এটা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত : দূতাবাসের কাউন্সিলর

কাতার, দুবাইয়ে সত্যায়ন জটিলতায় কর্মী গমন হ্রাস

“কর্মীদের সত্যায়ন করার ডিসিশন আমাদের মিনিস্ট্রির। এখানে দূতাবাসের কিছু করার নেই।”

মনির হোসেন
Printed Edition
Attestation

মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবান্ধব দেশ কাতারে বাংলাদেশী কর্মীদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের চাহিদার সুযোগ থাকলেও শুধু দেশটিতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসের সত্যায়ন জটিলতার কারণে অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশী শ্রমিক কম যাচ্ছে বলে মনে করছেন জনশক্তি প্রেরণের সাথে জড়িতরা। শুধু তা-ই নয়, কাতারের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে নিয়োগকারী কোম্পানির দেয়া চাহিদাপত্র অনুযায়ী এসব কর্মীর থাকা, খাওয়া ও বেতন সংক্রান্ত কোনো ঝামেলা নেই- সেটির সত্যায়ন করাতে গেলেই তাদের অতিরিক্ত টাকা (রিয়াল) গুনতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে একদিকে সত্যায়নের নামে যেমন হয়রানি হতে হচ্ছে কর্মীদের, অপর দিকে ভিসা প্রসেসিং করে বিদেশে পাড়ি জমাতে তাদের সময়ক্ষেপণ হচ্ছে।

বিদেশগামী কর্মী এবং রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের কাছ থেকে এমন শত শত অভিযোগ পেয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা সত্যায়ন ছাড়া কিভাবে কর্মীদের বহির্গমন ছাড়পত্র আরো সহজ দেয়া যায় সেটি নিয়ে তারা মন্ত্রণালয় এবং বিএমইটির মধ্যে সমন্বয় করে কাজ শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। বিএমইটির কর্মকর্তাদের টার্গেট, কোনো ধরনের হয়রানি ও কম খরচে কিভাবে কর্মীরা বিদেশে যেতে পারবে সেটিকেই তারা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।

গতকাল রোববার সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে কাতারে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সিলর (শ্রম) মো: মাসুদুল কবিরের সাথে হোয়াটসঅ্যাাপে যোগাযোগ করলে তিনি নয়া দিগন্তকে বলেন, কর্মীদের সত্যায়ন করার ডিসিশন আমাদের মিনিস্ট্রির। এখানে দূতাবাসের কিছু করার নেই। তা ছাড়া এই বিষয়ে কোনো পরামর্শও আমার তরফ থেকে দেয়ার নাই বলে মন্তব্য করেন তিনি। দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর বিভাগ থেকে আগত কোম্পানি থেকে কর্মীদের সত্যায়ন করাতে কাতারের আল ফুরসান নামের একটি এজেন্সির নাম বেশি দেখা যাচ্ছে- এমন প্রশ্নের জবাব চাওয়ার সময় নেটওয়ার্কে সমস্যা হচ্ছে বলে জানান তিনি। পরে হ্যালো হ্যালো করে লাইনটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোতে খোঁজ নিতে গেলে একাধিক জনশক্তি ব্যবসায়ী নয়া দিগন্তের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এমনিতেই বিদেশের শ্রমবাজার বলতে শুধু সৌদি আরবেই লোক যাচ্ছে। আর কোনো দেশে লোক যাচ্ছে বলেন? আমাদের জানা মতে, মালয়েশিয়া, ওমান, ইতালি, বাহরাইন, লেবানন, লিবিয়া, ইরাক, মরিশাস, ব্রুনাইয়ে শ্রমিক যাওয়া বন্ধ রয়েছে। এরপর আমরা যারা ভিসার চাহিদাপত্র প্রসেসিং করাতে আসছি, তখন আমাদের বলা হয় দূতাবাস থেকে সত্যায়ন বাধ্যতামূলক। এটা করে নিয়ে আসতে। ভিসা ঠিক থাকার পরও সত্যায়নের জন্য কাগজপত্র আবার দূতাবাসে মেইল পাঠাতে হয়। সেখানে পাঠানোর পর আবার সময়ক্ষেপণ। হয়রানি, দুর্নীতির রাস্তা বের করা ছাড়া আর কিছু নয়। এভাবে যে শ্রমিক এক মাসে বিদেশে চলে যাওয়ার কথা তার যেতে সময় লাগছে তিন থেকে চার মাস। এই মুহূর্তে সত্যায়ন জটিলতার কারণে কাতার, দুবাই, সৌদি আরবে শ্রমিকদের যেতে অনেক অনেক ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে বলে তারা অভিযোগ করেন। দূতাবাসের সত্যায়ন করানো যদি তুলে বিএমইটির ওয়ানস্টপ সার্ভিস থেকে ক্লিয়ারেন্স দেয়া হতো তখন রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক ও বিদেশগামী কর্মীদের অনেক সুবিধা হতো, খরচ কমে যেত বলে তারা জানান।

বিএমইটির পরিসংখ্যান ঘেটে দেখা যায়, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে মোট ২ লাখ ৬৫ হাজার ৪৩৫ জন শ্রমিক বৈধভাবে বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৯৭ হাজার ৮৬৭ জন, ফেব্রুয়ারি মাসে কমে ৬২ হাজার ৪৩৬ জনে দাঁড়ায়। মার্চ মাসে সেটি বেড়ে ১ লাখ ৪ হাজার ৯৭৪ জনে দাঁড়ায়। এর মধ্যে কাতারে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে মোট ১৪ হাজার ৩৩ জন কর্মী পাড়ি জমায়। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ৬ হাজার ৮৮৩ জন এবং ফেব্রুয়ারি মাসে ৭ হাজার ১৫০ জন যাওয়ার তথ্য থাকলেও মার্চ মাসে দেশটিতে কতজন গিয়েছেন সেটি উল্লেখ নেই।

গতকাল দুপুরে বনানী সংলগ্ন সৈনিক ক্লাব সড়কের পাশে থাকা একটি জনশক্তি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিক নিজের নাম প্রকাশ না করার শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, কাতার, দুবাই, সৌদি আরবসহ যত দেশে কর্মীদের সত্যায়ন করার নিয়ম রয়েছে সেগুলো দ্রুত তুলে দেয়ার দাবি জানাচ্ছি। তার মতে, সত্যায়ন মানে হয়রানি, কালক্ষেপণ, অর্থ অপচয়। দুর্নীতির রাস্তা খুলে দেয়া। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, স্বৈরাচার শেখ হাসিনার আমলে সত্যায়নের নামে দূতাবাসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা বস্তায় বস্তায় টাকা কামই করেছে। আর আমাদের হয়রানি করেছে। শ্রমিকদের বিদেশ যেতে পদে পদে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাতারের বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম কাউন্সিলর শাখায় রিয়াল ছাড়া কোনো কর্মীর সত্যায়ন হয় না। সেখানে স্থানীয় রিক্রুটিং এজেন্সি আল ফুরসানের নামে সত্যায়ন বেশি বেশি হওয়ার কারণ কী? এর মালিক হচ্ছে দেলোয়ার হোসেন জাকির। দূতাবাসের সাথে সিন্ডিকেট করে আল ফুরসানসহ আরো কয়েকটি এজেন্সি একচেটিয়া সত্যায়ন করানোর ব্যবসা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ঢাকার বিএমইটিতে খোঁজ নিলে দেখা যাবে কাতারের বেশির ভাগের সত্যায়নের ফাইলে সিরিয়ালে নাম লেখা রয়েছে আল ফুরসান। একেকজন কর্মীর নামে দূতাবাসকে ৭০০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার রিয়াল পর্যন্ত ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। টাকা খরচ হওয়ার সাথে কমপক্ষে দুই মাস সময়ও বেশি লাগে। অথচ ভারত, নেপালসহ অন্যান্য দেশের কর্মীদের ভিসা হওয়ার পর এক সপ্তাহের মধ্যে ফ্লাইট হয়ে যাচ্ছে। আর আমাদের এখানে ফিঙ্গার দাও, আমি প্রবাসী অ্যাপসে আবেদন জমা করো। চালান জমা দাও। নানা কাহিনী। এসব কারণে কাতারে পুরুষ মহিলা কর্মী যাওয়ার হার অনেক কমেছে। সত্যায়ন তুলে দিলে দেশটিতে হাজার হাজার শ্রমিক যাবে। দেশে আসবে বেশি বেশি রেমিট্যান্স। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সৌদি আরবে সত্যায়ন ছাড়া হাজার হাজার নারী কর্মী যেতে পারলে কাতার, দুবাইতে যেতে বাধা কোথায়?

গত বৃহস্পতিবার এ প্রসঙ্গে জানতে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তার কাছে বক্তব্য নিতে গেলে তারা পরিচয় না প্রকাশের শর্তে নয়া দিগন্তকে বলেন, সরকার আমাদের এখানে দায়িত্ব দিয়েছে কোনো ধরনের হয়রানি ছাড়াই বেশি বেশি কর্মী কিভাবে যাবে সেটি দেখার জন্য। আমরা বিদেশগামী কর্মী, এজেন্সি মালিক ছাড়াও সবার সাথে আলাপ করছি। সবার সুপারিশ নিয়ে যদি দেখি দূতাবাসের সত্যায়নের পরিবর্তে ওয়ানস্টপের মাধ্যমে কর্মীদের বহির্গমন সমস্যার সমাধান করা সম্ভব তাহলে সেদিকে আমরা আগানোর চেষ্টা করব।

ঢাকার কাকরাইল এলাকার একজন ব্যবসায়ী আপেক্ষ করে নয়া দিগন্তকে বলেন, আমাদের প্রায় সময় ভিসা সঠিক থাকলেও শুধু সত্যায়ন না থাকার কারণে কর্মীর ফ্লাইট মিস হয়ে যাচ্ছে। এতে কর্মী যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তেমনি আমরাও আর্থিকভাবে ক্ষতির স্বীকার হচ্ছি। এই বিষয়টি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল স্যারকে গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখার দাবি জানান তিনি।