গুমের ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করব : ব্যারিস্টার আরমান
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
গুমের শিকার হওয়া ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলোর স্থায়ী পুনর্বাসনের দাবি নিয়ে আগামী ১২ মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া সংসদ অধিবেশনে সোচ্চার হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় নিজের জবানবন্দী ও দ্বিতীয় দিনের জেরা সম্পন্ন হওয়ার পর সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে তিনি এই দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, ভুক্তভোগীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও তাদের পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংসদে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব উত্থাপন করবেন তিনি। ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, আমি সেই সব হারিয়ে যাওয়া মানুষের কণ্ঠস্বর, যারা অন্ধকার আয়নাঘর থেকে আর কোনোদিন ফিরে আসার সুযোগ পাননি। আমি সেই সব পরিবারের প্রতিনিধি যাদের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি গুমের শিকার হয়ে আজ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, সংসদ সদস্য হিসেবে তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে একটি ‘স্থায়ী পুনর্বাসন কমিশন’ গঠনের দাবি জানানো, যাতে রাষ্ট্রীয়ভাবে এসব অসহায় পরিবারের পাশে দাঁড়ানো যায়।
ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তিনি আরো জানান, আসামিপক্ষের আইনজীবীরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করেও তার জবানবন্দীতে কোনো মৌলিক ত্রুটি খুঁজে পাননি। বরং জেরার মাধ্যমে এটিই বারবার প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে, বিগত সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আসা নির্দেশে এবং শীর্ষ কর্মকর্তাদের সরাসরি তত্ত্বাবধানে এই ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। গুমের ঘটনাস্থল এবং এর সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের তথ্যগুলো জেরার মাধ্যমেই এখন আরো সুপ্রতিষ্ঠিত হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সংসদ অধিবেশনে তার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে ব্যারিস্টার আরমান বলেন, তিনি কেবল পুনর্বাসন নয়, বরং গুমের ভুক্তভোগীদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ এবং তাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে বীরত্বপূর্ণ স্বীকৃতি দেয়ার দাবি জানাবেন। একই সাথে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভবিষ্যতে যেন আর কোনোদিন এই বাংলায় ‘গুমের কালচার’ ফিরে না আসে, সেজন্য একটি বিশেষ ‘মেমোরিয়াল পলিসি’ বা স্মৃতি সংরক্ষণ উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানাবেন। তিনি মনে করেন, পরবর্তী প্রজন্মকে এই নৃশংসতা সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।
বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা প্রসঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে নির্যাতিত ও দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার কারণে ভুক্তভোগীদের প্রতি তার বিশেষ সহানুভূতি রয়েছে। তিনি বিশ্বাস করেন, জুলাই বিপ্লব ও গুম-খুনের সাথে জড়িতদের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালের আইনগুলোকে স্থায়ী রূপ দিতে সরকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে। ট্রাইব্যুনাল প্রাঙ্গণে দেয়া এই বক্তব্যে তিনি আরো যোগ করেন, শত শত পরিবার এখনো জানে না তাদের প্রিয়জনদের ভাগ্যে কী ঘটেছে; সেই তথ্য সরবরাহ করা এবং তাদের দুশ্চিন্তামুক্ত রাখা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
এই মামলার প্রথম সাক্ষী হিসেবে গত ২১ জানুয়ারি জবানবন্দী দেন মীর আহমাদ বিন কাসেম। এরপর ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনসহ অন্যান্য ব্যস্ততার কারণে তিনি ট্রাইব্যুনালে আসতে পারেননি। ফলে কিছু দিন পর গত ৮ মার্চ প্রথম দফায় জেরা সম্পন্ন হয়। গতকাল মঙ্গলবার তাকে দ্বিতীয় দিনের মতো জেরা করেন আসামি পক্ষের আইনজীবী তাবারক হোসেনসহ অন্যরা।
জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়ন নিয়ে মীর আহমাদ বিন কাসেম ঢাকা-১৪ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তার বাবা মীর কাসেম আলী জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। ওই বছরই গুমের শিকার হন ব্যারিস্টার আরমান।
টিএফআই সেলে গুম করে রাখার ঘটনায় করা এই মামলার ১৭ আসামির মধ্যে ১০ জন ঢাকা সেনানিবাসের সাবজেলে আছেন। সাবজেলে থাকা আসামিরা হলেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো: জাহাঙ্গীর আলম, তোফায়েল মোস্তফা সারোয়ার, মো: কামরুল হাসান, মো: মাহাবুব আলম ও কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন ও আনোয়ার লতিফ খান (অবসর প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে), লে. কর্নেল মো: মশিউর রহমান, সাইফুল ইসলাম ও মো: সারওয়ার বিন কাশেম। রোববার তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়।
এ মামলার অপর সাত আসামি পলাতক। তারা হলেন- ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার তৎকালীন প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ (পরে আইজিপি হন), এম খুরশীদ হোসেন ও মো: হারুন অর রশিদ এবং লে. কর্নেল (অব:) মুহাম্মাদ খায়রুল ইসলাম।
ইনুর মামলার যুক্তিতর্ক ২ এপ্রিল
এ দিকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালীন কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আত্মপক্ষে মৌখিক সাক্ষ্য দিতে পারেননি জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। পরে এ মামলায় যুক্তিতর্কের জন্য আগামী ২ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ দিন ধার্য করেন। প্যানেলের অপর সদস্য হলেন বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদ। এদিন ট্রাইব্যুনালে সাফাই সাক্ষ্য দেয়ার কথা ছিল হাসানুল হক ইনুর। তবে কোনো ধরনের ব্যাখ্যা দেননি তিনি। পরে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামিপক্ষের আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তিতর্কের জন্য ২ এপ্রিল দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল। সাধারণত আইনানুযায়ী প্রথমত যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করে প্রসিকিউশন। কিন্তু এ মামলায় আগে করবেন আসামিপক্ষের আইনজীবীরা।
এ প্রসঙ্গে ইনুর আইনজীবী সিফাত মাহমুদ শুভ বলেন, শারীরিক অসুস্থতার কারণে আজ ট্রাইব্যুনালে হাজির হতে চাননি হাসানুল হক ইনু। এরপরও তাকে জোর করে আনা হয়েছে। কিন্তু আনলেও তার স্বপক্ষে ব্যাখ্যা দেয়ার সুযোগ দেননি ট্রাইব্যুনাল। আমরা ৬৪ পৃষ্ঠার লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করতে চেয়েছি। সেটিও নেয়া হয়নি। অর্থাৎ এখানে আসামির আইনি অধিকার খর্ব করা হয়েছে বলে দাবি এই আইনজীবীর। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ। সাথে ছিলেন প্রসিকিউটর সহিদুল ইসলাম সরদারসহ অন্যরা।
প্রসিকিউশনের অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়া শহরের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনে নামেন ছাত্র-জনতা। হাসানুল হকের নির্দেশে তাদের ওপর গুলি চালায় পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্রবাহিনী। তাদের গুলিতে শহীদ হন শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম, সুরুজ আলী বাবু, শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মুস্তাকিন, উসামা, ব্যবসায়ী বাবলু ফরাজী ও চাকরিজীবী ইউসুফ শেখ। আহত হন বহু নিরীহ মানুষ। এ ছাড়া উসকানি-প্ররোচনাসহ ইনুর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট আটটি অভিযোগ আনা হয়।