কটিয়াদীতে ধানি জমিতে ইঁদুরের আক্রমণ, দিশেহারা কৃষক

Printed Edition

কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা

স্বপ্ন ছিল আর কিছুদিন পরই সবুজ ধানের শীষে ভরে উঠবে মাঠ। বৈশাখে ঘরে উঠবে সোনালি ফসল, হাসি ফুটবে কৃষকের মুখে। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন ভেঙে গেছে ইঁদুরের তাণ্ডবে। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলায় মাঠের পর মাঠ ধানের চারা কেটে নষ্ট করছে ইঁদুর। ফলে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে বোরো মৌসুমে আবাদ করা ধান, ভুট্টা ও বাদামের জমিতে ব্যাপক হারে ইঁদুরের উপদ্রব দেখা দিয়েছে। কৃষকেরা জানান, প্রতিদিন সকালে জমিতে গিয়ে কাটা ও নষ্ট হয়ে যাওয়া চারা দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন তারা। বিভিন্ন ধরনের বিষ ও ফাঁদ ব্যবহার করেও নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না এই উপদ্রব।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে কটিয়াদীতে প্রায় ১২ হাজার ৮৫ হেক্টর জমিতে বোরোর আবাদ হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, উঠতি ধানের চারার গোড়া কেটে ফেলছে ইঁদুর। কোথাও বড় গর্ত তৈরি করে কাটা ধান জমিয়ে রাখছে। শুধু ধানই নয়, ভুট্টা ও বাদামের ক্ষেতেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে মসূয়া ইউনিয়নের বেতাল, রামদি, বৈরাগীচর ও আলগীচর; লোহাজুরী ইউনিয়নের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল; জালালপুর ইউনিয়নের চরপুক্ষিয়া, আতকাপাড়া, ফেকামারা ও কুটির বিলসহ বনগ্রাম, সহস্রম, ধুলদিয়া, করগাঁও, চান্দপুর, আচমিতা ও মুমুরদিয়া ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ অঞ্চল।

লোহাজুরী ইউনিয়নের উত্তর বাহেরচর গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলাম সিরাজী বলেন, প্রথমবারের মতো ৫৬ শতাংশ জমিতে সুপার হাইব্রিড-২৮ জাতের ধান আবাদ করেছি। কিন্তু ইঁদুর ধানক্ষেতের অনেকাংশই নষ্ট করে ফেলেছে। এখন পর্যন্ত কৃষি অফিস থেকে কোনো পরামর্শ পাইনি। ইঁদুরের আক্রমণ ঠেকাতে না পারলে উৎপাদন খরচও উঠবে না। একই অবস্থা বৈশাকুড়ি বিল এলাকার কৃষক আব্দুর রশিদ, জসিম উদ্দিন ও শহিদুল হোসেনের জমিতেও। তারা জানান, দিন দিন ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে, কিন্তু কার্যকর সমাধান পাচ্ছেন না তারা।

মসূয়া ইউনিয়নের কড়েহা গ্রামের স্কুলশিক্ষক কামরুল ইসলাম বলেন, আমার ভুট্টা ক্ষেতেও ইঁদুরের আক্রমণ হয়েছে। চোখের সামনে কষ্টের ফসল নষ্ট হতে দেখে ভীষণ খারাপ লাগছে। কটিয়াদী পৌর এলাকার লেংটিয়া গ্রামের কৃষক হাবিবুর রহমান হাবিব বলেন, ইঁদুরে আমার প্রায় অর্ধেক জমির ধান নষ্ট করে ফেলেছে। কিভাবে এই সমস্যা মোকাবেলা করব বুঝতে পারছি না।

মসূয়া ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক ফয়সাল জানান, ধানের ভালো ফলন দেখে আনন্দে ভরে উঠেছিল মন। হঠাৎ ইঁদুরের আক্রমণে সেই আনন্দ মিলিয়ে যাচ্ছে। এখন লাভ তো দূরের কথা, আসল উঠে আসবে কিনা শঙ্কায় আছি।

এদিকে স্থানীয় বাজারে ইঁদুরনাশক ওষুধের চাহিদা বেড়ে গেছে। মসূয়া বেতাল বাজারের কীটনাশক ব্যবসায়ী শাহজাহান তালুকদার বলেন, গত কয়েকদিন ধরে ইঁদুর মারার ওষুধ বিক্রি বেড়েছে। ইঁদুরের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ কৃষকরা।

কৃষকদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না। দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন তারা।

এ বিষয়ে কটিয়াদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শফিকুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘উপজেলায় ইঁদুরের উপদ্রব রয়েছে, তবে তা বিচ্ছিন্নভাবে। কৃষকদের আমরা সচেতন করছি এবং সম্মিলিতভাবে ইঁদুর নিধনের পরামর্শ দিচ্ছি। সবাই একসাথে কাজ করলে ইঁদুরের আক্রমণ থেকে ফসল রক্ষা করা সম্ভব। তিনি আরো জানান, বাঁশের তৈরি ফাঁদ, বিষ ফাঁদ ব্যবহার এবং জমিতে কলাগাছ পুঁতে পেঁচা বসার ব্যবস্থা করা হলে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়। এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা সক্রিয় আছেন বলেও দাবি করেন তিনি।

তবে কৃষকদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে চলতি মৌসুমে ফলনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে। এতে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতিই নয়, স্থানীয় কৃষি অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার শঙ্কা তৈরি হবে।