্তিশালী ভূমিকম্পের আঘাতের পর থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে। থাই প্রধানমন্ত্রী পেতাংতার্ন সিনাওয়াত্রা জানিয়েছেন, মিয়ানমারকে কেন্দ্র করে একটি বড় ভূমিকম্পে ব্যাংকক শহরে আঘাত হানার পর শুক্রবার থাই কর্তৃপক্ষ ব্যাংককে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে। ৭.৭ মাত্রার এই ভূমিকম্পের পর ব্যাংকক জুড়ে বহু ভবনে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। যার মধ্যে শহরের উত্তরে ধসে পড়া ৩০ তলা নির্মাণাধীন আকাশচুম্বী ভবনও রয়েছে।
পৃথক খবরে বিবিসি জানিয়েছে, মিয়ানমারে শুক্রবার দুপুরের দিকে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পের কেন্দ্রস্থল ছিল দেশটির উত্তর-পশ্চিমের শহর সাগাইং থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরে।
এলাকাটি রাজধানী নেপিদো থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তরে। নেইপিদো থেকে বার্তাসংস্থা এএফপির সংবাদদাতা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের আঘাতে সেখানে বিভিন্ন রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং অনেক ভবনের ছাদ থেকে আস্তরণ খসে পড়েছে। ভূমিকম্প এতই শক্তিশালী ছিল যে শত শত মাইল দূরে চীন ও থাইল্যান্ড থেকেই কম্পন অনুভূত হয়। ভূমিকম্পের পর একটি তাৎক্ষণিক বৈঠকের পর ব্যাংককে জরুরি অবস্থা জারি করে থাই সরকার।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে বিভিন্ন ভবন থেকে লোকজন বের হয়ে এসে রাস্তায় জড়ো হচ্ছে। একটি ভবনের ছাদের সুইমিংপুল থেকে পানি বাইরে নিচের দিকে ছিটকে পড়তে দেখা গেছে। ব্যাংকক থেকে বিবিসির সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পের কারণে ভবনগুলো দুলতে শুরু করে। কয়েকটি ভবনের জানালাও ভেঙে পড়তে দেখা গেছে।
মিয়ানমার দমকল বিভাগের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, “আমরা অনুসন্ধান শুরু করেছি এবং হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ যাচাইয়ে ইয়াংগনের আশপাশ ঘুরে দেখছি।” সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা মান্দালয়ের অনেকের পোস্টে ধসে পড়া ভবন ও রাস্তায় পড়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের চিত্র দেখা যাচ্ছে। এসব পোস্টের সত্যতা যাচাই করতে পারেনি রয়টার্স।
শহরটিতে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, ‘সব কিছু কাঁপতে শুরু করলে আমরা সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে আসি। চোখের সামনে পাঁচতলা ভবন ধসে পড়তে দেখেছি। আমার শহরের সবাই রাস্তায় নেমে এসেছে এবং কেউ ভবনের ভেতরে ফিরে যেতে সাহস পাচ্ছে না।’ তেট নাইং উ নামের আরেক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ধসে পড়ে একটি চায়ের দোকানের ভেতর কয়েকজন আটকা পড়েছেন। ‘আমরা ভেতরে যেতে পারছি না। পরিস্থিতি খুবই খারাপ’- বলেছেন তিনি।