আলজাজিরা অনুসন্ধান

২০ মাসে পাঁচ মুসলিম দেশে ৩৫ হাজার হামলা ইসরাইলের

এসব হামলা করা হয়েছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরানে। আক্রমণের সময় বিমান ও ড্রোন হামলা, গোলাবর্ষণ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, দূরবর্তী বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে যাতে হতাহতের ঘটনা ও বিপুল পরিমাণ সম্পদ ধ্বংস হয়।

নয়া দিগন্ত ডেস্ক
Printed Edition
‘অপারেশন সিঁদুর’ ক্ষুণ্ন করেছে ভারতের আধিপত্যকে

মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান যুদ্ধক্ষেত্রের মানচিত্র উঠে এসেছে আলজাজিরার এই অনুসন্ধান প্রতিবেদনে। সশস্ত্র সঙ্ঘাত অবস্থান ও ইভেন্ট ডেটা প্রকল্প (অঈখঊউ) থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গত ১৩ জুন পর্যন্ত ইসরাইল ইরানে আক্রমণ করার ঠিক আগে, ইসরাইল পাঁচটি মুসলিম দেশে প্রায় ৩৫ হাজার রেকর্ডকৃত আক্রমণ চালিয়েছে। এসব হামলা করা হয়েছে, অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড, লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন এবং ইরানে। আক্রমণের সময় বিমান ও ড্রোন হামলা, গোলাবর্ষণ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, দূরবর্তী বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়েছে যাতে হতাহতের ঘটনা ও বিপুল পরিমাণ সম্পদ ধ্বংস হয়। বেশির ভাগ হামলা হয়েছে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে , যেখানে কমপক্ষে ১৮ হাজার ২৩৫টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এরপর হামলার সংখ্যা ছিল লেবানন (১৫ হাজার ৫২০), সিরিয়া (৬১৬), ইরান (৫৮) এবং ইয়েমেন (৩৯)।

ইসরাইলের দীর্ঘপাল্লার বিমানযুদ্ধ : যদিও ইসরাইলের বেশির ভাগ আক্রমণ নিকটবর্তী গাজা, অধিকৃত পশ্চিম তীর এবং লেবানন লক্ষ্য করে হয়েছে, কিন্তু ইসরাইলের সামরিক অভিযানগুলোও তার তাৎক্ষণিক সীমানা ছাড়িয়ে অনেক দূরে আঘাত হেনেছে। ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো তাদের পরিধি শত শত এমনকি হাজার হাজার কিলোমিটার পর্যন্ত প্রসারিত করেছে, সিরিয়ার গভীরে প্রায় ৫৫০ কিলোমিটার (প্রায় ৩৪০ মাইল) দূরে, পাশাপাশি ইরানে প্রায় এক হাজার ৫০০ কিলোমিটার (৯০০ মাইল) দূরে এবং ইয়েমেনে প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার (এক হাজার ২০০ মাইল) দূরে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করেছে। এই দীর্ঘপাল্লার হামলাগুলো সঙ্ঘাতের ভৌগোলিক পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে প্রসারিত করেছে, যা আরো আঞ্চলিকভাবে বিস্তৃত সামরিক সম্পৃক্ততার দিকে একটি পরিবর্তন চিহ্নিত করেছে।

এই অভিযানগুলো সম্ভব হয়েছে ইসরাইলের উন্নত মার্কিন সরবরাহকৃত বিমানের বহর, যার মধ্যে রয়েছে এফ-ফিফটিন এবং এফ-সিক্সটিন যুদ্ধবিমান এবং ইসরাইলের অস্ত্রাগারের সবচেয়ে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান - স্টিলথ-সক্ষম এফ-৩৫। দেশটি নজরদারি এবং লক্ষ্যবস্তুতে হামলার জন্য ড্রোনের ওপরও ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।

গাজায় হামলা : ৬২৮ দিনেরও বেশি সময় ধরে অবিরাম বোমাবর্ষণ, অবরোধ এবং স্থল অভিযানের পর, গাজায় ইসরাইলের ধ্বংসাত্মক আক্রমণ, যাকে অনেক বিশেষজ্ঞ, মানবাধিকার সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা ব্যাপকভাবে গণহত্যা হিসাবে বর্ণনা করেছেন, এখনো তা অব্যাহত রয়েছে। গাজায় ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হতাহতের পরিসংখ্যান অনুসারে, কমপক্ষে ৫৬ হাজার ৭৭ জন নিহত এবং এক লাখ ৩১ হাজার ৮৪৮ জন আহত হয়েছে যাদের ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আরো হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে হামলা : অধিকৃত পশ্চিম তীর জুড়ে অঞ্চল দখল ও নিয়ন্ত্রণের জন্য ইসরাইল গাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধে ব্যবহৃত অনেক কৌশল প্রয়োগ করছে। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার মাত্র একদিন পর, গত ২১ জানুয়ারি, ইসরাইলি বাহিনী উত্তর অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেশ কয়েকটি শহরে একটি বৃহৎ পরিসরে সামরিক অভিযান শুরু করে। জাতিসঙ্ঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা এটিকে ‘২০০০ সালের দ্বিতীয় ইন্তিফাদার পর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে সবচেয়ে দীর্ঘ এবং সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক অভিযান’ হিসাবে বর্ণনা করেছে।

ব্রিটিশ গবেষণাগোষ্ঠী ফরেনসিক আর্কিটেকচারের বিশ্লেষণ অনুসারে, ইসরাইল জেনিন, নূর শামস এবং তুলকারেমের মতো এলাকায় স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠার জন্য ভবন ভাঙা, সাঁজোয়া বুলডোজার এবং বিমান হামলা ব্যবহার করেছে। স্যাটেলাইট ছবিতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ দেখা যাচ্ছে, পুরো জনপদ মাটির সাথে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে এবং সেনা চলাচল এবং নজরদারি সহজতর করার জন্য রাস্তাগুলো পুনর্গঠিত করা হয়েছে।

জাতিসঙ্ঘের অনুমান যে এই অভিযানগুলো কমপক্ষে ৪০ হাজার ফিলিস্তিনিকে বাস্তুচ্যুত করেছে। গত ২০ মাসে, ইসরাইলি বাহিনী এবং বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা অধিকৃত পশ্চিম তীর জুড়ে প্রায় এক হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে, যার মধ্যে ২০০ জনেরও বেশি শিশু রয়েছে।

ইসরাইল-লেবানন সীমান্ত আক্রমণ : গত বছর ২৭ নভেম্বর, ইসরাইল এবং হিজবুল্লাহর মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, যার ফলে প্রায় ১৪ মাস ধরে চলা আন্তঃসীমান্ত যুদ্ধের অবসান ঘটে, যেখানে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়। গাজা এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের মতো, ইসরাইলি আক্রমণের ফলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটে, যার ফলে দক্ষিণ লেবাননের অসংখ্য গ্রাম এবং বৈরুতের সমগ্র পাড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে গত বছর ১৮ অক্টোবর, ইসরাইল, হিজবুল্লাহ এবং অন্যান্য লেবাননী গোষ্ঠী ১৩ হাজার ৬০০ টিরও বেশি আন্তঃসীমান্ত আক্রমণ বিনিময় করে। এর মধ্যে, প্রায় ৮৩ শতাংশ (১১ হাজার ২৩৮টি ঘটনা) ঘটিয়েছে ইসরাইল।

সিরিয়ার ওপর আক্রমণ : আল-আসাদ পরিবারের ৫৩ বছরেরও বেশি সময় ধরে অত্যাশ্চর্য পতনের মাত্র দুই দিন পর, গত বছর ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ইসরাইল বিমান হামলা চালিয়ে সিরিয়ার সামরিক অবকাঠামোর বেশির ভাগ অংশ ধ্বংস করে দিয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রধান বিমানবন্দর, বিমান প্রতিরক্ষা সুবিধা, যুদ্ধবিমান এবং অন্যান্য কৌশলগত অবকাঠামো।

অঈখঊউ অনুসারে, গত ছয় মাসে, ইসরাইলি বাহিনী সিরিয়া জুড়ে ২০০ টিরও বেশি বিমান, ড্রোন বা কামান হামলা চালিয়েছে, গড়ে প্রতি তিন থেকে চার দিনে একটি আক্রমণ চালায় দেশটি।

ইয়েমেনে আক্রমণ : ইসরাইল ইয়েমেনে হুথি-নিয়ন্ত্রিত অবকাঠামোকেও লক্ষ্যবস্তু করেছে, যার মধ্যে রয়েছে সানা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হোদেইদাহ বন্দর এবং বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র। ২০২৪ সালের শেষের দিকে তীব্রতর হওয়া এবং ২০২৫ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকা এই হামলাগুলো গাজায় ফিলিস্তিনিদের সাথে সংহতি প্রকাশ করে ইসরাইলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলার পর হুথিদের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।

ইরানের ওপর আক্রমণ : ২০২৫ সালের ১৩ জুন, ইসরাইল ইরানের ভূখণ্ডের গভীরে বৃহৎ পরিসরে বিমান ও ড্রোন হামলা চালিয়ে একটি বড় ধরনের উত্তেজনা শুরু করে। এটি সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়, কারণ ইসরাইল ইরান জুড়ে একাধিক স্থানকে লক্ষ্য করে, যার মধ্যে রয়েছে সামরিক স্থাপনা, অস্ত্রের গুদাম এবং ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব এবং ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতার সাথে সম্পর্কিত অবকাঠামো।

ওপেন সোর্স গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে, যার মধ্যে রয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ্যে প্রচারিত ছবি এবং ভিডিও, মিডিয়া রিপোর্ট এবং ধ্বংস হওয়া স্থানগুলোর ভিজ্যুয়াল শনাক্তকরণ, আলজাজিরার ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট, সানাদ, ইরানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইসরাইলি এবং মার্কিন হামলার পাশাপাশি ইসরাইলে ইরানের বড় ধরনের হামলার একটি মানচিত্র তৈরি করেছে।