প্রতিবন্ধী নারীদের কারুপণ্য যাচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকায়

Printed Edition
bangla-4
ময়মনসিংহে হাতের বুনন কাজ করছেন প্রতিবন্ধী নারীরা : নয়া দিগন্ত

সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ অফিস

ময়মনসিংহ নগরীর কাঁচিঝুলির জয়নুল রোডের একটি পুরোনো ভবনের ভেতর ঢুকতেই কানে আসে তাঁতের খটখট শব্দ। ছোট ছোট কক্ষে বসে একদল নারী মনোযোগ দিয়ে বুনে চলেছেন কার্পেট, শতরঞ্জি আর নানা ধরনের কারুপণ্য। তাদের কারো কানে শোনার সমস্যা, কেউ কথা বলতে পারেন না, কেউবা হুইলচেয়ারে বসেই কাজ করেন। তবু থেমে নেই তাদের হাত; চলছে জীবন গড়ার নিরলস চেষ্টা।

এই ভবনেই ‘প্রতিবন্ধী আত্ম-উন্নয়ন সংস্থা’র তত্ত্বাবধানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন নারীরা তৈরি করছেন দৃষ্টিনন্দন কারুপণ্য। ঝুট, পুরনো কাপড়, রিসাইকেল সুতা ও নানা উপকরণ দিয়ে তৈরি এসব পণ্য এখন দেশ ছাড়িয়ে পৌঁছে যাচ্ছে ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে।

এই কর্মযজ্ঞেরই একজন নীরব যোদ্ধা নপালী। নেত্রকোনার সুসং দুর্গাপুরের বাসিন্দা এই নারী জন্মের পর থেকেই পোলিওতে আক্রান্ত। এখন তার বয়স ৩৫। দুই চাকার হুইলচেয়ারে বসেই কাটে তার কর্মজীবনের প্রতিটি দিন। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর বড় বোন হিসেবে সংসারের ভার এসে পড়ে তার কাঁধে। কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দুই ছোট বোনকে পড়ালেখা করিয়ে বিয়ে দিয়েছেন তিনি। ২০০৭ সালে ‘প্রতিবন্ধী আত্ম-উন্নয়ন সংস্থা’র সাথে যুক্ত হন নপালী। শুরুতে কোনো লেখাপড়া জানতেন না। এখানে এসে ছয় মাস প্রশিক্ষণের পাশাপাশি লেখাপড়া শিখেছেন। এখন তিনি দক্ষ হাতে কার্পেট বুনতে পারেন, সেলাইও করেন। হুইলচেয়ারে বসে কার্পেট বুনতে বুনতেই নপালী বলেন, এখানে এসে কাজ শিখেছি। এখন নিজের আয় আছে। নিজের মতো করে বাঁচতে পারছি।

ঘরের চারপাশে সাজানো রয়েছে তাদের তৈরি রঙিন কার্পেট, মেয়েদের ব্যাগ, সিঁকেসহ নানা ধরনের কুটিরশিল্প পণ্য। নান্দনিক নকশা আর মানসম্মত কাজের কারণে এসব পণ্য বিদেশী ক্রেতাদের কাছেও সমাদৃত হচ্ছে। বর্তমানে ফ্রান্স, জাপান, বেলজিয়ামসহ ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে এসব কারুপণ্য। প্রতিষ্ঠানের আরেক কর্মী রিতা আক্তার জানান, এখানে আসার আগে জানতাম না এত প্রতিবন্ধী নারী কাজ করছেন। প্রতিবন্ধীদের তৈরি পণ্য বিক্রির জন্য ‘প্রজাপতি ক্রাফট’ নামে একটি নিজস্ব শোরুমও রয়েছে।

প্রতিবন্ধী আত্ম-উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শেফালী আক্তার বলেন, এটি সম্পূর্ণ প্রতিবন্ধীদের জন্য একটি সেবামূলক উদ্যোগ। এখানে যারা কাজ করেন সবাই প্রতিবন্ধী, এমনকি পরিচালনার সাথেও প্রতিবন্ধীরা যুক্ত। বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ২৫০ জন সদস্য রয়েছে। আমাদের মূল লক্ষ্য প্রতিবন্ধী নারীদের স্বাবলম্বী করে তোলা। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও একটি স্থায়ী কারখানা পেলে এই উদ্যোগ আরো বড় করা সম্ভবব। ময়মনসিংহ জেলা সমাজসেবা উপপরিচালক রাজু আহমেদ বলেন, সমাজসেবা অধিদফতরের পক্ষ থেকে আমরা তাদের সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি।