চাহিদার ৫০-৬০ শতাংশ জ্বালানি তেল পাচ্ছে লাইটার জাহাজগুলো

চট্টগ্রাম বন্দরে মাদার ভেসেলের আগমন কমেছে : তাতেও যথাসময়ে লাইটারিং নিশ্চিত করা যাচ্ছে না

Printed Edition

নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো

ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলার আগের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারিও চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে পণ্যবোঝাই মাদার ভেসেল (বৃহৎ বাণিজ্যিক জাহাজ) ছিল ৯৫টি। কিন্তু জ্বালানি সঙ্কট ও এলসি সঙ্কটে আমদানি কমে যাওয়ায় মাদার ভেসেলের আগমনও ধারাবাহিকভাবে কমেছে। গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে ৭৪টি মাদার ভেসেল নোঙররত ছিল। কিন্তু মাদার ভেসেল কমলেও সেসব জাহাজের পণ্য খালাসের জন্য পর্যাপ্ত লাইটারেজ জাহাজের জোগান দেয়া যাচ্ছে না চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল না পাওয়াতে। সরকারের উচ্চপর্যায়ে ধরনা দিয়েও লাইটার জাহাজের জন্য পর্যাপ্ত ডিজেল মিলছে না। ফলে একদিকে মাদার ভেসেলগুলোর অপেক্ষমাণ সময় যেমনি বাড়ছে, তেমনি অসংখ্য লাইটার জাহাজকে তেলের অভাবে অলস বসে থাকতে হচ্ছে। এতে দেশের সাপ্লাই চেইনে যেমনি বিঘœ ঘটছে, পাশাপাশি জাহাজগুলোর অতিরিক্ত সময় অপেক্ষার ডেমারেজের ভোজ্যপণ্যের বাড়তি মূল্য আকারে ভোক্তাদের ওপর চাপছে।

বন্দর সংশ্লিষ্টদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, বহির্নোঙরে অবস্থান করা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসের জন্য ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল থেকে নিয়ম অনুযায়ী লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে বরাদ্দ পাওয়ার পরও অনেক জাহাজ তেলের অভাবে নির্ধারিত সময়ে যাত্রা করতে পারছে না। এতে বহির্নোঙরে জাহাজ থেকে পণ্য খালাস ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দেশের সাপ্লাই চেইনে মারাত্মক সঙ্কট সৃষ্টি হচ্ছে।

ডব্লিউটিসিসি সূত্র জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে আমদানিকৃত পণ্যের বিশেষ করে বাল্ক জাহাজে আমদানিকৃত খোলা পণ্যের ৮০ শতাংশ নদীপথে পরিবহন করা হয় এবং ১২শর মতো লাইটার জাহাজ এসব পণ্য পরিবহনে নিয়োজিত রয়েছে। লাইটার জাহাজগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য আমদানিকৃত পণ্যবোঝাই মাদার ভেসেলের বিপরীতে ডব্লিউটিসিসি থেকে বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রতিদিন গড়ে ৮০টি লাইটার জাহাজ বুকিং বা বরাদ্দ দেয়া হয়। একটি জাহাজ চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা গন্তব্যে যাওয়া ও আসা বাবদ তিন হাজার লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়। সেই হিসাবে ৮০টি জাহাজে প্রতিদিন দুই লাখ ৪০ হাজার লিটার ডিজেলের প্রয়োজন হয়। কিন্তু ডিজেল পাওয়া যাচ্ছে ৫০-৬০ শতাংশের কাছাকাছি।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, চাহিদা অনুযায়ী ডিজেল না পাওয়ায় জাহাজ বরাদ্দ দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। তা ছাড়া পর্যাপ্ত জ্বালানি তেলের অভাবে মাদার ভেসেল থেকে পণ্য লোড নিয়েও অলস সময় কাটাতে হচ্ছে। ফলে জাহাজগুলো সময়মতো গন্তব্যে গিয়ে পণ্য খালাস করতে না পারায় লাইটার জাহাজের সঙ্কটও বাড়ছে। গতকাল সোমবার চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ৭৪টি জাহাজ ছিল। এর মধ্যে সাধারণ পণ্যবাহী ২৪টি, খাদ্যশস্যবোঝাই ১৪টি, সিমেন্ট ক্লিংকার বোঝাই ২২টি, চিনিবোঝাই চারটি জাহাজ, লবণ বোঝাই দু’টি এবং তেলবাহী ছয়টি ট্যাংকার ছিল।

এসব জাহাজে বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়লা যেমনি রয়েছে, বিভিন্ন শিল্প কারখানার কাঁচামাল, খাদ্যদ্রব্য ও সারসহ অতিপ্রয়োজনীয় পণ্য রয়েছে। মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রিতার প্রভাব কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে যেমনি পড়বে, তেমনি ব্যাহত হবে শিল্পোৎপাদনও। লাইটার জাহাজের জ্বালানি তেল সঙ্কটে আমদানি পণ্য নিয়ে আমদানিকারক ও পরিবহন খাতে নিয়োজিত ব্যবসায়ীরা পড়েছেন চরম বিপাকে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, নদীপথে প্রতি টন পণ্য পরিবহনে গড়ে সোয়া তিন লিটার জ্বালানি তেল লাগে। অপরদিকে সড়কপথে তা পরিবহন করতে গড়ে ১২ লিটার তেল লাগে। একটি লাইটারেজ জাহাজে যে পরিমাণ পণ্য পরিবহন করতে পারে একই পরিমাণ পণ্য সড়কপথে পরিবহনে অন্তত দুই শ’ ট্রাক লাগবে। কাজেই নদীপথকে গতিশীল রাখা না গেলে দেশব্যাপী পণ্য সরবরাহ নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়বে।

বহির্নোঙরে ধারাবাহিকভাবে কমছে মাদার ভেসেলের আগমন

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে ধারাবাহিকভাবে মাদার ভেসেলের আগমন কমছে এমন তথ্য মিলেছে। চট্টগ্রাম বন্দর সূত্র জানিয়েছে, একদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি, অন্যদিকে এলসি খুলতে ব্যাংকগুলোর অসযোগিতার দৃশ্যমান প্রভাব দেখা যাচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দরে মাদার ভেসেলের আগমনে। ইরানে মার্কিন-ইসরাইলি হামলার আগের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি বহির্নোঙরে কর্মক্ষম মাদার ভেসেল ছিল ৯৫টি। এর পর হতেই ধারাবাহিকভাবেই কমছে মাদার ভেসেলের আগমন। গত ৯ মার্চ ছিল ৮৯টি, ২৩ মার্চ ছিল ৮২টি, ১ এপ্রিল ছিল ৮১টি এবং সর্বশেষ গতকাল ১৩ এপ্রিল ছিল ৭৪টি। অবশ্য এর আগে গত ৩০ মার্চ বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের (বিডব্লিউটিসিসি) পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রীর কাছে লেখা এক চিঠিতে জ্বালানি সঙ্কটে লাইটারিং ব্যাহত হলে মাদার ভেসেলের আগমন কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয়েছিল। ওই চিটিতে উল্লেখ করা হয়েছিল-বাংলাদেশের অর্থনীতির হৃৎপিণ্ড খ্যাত চট্টগ্রাম বন্দরে আগত মাদার ভেসেলগুলো হতে পণ্য খালাসের সমস্যার কারণে মাদার ভেসেলের অবস্থানকাল দীর্ঘায়িত হলে বা বৃদ্ধি পেলে চট্টগ্রাম বন্দরে মাদার ভেসেল আসতে অনীহা প্রকাশ করবে। মাদার ভেসেলের ডেমারেজ খাতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ থেকে চলে যাবে। যার ফলশ্রুতিতে দেশের অর্থনীতি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং দেশের ভোক্তা পর্যায়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি পাবে। এরূপ সঙ্কটের হাত থেকে পরিত্রাণের জন্য লাইটার জাহাজগুলোর চলাচল নিয়মিত রাখতে জ্বালানি তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ রাখা অত্যাবশ্যক।

ডব্লিউটিসির মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ গতকাল সোমবার নয়া দিগন্তকে বলেন, ডিজেল সঙ্কটে সবচেয়ে বেশি সাফার করছে লাইটার জাহাজ। চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ায় আমরা লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দিতে পারছি না। আবার লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দিলেও জ্বালানি তেলের সঙ্কটে মুভ করতে পারছে না। চাহিদার ৫০-৬০ শতাংশের বেশি তেল মিলছে না দাবি করে তিনি বলেন এতে ১-২ দিন গ্যাপ করে জাহাজ বরাদ্দ দিতে হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই মাদার ভেসেলের অবস্থানকাল বাড়বে বলে তিনি মন্তব্য করেন।