‘দূর পাহাড়ের গান’ রিসোর্টের বর্ণিল যাত্রা
বমদের ভাগ্য বদলে নতুন আশার ভিত গড়ল সেনাবাহিনী
Printed Edition
আরফাত বিপ্লব কেওক্রাডং থেকে ফিরে
পার্বত্য জেলা বান্দরবানের রুমা উপজেলার দুর্গম সীমান্ত এলাকা সুংসংপাড়া। সমুদ্রপৃষ্ট থেকে যার উচ্চতা ২১০০ ফুট। অস্ত্রধারী কুকি ন্যাশনাল আর্মি (কেএনএ) সদস্যদের নির্যাতনে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস থেকে এই এলাকার বম সম্প্রদায়ের অনেক পরিবার ভারতের মিজোরামে পাড়ি জমিয়েছিল। এর পর থেকে নড়েচড়ে বসে সেনাবাহিনী। তাদের টানা দেড় বছরের নানা তৎপরতায় সেই পাহাড়ে ফিরে এসেছে স্বস্তি। সাথে ভারতের মিজোরাম থেকেও ফিরে এসেছেন ৫ শতাধিক মানুষ। তারা সবাই বম সম্প্রদায়ের। ২০২৫ সালে ধাপে ধাপে ফিরে আসা বম জনগোষ্ঠীর আর্থিক সচ্ছলতা ও স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করার জন্য সেনাবাহিনী নিয়েছে বিশেষ উদ্যোগ।
পাহাড়ে শান্তি আনয়নে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা সেনাবাহিনীর নেয়া প্রথম উদ্যোগ ইকো রিসোর্ট। রিসোর্টটির নাম দেয়া হয়েছে বম ভাষায় ‘আলা মি তø্যাং লা’ রিসোর্ট। বাংলা ভাষায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘দূর পাহাড়ের গান’। এর আগে ১৮ নভেম্বর ২০২৪ থেকে সেনাবাহিনী নিজেদের অর্থায়নে বম সম্প্রদায়ের লোকজনকে তাদের নিজভূমে আনতে প্রক্রিয়া শুরু করে।
বান্দরবান রিজিওনাল কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম রাকিব ইবনে রেজওয়ান বলেন, এই রিসোর্টের মালিকানা থাকবে সম্পূর্ণরূপে স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের হাতে। শুধু তাদের আর্থিক নিরাপত্তার কথা ভেবে সেনাবাহিনী এই রিসোর্ট তৈরি করে দিচ্ছে। এর পুরো অর্থায়ন করেছে সেনাবাহিনীর ২৪ পদাতিক ডিভিশন।
সরেজমিন দেখা গেছে, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ চূড়া কেওক্রাডং পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সুংসংপাড়া প্রাকৃতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় এই এলাকায় স্থানীয় বম জনগোষ্ঠীর কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস ছিল না। মিজোরাম ফেরত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন এবং তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সেনাবাহিনী সেখানে তৈরি করছে ইকো রিসোর্ট। গতকাল শনিবার জমকালো আয়োজনে অনুষ্ঠানে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন বান্দরবান সেনা রিজিওনাল কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এস এম রাকিব ইবনে রেজওয়ান। সাথে ছিলেন ১৬ ইস্ট বেঙ্গল জোন অধিনায়ক সৈয়দ আতিকুল করিম, লে. কর্নেল মেহেদি হাসান সরকার, বান্দরবান সেনা রিজিওনের জিটুআই মেজর পারভেজ হায়দার, সুংসংপাড়া ক্যাম্প কমান্ডার মেজর আরাফাত হায়দার প্রমুখ। আরো উপস্থিত ছিলেন বম অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান লাল জার বম। এ ছাড়া ইয়াং বম অ্যাসোসিয়েশন, বম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ও বম উইমেন অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ ছাড়াও স্থানীয় আট গ্রামের অধিবাসী উপস্থিত ছিলেন।
বম অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান লাল জার বম নয়া দিগন্তকে বলেন, আমরা বম জনগোষ্ঠী এখানে অনেক সমস্যায় ছিলাম। ফলে আমাদের একটি বিশাল অংশ ভারতের মিজোরামে চলে গিয়েছিল। সেনাবাহিনীর আন্তরিকতা তৎপরতায় অনেকেই ফিরে এসেছেন। আমাদের জন্য আজকে যে রিসোর্টটির যাত্রা শুরু হয়েছে আমি মনে করি, এটি কেবল একটি স্থাপনা নয়, বরং স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে আধুনিকতার এক সেতুবন্ধন। পাহাড়ের প্রকৃত সৌন্দর্য ও ভারসাম্য রক্ষা করে এটি নির্মাণ করা হচ্ছে। রিসোর্টের নকশায় বম জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যশৈলীকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই রিসোর্ট তৈরির সময় স্থানীয় বমদের মধ্যে যারা কাজ করেছে তাদেরকে দিন হিসেবে মজুরি দিয়েছে সেনাবাহিনী।
সেনাবাহিনী সূত্র বলছে, কেওক্রাডং ভ্রমণে আসা পর্যটকদের জন্য এটি হবে একটি আকর্ষণীয় এবং আরামদায়ক থাকার জায়গা। এখন পর্যন্ত এই এলাকায় পর্যটক প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও এই রিসোর্ট তৈরির পর তা খুলে দেয়া হবে। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত হবে অনিন্দ্য সুন্দর গহিন অরণ্য। রিসোর্টটির কাজ খুব শিগগিরই শেষ হবে। এতে করে সুংসংপাড়া ও আট গ্রামের অর্থনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সুংসংপাড়া সেনাক্যাম্পের কমান্ডার আরাফাত হায়দার জানান, রিসোর্টটি পরিচালনার দায়িত্বে থাকবেন স্থানীয় বম সম্প্রদায়ের মানুষরা। এতে তাদের নিয়মিত আয়ের পথ তৈরি হবে। পর্যটকদের আগমনে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জুম চাষের ফলমূল এবং হস্তশিল্প বিক্রির বড় বাজার তৈরি হবে।
স্থানীয়রা জানান, মহান বিজয়ের মাস ও ক্রিসমাস ডে উপলক্ষে পাঁচ দিনব্যাপী উৎসবের আয়োজন করেছে সেনাবাহিনী। গতকাল শনিবার গয়াল জবাই করে হাজার খানেক মানুষের জন্য মধ্যাহ্ন ভোজের আয়োজন করা হয় সেনাবাহিনীর অর্থায়নে।
ফিরে আসা বম পরিবারের সদস্যরা এই উদ্যোগে অত্যন্ত খুশী। তারা জানান, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা আসার ফলে এলাকাটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা আরো সুসংহত হওয়ার পাশাপাশি নিজের এলাকায় কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হওয়ায় আমাদের আর বাইরে যেতে হবে না। সেনাবাহিনী আমাদের থাকার জায়গার পাশাপাশি আয়ের পথও করে দিচ্ছে। আমরা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।