মেসি পর্বের অবসান, ইয়ামাল যুগের শুরু

Printed Edition
first-2
মাদ্রিদ বিমানবন্দরে পৌছার পর ফটো সেশনে বিশ্বকাপজয়ী ফুটবলাররা : ইন্টারনেট

রফিকুল হায়দার ফরহাদ - যুক্তরাষ্ট্র থেকে

বেজে গেল ১২০ মিনিটের খেলা শেষের বাঁশি। আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জিতল স্পেন। ১৬ বছর পর শিরোপা পুনরুদ্ধার করল তারা। অন্য দিকে দ্বিতীয়বারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের মাঠে বিশ্বকাপ জিততে ব্যর্থ আর্জেন্টিনা। খেলা শেষ হওয়ার পরপরই আর্জেন্টিনার লিয়ান্দ্রো পারেদেস স্পেনের গাভির গলা চেপে ধরেন। এরপর মাটিতে ফেলে দেন। পরে দুই দলের খেলোয়াড়দের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হলেও তা বেশি দূর গড়ায়নি। পরশু যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইর্য়ক নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার হতাশাজনক পারফরম্যান্স আর স্পেনের একচেটিয়া ম্যাচ খেলে আদায় করা জয়ে শেষ হলো এবারের ৪৮ দলের অংশগ্রহণে তিন দেশ মিলে আয়োজিত বিশ্বকাপ। এটিই লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ। যদিও ম্যাচ শেষে মিডিয়ার সাথে ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো কথাই বলেননি মেসি। এরপরও ৩৯ বছরের মেসি যে ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে খেলবেন না এটা বলাই যায়। ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের ফলে পরাজয়ে বিশ্বকাপ পর্ব শেষ হলো মেসির। সেই সাথে এই বিশ্বকাপ পেল ‘নতুন মেসি’, ‘নতুন ম্যারাডোনা’, ‘নতুন পেলে’ যে নামেই ডাকা হোক না কেন সেই লামিনে ইয়ামালকে। মেসি পর্ব শেষে যাত্রা শুরু ইয়ামাল যুগের।

ফুটবল ও বিশ্বকাপ ফুটবল দুই হাত ভরে সব কিছু দিয়েছে লিওনেল মেসিকে। সব ট্রফিই জেতা হয়েছে তার। বাকি ছিল বিশ্বকাপ। সেটাও পেয়েছিলেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। এবারের ২০২৬ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকো বিশ্বকাপেও আরো কিছু রেকর্ড যুক্ত করেছেন এই আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। তিনটি বিশ্বকাপের ফাইনালে অধিনায়ক হিসেবে খেলাও রেকর্ড করছেন ১৯ জুলাইয়ের ম্যাচে। তবে অধিনায়ক হিসেবে দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতার রেকর্ড আর করা হলো না। পারলেন না আর্জেন্টিনাকে চতুর্থ বিশ্বকাপ এনে দিতে।

তা কিভাবে পারবেন। মাঠে দেখা গেল না সেই চিরাচরিত মেসিকে। ১০৬ মিনিটে গোল খেয়ে পিছিয়ে পড়ার পরই শুধু প্রাণপণ চেষ্টা করেছিলেন দলকে ম্যাচে ফেরাতে। এই চেষ্টা যদি আরো আগে থেকে করতেন, তাহলে হয়তো এই দশা হতো না আর্জেন্টিনার। আসলে তিনবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের তা করতে দেননি লামিনে ইয়ামালরা। তাদের দাপটে মাঠে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না এনজো ফার্নান্দেজ, জুলিয়ান আলভারেজ, ম্যাক অ্যালিস্টারদের। স্প্যানিশদের সাথে কুলিয়ে উঠতে না পেরে ফাউল করে খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। যার পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে পুরো অতিরিক্ত সময়ে ১০ জন নিয়ে খেলে। ইনজুরি টাইমে (৯৩ মি.) এনজো ফার্নান্দেজ ফাউল করে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড পেয়ে (লাল কার্ড) পেয়ে দলকে আরো বিপদে ফেলে মাঠ ত্যাগ করতে বাধ্য হন।

এই ফাইনালে মেসি ও ইয়ামালের লড়াই দেখার অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। ১৯ বছর বয়সে, ১৯ নম্বর জার্সি গায়ে ১৯ জুলাইকে নিজের করে নিলেন এই স্প্যানিশ মুসলিম ফুটবলারটি। সারা মাঠেই তার ছুটে চলা। তাকে আটকাতেই হিমশিম খেয়েছেন আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা। ইয়ামাল নিজে গোল করতে পারেননি। তবে শিরোপা জয়ী গোলে তার প্রচ্ছন্ন অবদান। তার পাস থেকেই পেদ্রো পোরোর ক্রসের বলে নিকো উইলিয়ামসের হেডে ফেরান টরেসের শটে গোল। কিলিয়ান এমবাপ্পে ও পেলের মতো অভিষেকের বিশ্বকাপেই চ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বাদ পেলেন ইয়ামাল। বার্সেলোনার এই টিনএজ খেলোয়াড়টি এরই মধ্যে দেশকে দুই ট্রফি পাইয়ে দিয়েছেন। ২০২৪ ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ এবং ২০২৬ বিশ্বকাপ। ইউরোর ফাইনালেও গোলে অ্যাসিস্ট ছিল তার।

এখনো ২০ বছর পূর্ণ হয়নি। এরই মধ্যে যে প্রতিভার স্বাক্ষর তিনি রেখেছেন, যদি এরপর সঠিক পথেই চলতে থাকেন, বার্সেলোনার আরেক প্রতিভা আনসু ফাতির মতো হারিয়ে না যান তাহলে আগামীর ফুটবল বিশ্ব মাতাবেন এই ইয়ামালই। এবারের বিশ্বকাপে একটি মাত্র গোল করেছেন। সেই গোলটি গ্রুপ পর্বের ম্যাচে সৌদি আরবের বিপক্ষে। সরাসরি কোনো অ্যাসিস্ট নেই। একটি মাত্র গোল দিয়ে এবং কোনো অ্যাসিস্ট ছাড়াও যে বিশ্বকাপে হিরো হওয়া যায় তা দেখিয়ে দিলেন এই ইয়ামাল।

এই বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার জন্য বাছাইপর্বে মাত্র দু’টি ম্যাচে খেলার সুযোগ পেয়েছিলেন ইয়ামাল। সেখানেও তার দ্যুতি ছড়ানো পারফরম্যান্স। দুই ম্যাচে তার তিন অ্যাসিস্ট।

বিশ্বকাপের আগে ইউরোতে সাত ম্যাচে তিনি করেছেন এক গোল। অ্যাসিস্ট ছিল চারটি। তার একমাত্র সেই গোলটি এসেছিল ফ্রান্সের বিপক্ষে। দূর থেকে নেয়া শটের সেই গোলই আসরের সেরা গোলের পুরস্কার জয় করে। দুই সিজনে বার্সেলোনার হয়ে তার ১০১ ম্যাচে ৩০ গোল ও ২৯ অ্যাসিস্ট।

স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে তিনটি ট্রফি এনে দিলেন। উয়েফা নেশন্স লিগ, ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ ও বিশ্বকাপ। অন্য দিকে আর্জেন্টিনার লিওনেল স্কালোনি পারলেন না টান টানা দুই বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন কোচ হতে। ফাইনালে মেসি গোল করতে না পারার ফলে ১০ গোল দিয়ে এমবাপ্পেই হয়ে গেলেন সর্বোচ্চ গোলদাতা। এটি তার টানা দ্বিতীয় সাফল্য।

পরের বিশ্বকাপ তিন মহাদেশের ছয় দেশ মিলে। বিশ্বকাপের শতবর্ষী আসর বলেই এর উদ্বোধন হবে উরুগুয়ের মন্টিভিডিওতে। একটি ম্যাচ হবে আর্জেন্টিনায়। একটি প্যারাগুয়েতে। টুর্নামেন্টের বাকি ম্যাচগুলোর স্বাগতিক স্পেন, পর্তুগাল ও মরক্কো। অর্থাৎ দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ এবং আফ্রিকা মহাদেশ মিলে আসর। এতে আর্জেন্টিনা তাদের বিশ্বকাপ পুনরুদ্ধারের মিশন শুরু করতে পারবে নিজ দেশে। আর ইয়ামালের স্পেনেরও বিশ্ব ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখার পর্ব শুরু হবে নিজ দেশ থেকে।