জুলাই-বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্য

Printed Edition
year-3
জুলাই-বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্য

শাহানারা স্বপ্না

ইতিহাসের প্রতিটি বিপ্লব কেবল রাজনৈতিক রূপান্তর নয়; তা সংস্কৃতি, সাহিত্য ও চিন্তাধারার ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনারও সূচনা করে। বিপ্লব-পরবর্তী সমাজে মানুষের চেতনা, আদর্শ ও মূল্যবোধ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে সাহিত্য। জাতীয় ঐতিহ্য ও বিশ্বাস, ভাষা, লোকসংস্কৃতি, ইত্যাদি সাহিত্যে স্বাধীনভাবে পুনরাবিষ্কারই বিপ্লব-পরবর্তী সাহিত্যের প্রাণশক্তি। একটি সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সাথে সাথে সংস্কৃতি, শিল্প ও সাহিত্যের ক্ষেত্রেও নতুন জিজ্ঞাসা, নতুন নন্দন-চেতনার জন্ম হয়। এ প্রসঙ্গে ইরানের বিপ্লবী সাহিত্যিক ড. আলী শারিয়তি বলেন, ‘যখন একটি বিপ্লব ঘটে, তখন সাহিত্যিকদের কাজ হলো জনগণকে নতুন বাস্তবতার সাথে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সংযুক্ত করা। তিনি বিপ্লব-উত্তর সমাজে সাহিত্যকে ‘চিন্তার অস্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। জাতির স্বপ্নদ্রষ্টা মহাকবি ইকবাল রাজনীতির বিপ্লবকে কখনোই চূড়ান্ত লক্ষ্য মনে করেননি। তিনি বলেন, ‘সাহিত্যই সেই শক্তি যা মানুষকে আত্মপরিচয়ের চেতনা দেয়।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিপ্লব মানুষের বাহ্যিক কাঠামো বদলালেও অন্তর্দৃষ্টি জাগ্রত না করলে সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন আসে না। বিপ্লব-পরবর্তী সাহিত্য যদি জাতির আত্মাকে জাগ্রত না করে, তবে সেটি নিষ্ফল।’ শায়েরি সেই নয় যা কেবল কানে মধুর লাগে; শায়েরি সেই, যা আত্মাকে প্রজ্বলিত করে। আল্লøামা ইকবাল বিশ্বাস করতেন, প্রকৃত সাহিত্য জাতির চেতনা, সাহস ও আত্মমর্যাদাবোধ জাগিয়ে ইরানি বিপ্লবের রুহানি নেতা ইমাম খোমেনি বলেছেন, ‘শিল্প ও সাহিত্য যদি বিপ্লবের আদর্শ ধারণ না করে, তবে তা নিছক বিনোদন মাত্র। সত্যিকারের সাহিত্য হলো তা, যা বিপ্লবের প্রাণ ও চেতনা জাগিয়ে রাখে।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও বলেছেন, ‘সাহিত্যের কাজ সমাজকে সচেতন করা, অচেতনকে চেতন করা’ সাহিত্যের স্বরূপ ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে ড. কাজী মোতাহর হোসেন বলেন, ‘মানবচিত্তের বিভিন্ন অবস্থায় রসযুক্ত সম্যক প্রকাশ লইয়াই সাহিত্যের কারবার। সাহিত্য কখনো বা অগ্রদূত হইয়া সমাজকে কল্যাণের পথে আহ্বান করে, আবার কখনো বা গভীর অন্তর্দৃষ্টি দ্বারা সমাজের প্রতি স্তরের প্রকৃত অবস্থা উদঘাটন করিয়া দেখায়। এরূপে সাহিত্যের ভেতর দিয়ে এক দিকে যেমন দেশের আশা-আকাক্সক্ষা উদভাষিত হয়, অন্য দিকে তেমনি দেশের চিত্তের প্রকৃত ইতিহাস রচিত ও রক্ষিত হয়।’ ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব সাহিত্যকে স্বাধীনতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্বের চেতনা ধারণে উদ্বুদ্ধ করেছিল। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব শিল্পকলাকে বানিয়েছিল জনমুক্তির হাতিয়ার। বাংলাদেশের চব্বিশের জুলাই-বিপ্লবও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি নতুন শিল্প-সাহিত্যবোধের জন্ম দিয়েছে। নতুনতর জাতীয় জাগরণ সৃষ্টির আশায় পুরো জাতি আজ উদ্বেলিত। শিল্প-সাহিত্যের মূল উদ্দেশ্য কেবল নান্দনিকতা নয়; বরং মানুষের মুক্তি ও সত্যকে ধারণ করা। বিপ্লব-পরবর্তী সাহিত্য ও শিল্পকলা হওয়া প্রয়োজন নিপীড়িত মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিধ্বনি।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট :

ঐতিহাসিক কাল থেকে বাঙালি তার স্বাধীনতা, সার্বভৌত্ব ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের জন্য বিপ্লব-সংগ্রাম করে আসছে। কিন্তু কাক্সিক্ষত ফলাফল কখনো ভোগ করতে পারেনি। ১৮৫৭ সালের বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-৯৮) একটি নতুন চেতনা ও মূল্যবোধের পুনর্গঠনের দায়িত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেন। মুসলমানরা রাজনৈতিকভাবে যে একটি পৃথক জাতি এটি ভারতে সৈয়দ আহমদের চিন্তা-পথ ধরেই প্রতিষ্ঠা পায়। তার দেখানো পথে ভারতীয় মুসলমানরা সেক্যুলার জাতীয়তাবাদের নিগড় ভেঙে মুসলিম জাতীয়তাবাদের পতাকাতলে একত্রিত হন। তিনি যে ধারা তৈরি করেছিলেন তার পরম্পরায় মহাকবি ইকবাল, কবি হালী, নবাব স্যার সলিমুল্লøাহ, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ প্রমুখ এগিয়ে এসেছিলেন। রাজা রামমোহন রায় যেমন করে ব্রিটিশ-রাজের সহযোগিতায় সে সময়ের হিন্দু সমাজ-জাগরণের চেষ্টা করেছিলেন তেমনি সৈয়দ আহমদ খানও পরিস্থিতির বাস্তবতায় ব্রিটিশ-রাজের অনুকূলে মুসলিম জাগরণ সৃষ্টির চেষ্টা করেছিলেন। ঔপনিবেশিক অবকাঠামোর মধ্য থেকে তিনি গড়ে তুলেছিলেন মুসলমানদের আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। তার এই রাজনৈতিক চিন্তা ভারতের মুসলমানদের সুদূরপ্রসারী কল্যাণের পথ তৈরি করেছে। ‘বিশ শতকে উপনিবেশিক শাসক কর্তৃক মুসলমানরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে পর্যুদস্ত ছিল এবং তাদেরকে গ্রাস করেছিল সীমাহীন দারিদ্র্যতা। বাঙালি মুসলমানের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণে ১৯১১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর গঠিত হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’। ১৯১৮ সালে প্রকাশিত সমিতির মুখপত্র ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’ তুমুল সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। সম্পাদক ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লøাহ ও কবি মোজাম্মেল হক। এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন মাওলানা আকরম খাঁ, মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, খান বাহাদুর আহসানুল্লাহ, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লøাহ, মুনশী রেয়াজউদ্দিন, মৌলভি মুজিবুর রহমান খাঁ, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদসহ সমকালীন জ্ঞানী-গুণীজন। সাহিত্যিকদের সমাবেশের ফলে সুধীমহলে দেখা দেয় জাগরণ, উৎসাহ-উদ্দীপনা। এ পত্রিকার আবির্ভাবে বঙ্গীয় মুসলমান সমাজে একদল প্রতিভাবান সুলেখকের অভ্যুদয়ের সূচনা লক্ষিত হইতেছে।’ বাংলা ও আসামের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোয় পত্রিকা বিতরণে সহজেই এটি তরুণ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যায়। সম্মেলনের দ্বিতীয় অধিবেশনে সৈয়দ এমদাদ আলী বলেন, ‘মুসলমানের বঙ্গ বিজয়ের আগে বাংলা ভাষার অস্তিত্ব থাকলেও মুসলমান নৃপতিদের উদার পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কাক্সিক্ষত পরিপুষ্টি অর্জন করেছে। এ সব মুসলমান মহৎপ্রাণ শাসকদের উদারতায় এমনকি কৃত্তিবাসের রামায়ন, কাশিরাম দাশের মহাভারতও সাহিত্য গগনে উদিত হতে পেরেছিল। কবি বিদ্যাপতি তাদেরই পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে ধন্য হয়েছিলেন। পরাগল খাঁ, ছুটি খাঁ জাতিতে পাঠান ও মুসলমান হলেও পরাগল খাঁর পৃষ্ঠপোষকতায় কবীন্দ্র পরমেশ্বর মহাভারতের কিয়দাংশ অনুবাদ করেন আর ছুটি খাঁর নির্দেশে শ্রীকরনন্দী অশ্বমেধ পাঠের অনুবাদ করেন। কবি শাহ মোহাম্মদ সগীর, কবি আলাওল, দৌলত কাজী হতে মীর মশাররফ পর্যন্ত অসংখ্য মুসলমান কবি সাহিত্যিক বাংলা ভাষার সেবা করেছেন।’ জাতীয় জীবনে সাহিত্যসেবা সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে প্রয়োজন দেশ-জাতির ইতিহাস সম্পর্কে বিশদ অধ্যয়ন। সপ্তদশ শতকের কবি আলাওল বলেছেন, ‘পূর্ণ নহে প্রাণ যার ইতিহাস জ্ঞানে, সমস্ত সর্বনাশ পিছু থেকে টানে।’

বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যাদর্শ :

আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ এক অভিভাষণে উল্লেখ করেন, ‘আধুনিক সাহিত্য সাধনা হালআমলে শুরু হলেও আমাদের গৌরবময় প্রাচীন সাহিত্য রয়েছে। কলকাতা ও মফস্বল হতে প্রায় ৪০টি ছাপাখানা থেকে হাজার হাজার বাংলা পুস্তক মুদ্রিত হয়েছে। আধুনিক শিক্ষিতরা বাঙালি মুসলমানের সৃষ্ট সাহিত্য সম্ভারকে ‘বটতলার পুঁথি’ আখ্যা দিয়ে কেউ কেউ নাসিকা কুঞ্চন করছেন। অথচ হিন্দু ভ্রাতাগণ এই বটতলার সাহিত্যকে আশ্রয় করে যশস্বী হয়েছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘প্রাচীন সাহিত্যে আমাদের ধর্মমূলক গ্রন্থই বেশি। ওই সব গ্রন্থের ভাবরাশি যদি নতুন ভাষায়, নতুন ছন্দে আমাদের মর্মে মর্মে প্রবাহিত করা যায়, তাহা হইলে আমাদের প্রভূত কল্যাণ সাধিত হইতে পারে। আমাদের ধর্ম, আমাদের ইতিহাস, আমাদের সাহিত্য, আমাদের পূর্বপুরুষদের অতুলনীয় জ্ঞান-বিজ্ঞান বঙ্গ সাহিত্যের ভেতর দিয়া সমাজ দেহে প্রবেশ করাইতে পারিলে তাহাতে নতুন উদ্দীপনা ও উদ্বোধনের সঞ্চার হইবে এবং বঙ্গভাষা ও সাহিত্য আমাদের সম্পূর্ণ নিজের হইবে। বিজাতীয় ভাব এবং বিজাতীয় সাহিত্যে আমরা নিজেকে হারাইয়া ফেলিয়াছি। আমরা কি ছিলাম কি হইয়াছি, তাহা চিনাইয়া দেয়াই এখন আমাদের সাহিত্য সাধনার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।’

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রারম্ভকাল থেকেই সঞ্চিত রয়েছে মুসলমানদের অপরিসীম অবদান। বিপুল রক্তস্রোত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশ দুই-দুইবার স্বাধীন হয়েও সেই অপরিমেয় দানের কিছুই পরবর্তীকালে চর্চা করতে পারেনি। কারণ ‘মূলত; নামে স্বাধীন হলেও আসলে ছিল পরাধীন।’ স্বাধীনতার প্রথম দিন থেকেই আগ্রাসন ‘তত্ত্ব’ জাঁকিয়ে বসেছিল জাতির ওপর। হারাতে থাকে সার্বিক অর্থে সব কিছু নিয়ন্ত্রণের অধিকার। একে একে নিশ্চিহ্ন করা হয় বাংলাদেশের মুসলমানদের তাহজিব-তামুদ্দুন, ধ্বংস করা হয় ইতিহাস ও ঐতিহ্য। সমস্ত অর্জন মুছে ফেলার ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে রাষ্ট্রযন্ত্র ও তার তাঁবেদার গোষ্ঠী। নানারকম কূট-কৌশলে ব্রাহ্মণ্যবাদী-আগ্রাসন জাতির ওপর চাপিয়ে দেয় অর্থনৈতিক শোষণ, আরেকদিকে মুছে দিচ্ছিল সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যবোধ। শিক্ষাব্যবস্থা ও দেশের প্রতিটি সংস্থা দুর্বল ও নতজানু করে ফেলে। সীমাহীন দুর্নীতির চক্র-জাল ছড়িয়ে পাচার করে দিচ্ছিল সমস্ত সম্পদ। একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বিকাশ লাভের সবকটি দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়। কালচারাল ফ্যাসিবাদী পরাধীনতার মাধ্যমে দাসত্বের অনুগামী হতে জাতিকে বাধ্যতার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী নামধারী লুকানো শত্রু দেশের বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর ধর্মকে অস্বীকার করার সংস্কৃতি চালু করে। মানুষের ধর্ম, আশা, আকাক্সক্ষা ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নে সব শক্তি নিয়োজিত করে। দেশ ও জাতির টুঁটি চেপে ধরে মরণোন্মুখ অবস্থায় নিয়ে আসে। সেই মৃতপ্রায় ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে চব্বিশ-জুলাই প্রজন্ম মুক্তি দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষকে। যেকোনো মূল্যে রোধ করতে হবে ফ্যাসিবাদের উত্থান। সে জন্য চাই নিজস্ব সাহিত্যে, ইতিহাস ও সংস্কৃতির নতুন বয়ান, নতুন স্বাতন্ত্র্য সাহিত্য-সম্ভার।

একটি জাতির জাগরণে তার সাহিত্যাদর্শ কেমন হওয়া দরকার, সে সম্পর্কে মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী বলেছেন, ‘সাহিত্যের প্রভাব, জাতির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার উপর যতটা অধিকার বিস্তার করিতে পারে, পাশবিক শক্তি দ্বারা তাহা সম্ভব হয় না। সাহিত্য মানুষের গতিপথ নির্ণয় করিয়া দেয়...রাষ্ট্র ও সামাজিক জীবনে সাহিত্যের প্রভাব কতদূর...জগতের ইতিহাস তাহার জ্বলন্ত সাক্ষী। সাহিত্য সর্বপ্রকার বিপ্লবের মূল সূত্র। যখন কোনো দেশের রাষ্ট্র-বিপ্লব উপস্থিত হইয়াছে তখন উদ্দীপনাপূর্ণ জাতীয় কবিতা- অনল বর্ষিণী বক্ততা ও প্রবন্ধই তাহার ইন্ধন জোগাইয়াছে। সুতরাং রাষ্ট্রীয় জীবনে সাহিত্যের প্রভাব যে কি অসাধারণ, তাহা বুঝাইবার প্রয়োজন নাই।’

অধ্যাপক আবুল ফজল সাহিত্যের আদর্শ-সীমানা বোঝাতে বলেছেন, ‘মানুষের জীবন ক্রমাগত বিশ্বের সাথে সংগ্রামের জীবন- এ সংগ্রামের ভেতর দিয়েই সে বিশ্বের সাথে সমাঝোতায় এসেছে। এ সমাঝোতা বা সমন্বয় সন্ধান নানাভাবে নানারূপে সাহিত্যে শিল্পে প্রতিফলিত। এ সমন্বয় সন্ধানের যেমন ইতি নেই, তেমনি সাহিত্য শিল্পেরও নেই ইতি।’

বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য কেমন হওয়া দরকার :

বাংলাদেশের নবীন প্রজন্ম বাংলাদেশকে উদ্ধার করার মহৎ আকাক্সক্ষা নিয়ে লড়াই করেছে। বুকের তাজা খুন ঝরিয়ে বিপ্লবের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন, মানবিক ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখছে। আমাদের দেশের ইতিহাস, বিকৃতির ইতিহাস। এ সময় জাতির পক্ষ থেকে পালন করতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা। ১৯৪৭ সালে ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন হতে সমর্থ হলেও আমরা ভাষা, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় মূলধারায় ফিরে আসতে পারিনি।’ নতুনত্ব, স্বকীয়তা, জাতিগত স্বাতন্ত্র্য ও নতুন শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি মন-মানসিকতা গড়ে তোলার জন্যই রদ-বদল অপরিহার্য- তা কবুল না করে উপায় নেই। এ হলো একটি জাতির আত্মিক দাবি।’ রাজনৈতিক দিক থেকে দুই-দুবার আমাদের পাশ বদল ঘটলেও একবারো ভাষা বদল ঘটেনি! আমাদের ভাষা-সাহিত্যে নব-জাগরণে আসেনি। রেনেসাঁ আসেনি। কারণ আমরা আমাদের অতীতকে ঠিকঠাক জানতেই পারিনি।...পৃথিবীর সমস্ত দেশেই শাসক শ্রেণী তার নিজের ধর্মীয় লিপি-ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি দিয়ে জাতীয় স্বাতন্ত্র্য-সত্তা...একটি জাতির আত্মপরিচয় গড়ে তোলে। ...কিউবা, চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন...বিপ্লবের পর ওইসব দেশের নেতারাও , সরকার কায়েমের পর সমাজতান্ত্রিক নীতি ও আদর্শ মাফিক জাতীয় ভাষা-শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি গড়ে তোলার জন্য বিদ্যমান ভাষার সংস্কার করে...রদ-বদলের সাহায্যে নতুন ভাষা, পরিভাষা, শিক্ষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি গড়ে তুলেছেন, যার অবধারিত লক্ষ্য ছিল বিপ্লব-পূর্ব ভাষা-পরিবেশ, জনগণের মন-মানসিকতা ও চিন্তাভাবনার নব রূপায়ণ, আধুনিকায়ন।’

অধ্যাপক ড. কাজী মোতাহার হোসেন বলেন, ‘সাহিত্যিকের একটি কর্তব্য হচ্ছে ধর্মপ্রাণতা আর ধর্মান্ধতার মধ্যে পার্থক্য কি তা স্পষ্ট করে লোকের সামনে তুলে ধরা।...চিন্তানায়ক হিসেবে সাহিত্যিকরাই দেশবাসীর স্বাভাবিক নেতা। অতএব তাদের দায়িত্বও সমধিক। তারা দেশের চিন্তাধারা আত্মস্থ করে দেশবাসীর কাছে ওইসব চিন্তার সহিত্যিক রূপ-রস প্রকটিত করেন। পারিপার্শ্বিক অস্ফুট চিন্তাকে পরিস্ফুট করে, আদর্শকে আর একটু উন্নত বা মার্জিত করে ক্রমাগত দেশের রুচি-চিন্তা ও আশা-আকাক্সক্ষাকে অগ্রসর করে দেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘একটি জাতি কতটা সভ্য তা নির্ণয় করার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট মাপকাঠি হচ্ছে তার শিক্ষাব্যবস্থা, পাঠ্যপুস্তক ও সাধারণ সাহিত্য। এসবের ভেতর দিয়ে জাতির আশা-আকক্সক্ষা পরিস্ফুট হয়, নৈতিক ও সামাজিক মানের পরিমাপ পাওয়া যায় এবং কর্মক্ষমতা, চরিত্রগত বৈশিষ্ট্য, এক কথায় জাতীয় আদর্শের ভিত্তি-ভূমির সাথে পরিচয় ঘটে।’

সাহিত্য হচ্ছে জীবনের স্থিরচিত্র ও আদর্শের ছবি। একটি জাতির ভাষা ও পরিভাষার মাধ্যমেই সংস্কৃতির স্বরূপ ফুটে ওঠে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মনের কথা যে সাহিত্যে প্রতিফলিত হয়, সেটিই হবে বাংলাদেশের আগামীর সাহিত্যের মানদণ্ড।

ড. আহমদ শরীফ জাতীয় জীবনে সাহিত্যের প্রয়োজন প্রসঙ্গে বলেন, ‘সামাজিক, সাংস্কৃতিক, দার্শনিক, ধার্মিক, কিংবা রাষ্ট্রিক আন্দোলন, বিপ্লব অথবা বিদ্রোহ জাগানোর জন্য যেমন প্রেরণা সঞ্চারি সাহিত্য ও শিল্পের প্রয়োজন তেমনি সে সব সংগ্রাম চালু রাখার জন্যও সাহিত্য-শিল্প আবশ্যিক। আবার সাহিত্য-শিল্প নতুন ভাব-চিন্তা কর্মের ফসলও। অতএব, সাহিত্য-শিল্পাদি কলা একাধারে বীজ ও ফল দুই-ই। জীবনে জাগরণ আনার জন্য এবং জাগ্রত জীবনের চাহিদা পূরণের জন্য সাহিত্য-শিল্পই মুখ্য অবলম্বন। গণজাগরণ যেমন সাহিত্য শিল্পের মাধ্যমেই সহজে সম্ভব, জাগ্রত জনতারও তেমনি সাহিত্যাদি কলাই শক্তির উৎস এবং কর্মোদ্দমের আকর।’

...শিল্পীর দায়িত্বও কর্তব্য হচ্ছে সমাজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের উন্নয়ন ও প্রসারণ। পুরনো সমাজকে ভেঙে- অতিক্রম করে নতুন সমাজ গড়ার স্বপ্ন জাগানো, পরিকল্পনা প্রদান, চালু সংস্কৃতির মনোন্নয়ন ও নতুন সংস্কৃতি সৃজন; যে ঐতিহ্য প্রগতির অন্তরায়, অনুপ্রেরণা দানে অক্ষম, তা পরিহার করে নতুন ঐতিহ্যের সন্ধান, সৃজন প্রভৃতিই হবে শিল্পী, সাহিত্যিক ও দার্শনিকের আদর্শ, লক্ষ্য ও ব্রত।’

বাঙালি মুসলমানের আত্মজাগরণে কাজ করে গেছেন ‘বঙ্গীয় মুসলিম’ পূর্বপুরুষরা। তাদের রচিত সমৃদ্ধ অতীত-সম্ভারের সাথে বর্তমানের মেলবন্ধন ঘটিয়ে মুসলিম পুনর্জাগরণের ধারায় এক নতুন সাহিত্যিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করতে হবে। বিপ্লবের পর জনগণ যেন হতাশায় না ডুবে, সে জন্য সাহিত্য হবে অনুপ্রেরণার উৎস। সাহিত্য কেবল রোমান্টিক আবেগ নয়, শিক্ষণীয় ও জাগরণমূলক। সাহিত্য সমাজে ঐক্য, মানবতা ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করবে। সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি গঠনে সহায়ক, জনগণের মধ্যে বিপ্লবের চেতনাকে টিকিয়ে রাখার শক্তি, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের দিকনির্দেশক এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার বাহকই হবে বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশের সাহিত্যের অগ্রযাত্রার পথ।