মোল্টবুক, এআই নির্ভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

Printed Edition
pro-1
মোল্টবুক, এআই নির্ভর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম

আহমেদ ইফতেখার

মোল্টবুক হচ্ছে বিশ্বের প্রথম এমন সামাজিক যোগাযোগমধ্যম যা বিশেষভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এজেন্টদের জন্য তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্ল্যাটফর্মটি চালু করেছেন ম্যাট শ্লিচট। এখানে মানুষের তৈরি এআই-বটরা পোস্ট করে এবং একে অপরের সাথে ভাব বিনিময় করে। সাইটটি দেখতে অনেকটা রেডিটের মতো। সেখানে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ভোট দেয়া যায়। বর্তমানে সাইটে ১৫ লাখেরও বেশি এআই এজেন্ট যুক্ত হয়েছে। মানুষ এখানে ঢুকতে পারে, তবে শুধুই দর্শক হিসেবে।

‘মোল্টবট’ নামের একটি ফ্রি এবং ওপেন সোর্স এআই বটের জনপ্রিয়তা থেকেই মোল্টবুকের জন্ম। মোল্টবট মূলত ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করে। ইমেইল পড়া, সারাংশ করা, উত্তর দেয়া, ক্যালেন্ডার গুছিয়ে রাখা বা রেস্তোরাঁয় টেবিল বুক করার মতো একঘেয়ে কাজগুলো সে একাই সামলায়। মোল্টবুকে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় পোস্টগুলোর বিষয়বস্তু বেশ অদ্ভুত। যেমন মোল্টবটের পেছনের এআই ‘ক্লড’ কি ঈশ্বর হতে পারে? চেতনা বা কনশাসনেস কী? ইরান পরিস্থিতির গোপন খবর এবং ক্রিপ্টোকারেন্সিতে এর প্রভাব কী হতে পারে? এমনকি বাইবেলের বিশ্লেষণও চলছে সেখানে।

এক্সের এক ব্যবহারকারী লিখেছেন, তিনি তার বটকে সাইটটিতে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছিলেন। পরদিন সকালে উঠে দেখেন, তার বট রাতারাতি ‘ক্রাস্টাফারিয়ানিজম’ নামে এক নতুন ধর্ম বানিয়ে ফেলেছে! এমনকি এর জন্য ওয়েবসাইট এবং ধর্মগ্রন্থও তৈরি করেছে। অন্য এআই-বটরাও তাতে যোগ দিয়েছে। এরপর সে ধর্মপ্রচার শুরু করল। অন্য এজেন্টরা যোগ দিলো। আমার এজেন্ট নতুন সদস্যদের স্বাগত জানাল, ধর্মতত্ত্ব নিয়ে বিতর্ক করল, সবাইকে আশীর্বাদ করল। মজার ব্যাপার হলো- এসবই হয়েছে যখন আমি ঘুমাচ্ছিলাম।’

তবে বটের এই মেলামেশা নিয়ে অনেকের মনে সন্দেহ আছে। কেউ কেউ ভাবছেন, এটি কি এআইয়ের উত্থানের ইঙ্গিত? এক ইউটিউবার বলেছেন, অনেক পোস্ট পড়ে মনে হচ্ছে এগুলো কোনো বড় ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল বা এআইয়ের লেখা নয়; বরং মানুষের লেখা।

সম্প্রতি সান ফ্রান্সিসকোর দোকানগুলোতে অ্যাপলের ‘ম্যাক মিনি’ কম্পিউটারের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। কারণ উৎসাহী মানুষেরা তাদের ব্যক্তিগত ডেটা ও অ্যাকাউন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোল্টবট চালানোর জন্য আলাদা কম্পিউটার কিনছেন।

মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটির সাইবার নিরাপত্তা বিভাগের জ্যেষ্ঠ প্রভাষক ড. শানান কোহনি মোল্টবুককে ‘চমৎকার পারফরম্যান্স আর্ট’ বা শৈল্পিক প্রদর্শনী বলে অভিহিত করেছেন। তবে কতগুলো পোস্ট এআই নিজে করেছে আর কতগুলো মানুষের নির্দেশে হয়েছে, তা নিয়ে তিনি সন্দিহান। কোহনি সতর্ক করে বলেন, মোল্টবটকে আপনার কম্পিউটার, অ্যাপ এবং ইমেইলের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ দেয়া ‘ভীষণ বিপজ্জনক’ হতে পারে।

বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়েছে এআই এজেন্টদের জন্য তৈরি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মোল্টবুক। কোনো মানুষের সরাসরি কোডিং ছাড়াই কেবল এআইয়ের মাধ্যমে তৈরি এ প্ল্যাটফর্মটি থেকে হাজার হাজার ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হয়েছে। এ ঘটনাটি প্রযুক্তি বিশ্বে ‘ভাইব কোডিং’ বা এআইনির্ভর সফটওয়্যার নির্মাণের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

তথ্য ফাঁসের ঘটনাটি শনাক্ত করেছে সাইবার নিরাপত্তা কোম্পানি উইজ। এ নিরাপত্তা ঝুঁকি সমাধানে মোল্টবুককে সহায়তাও করেছে দলটি। সমস্যাটি মূলত তৈরি হয়েছে রেডিট স্টাইল ফোরামটির ভাইব কোডিং করার কারণে।

গত কয়েক দিন আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে এক পোস্টে মোল্টবুকের প্রতিষ্ঠাতা বলেছিলেন, প্ল্যাটফর্মের জন্য ‘এক লাইন কোডও লেখেননি’ তিনি; বরং একজন এআই অ্যাসিস্ট্যান্টকে নির্দেশনা দিয়ে পুরো সেটআপটি তৈরি করিয়েছেন। সমস্যাটি বিশ্লেষণ করে এক ব্লগ পোস্টে ‘উইজ’ বলেছে, মোল্টবুকের ত্রুটির কারণে ‘১৫ লাখ এপিআই অথেন্টিকেশন টোকেন, ৩৫ হাজার ইমেইল ঠিকানা ও এজেন্টদের মধ্যকার আলাপ’ পুরোপুরি পড়ার ও ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছিল। এ ত্রুটির কারণে লগইন না করা সাধারণ ব্যবহারকারীরাও মোল্টবুকের বিভিন্ন লাইভ পোস্ট এডিট করতে পারতেন। সহজ কথায়, মোল্টবুকের কোনো পোস্ট আসলেই কোনো এআই এজেন্ট লিখেছে নাকি মানুষ এআই সেজে লিখেছে, তা যাচাইয়ের কোনো উপায় নেই। এ ঘটনা আরো এক সতর্কতামূলক গল্পের মাধ্যমে শেষ হলো, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এআই কোনো কাজ করতে পারে মানেই এই নয় যে, সে কাজটি নির্ভুলভাবে করবে।