প্যারিসের ক্যাটাকম্বস মাটির নিচে ছয় মিলিয়ন মানুষের নীরব নগরী

Printed Edition
back-2
প্যারিসের ক্যাটাকম্বস মাটির নিচে ছয় মিলিয়ন মানুষের নীরব নগরী

মোহাম্মদ মাহবুব হোসাইন, প্যারিস থেকে

বিশ্বের অন্যতম আকর্ষণীয় শহর প্যারিসের নাম উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আইফেল টাওয়ার, শিল্পকলা, ফ্যাশন, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং রোমান্টিক পরিবেশের ছবি। কিন্তু এই আলোকোজ্জ্বল শহরের নিচে লুকিয়ে আছে এক সম্পূর্ণ ভিন্ন জগৎ যা অন্ধকার, নীরব এবং ইতিহাসের ভারে ভারাক্রান্ত। মাটির প্রায় ২০ মিটার নিচে বিস্তৃত প্যারিসের ‘ক্যাটাকম্বস’ বা পাতালসমাধি পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ভূগর্ভস্থ অস্থিভাণ্ডারগুলোর একটি। এখানে সংরক্ষিত রয়েছে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের অস্থি, যা একে বিশ্বের বৃহত্তম মানব-অস্থি সংগ্রহশালাগুলোর মধ্যে স্থান দিয়েছে।

প্যারিসের ক্যাটাকম্বস বা পাতালসমাধির ইতিহাস মূলত শহরের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগর ব্যবস্থাপনার সঙ্কটের সাথে জড়িত। মধ্যযুগ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত শহরের অধিকাংশ লাশ কেন্দ্রস্থ কবরস্থানগুলোতে দাফন করা হতো। বিশেষ করে ‘লে ইনোসঁ’ বা ‘নির্দোষদের কবরস্থান’ কবরস্থানটি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ব্যবহৃত হওয়ায় পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কবরস্থান-সংলগ্ন ভবনগুলোর বেসমেন্টে মানবদেহের অবশেষ ও দূষিত পদার্থ প্রবেশ করতে শুরু করে। দুর্গন্ধ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে নাগরিকদের অভিযোগ ক্রমেই বাড়তে থাকে।

১৭৮০ সালে একটি দেয়াল ধসে পড়ে কবরস্থানের পচনশীল দেহাবশেষ পাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়। সিদ্ধান্ত হয়, শহরের নিচে অবস্থিত পরিত্যক্ত চুনাপাথরের খনিগুলোকে অস্থি সংরক্ষণের জন্য ব্যবহার করা হবে। ১৭৮৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে লাশের অস্থি স্থানান্তরের কাজ শুরু হয়। রাতের অন্ধকারে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গাড়িভর্তি অস্থি কবরস্থান থেকে এনে ভূগর্ভস্থ খনিগুলোতে রাখা হতো। এই প্রক্রিয়া কয়েক দশক ধরে চলতে থাকে।

প্যারিসের নিচে থাকা চুনাপাথরের খনিগুলোর ইতিহাস আরো প্রাচীন। রোমান যুগ থেকে মধ্যযুগ পর্যন্ত এসব খনি থেকে পাথর উত্তোলন করে শহরের অসংখ্য ভবন, গির্জা ও স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছিল। ফলে শহরের নিচে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে বিশাল এক সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক। পরিত্যক্ত হওয়ার পর সেই সুড়ঙ্গগুলোই পরবর্তীকালে কাটাকম্বে রূপান্তরিত হয়।

বর্তমানে প্যারিসের ভূগর্ভে প্রায় ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে এর খুব সামান্য অংশ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। পর্যটকদের জন্য নির্ধারিত পথের দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় কিলোমিটার। সেখানে পৌঁছাতে একটি সর্পিল সিঁড়ি বেয়ে প্রায় ১৩০ ধাপ নিচে নামতে হয়। নিচে নামার পর দর্শনার্থীরা এমন এক পরিবেশে প্রবেশ করেন, যা একই সাথে বিস্ময়কর, ভীতিকর এবং চিন্তার উদ্রেককারী।

ক্যাটাকম্বস বা পাতালসমাধির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো মানুষের অস্থির শিল্পসম্মত বিন্যাস। প্রথম দিকে অস্থিগুলো এলোমেলোভাবে সংরক্ষণ করা হলেও উনবিংশ শতকের শুরুতে এগুলোকে নতুনভাবে সাজানো হয়। খুলি ও দীর্ঘ হাড়গুলোকে নান্দনিক নকশায় স্তূপাকারে সাজিয়ে তৈরি করা হয় দেয়াল। ফলে এটি কেবল একটি অস্থিভাণ্ডার নয়, বরং এক ধরনের স্মৃতিসৌধে পরিণত হয়েছে।

ক্যাটাকম্বস বা পাতালসমাধির ভেতরে প্রবেশের পর একটি বিখ্যাত শিলালিপি দর্শনার্থীদের চোখে পড়ে- আরেত! সে ইসি লঁপির দ্য লা মোর, অর্থাৎ থামো! এখানে মৃত্যুর সাম্রাজ্য শুরু। এই বাক্যটি যেন পুরো স্থানটির প্রতীক। এরপর দীর্ঘ করিডোর ধরে হাঁটতে হাঁটতে দর্শনার্থীরা হাজার হাজার খুলি ও অস্থির সারি দেখতে পান। কোথাও কোথাও দেয়ালে কবিতা, দার্শনিক উক্তি এবং ধর্মীয় বাণী খোদাই করা রয়েছে, যা জীবন ও মৃত্যুর সম্পর্ক নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে।

প্যারিস সফরে আসা স্পেনের পর্যটক মারিয়া গনজালেস বলেন, আমি অনেক ঐতিহাসিক স্থান দেখেছি, কিন্তু কাটাকম্বের অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে এসে বুঝতে পারি মানুষের জীবন কত ক্ষণস্থায়ী। হাজার হাজার খুলি ও অস্থি একসাথে দেখে এক ধরনের শিহরণ জাগে।

যুক্তরাষ্ট্রের পর্যটক ড্যানিয়েল রিচার্ডসের ভাষায়, এটি শুধু ভয়ের জায়গা নয়, বরং ইতিহাসের একটি জীবন্ত দলিল। প্রতিটি অস্থির পেছনে একটি জীবন, একটি পরিবার এবং একটি গল্প রয়েছে।

বাংলাদেশী শিক্ষার্থী নাফিস রহমান, সম্প্রতি প্যারিস ভ্রমণ করে বলেন, ছবিতে কাটাকম্ব দেখেছি, কিন্তু বাস্তবে অভিজ্ঞতাটি অনেক বেশি শক্তিশালী। মাটির নিচে এত মানুষের অস্থি একসাথে সংরক্ষিত আছে- এটি কল্পনারও বাইরে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্যাটাকম্বস বা পাতালসমাধিকে শুধু পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এটি প্যারিসের নগর ইতিহাস, জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। ফরাসি ফরেনসিক নৃতত্ত্ববিদ ফিলিপ শার্লিয়ের মতে, ক্যাটাকম্বস আমাদের দেখায় কীভাবে একটি বড় শহর জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যঝুঁকির মতো সমস্যার মোকাবেলা করেছে। এটি শুধু মৃত্যুর ইতিহাস নয়, নগর পরিকল্পনার ইতিহাসও।

নৃতত্ত্ববিদ ও প্রতœতাত্ত্বিকদের মতে, এখানে সংরক্ষিত মানবঅস্থি অতীতের মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্যাভ্যাস, রোগব্যাধি এবং জীবনযাত্রা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য দেয়। গবেষণার মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ের মানুষের জীবনমান ও সামাজিক অবস্থার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা সম্ভব হয়েছে। তাদের মতে, প্যারিসের কাটাকম্ব এক অর্থে মানবসভ্যতার স্মৃতি সংরক্ষণের বিশাল আর্কাইভ।

ঐতিহাসিকভাবে ক্যাটাকম্বস বা পাতালসমাধি শুধু অস্থি সংরক্ষণের স্থানই নয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফরাসি প্রতিরোধ যোদ্ধারা এর কিছু অংশকে গোপন ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। একই সময়ে জার্মান বাহিনীও ভূগর্ভস্থ কিছু এলাকায় বাঙ্কার স্থাপন করেছিল। ফলে এটি যুদ্ধকালীন ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় বহন করে।