ভারতের বাংলাদেশ দ্বিধা কৌশলগত অংশীদার নাকি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা?

ডিপ্লোম্যাট বিশ্লেষণ

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ভারতের জন্য আজ বাংলাদেশের প্রশ্ন আর কেবল স্থিতিশীলতা রক্ষা করার কৌশলগত সমীকরণ নয়; বরং একটি রাজনৈতিকভাবে অস্থির, সামাজিকভাবে সংগঠিত এবং ক্রমে আত্মসচেতন রাষ্ট্রকে কিভাবে সম্পৃক্ত করা যায়- সেটিই প্রধান চ্যালেঞ্জ। নয়াদিল্লি এই নতুন বাস্তবতার সাথে মানিয়ে নিতে পারবে কি না, নাকি নিজের অতীত সাফল্যের গল্পে আটকে থাকবে- তা শুধু আগামী ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের ফল নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মানচিত্রকেও প্রভাবিত করবে।

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার মৃত্যুদণ্ডাদেশ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতবিরোধী মনোভাবকে আরো তীব্র করেছে। এর ফলে ভারতের সামনে একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে- বাংলাদেশ কি এখনো ভারতের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, নাকি এটি ধীরে ধীরে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক দায়বদ্ধতায় পরিণত হচ্ছে?

বিচক্ষণতার চেয়ে ভবিষ্যদ্বাণী যোগ্যতার রাজনীতি : বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের নীতি দীর্ঘদিন ধরেই বহুত্ববাদ বা গণতান্ত্রিক বৈচিত্র্যের চেয়ে ভবিষ্যদ্বাণী যোগ্যতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। পশ্চিমা অংশীদাররা শেখ হাসিনার অধীনে বাংলাদেশের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন তুললেও ভারত প্রকাশ্যে নীরব থেকেছে এবং বিষয়টিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট- ঢাকায় সহজ প্রবেশাধিকার ও প্রভাব ধরে রাখা।

কিন্তু এই পন্থার মূল্য এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিরোধীদের বয়কট, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং সহিংসতার অভিযোগ তীব্র হওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশের শহুরে মধ্যবিত্ত ও তরুণসমাজের মধ্যে- যাদের প্রায় ৪৫ শতাংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে- ভারতের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশগুলো প্রায়ই নিজেদের সমস্যার জন্য ভারতকে দায়ী করলেও, বাংলাদেশে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান সেই ফিসফিসানি সন্দেহকে একটি শক্তিশালী মূলধারার রাজনৈতিক অনুভূতিতে রূপ দিয়েছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মেরুকরণের ফলে শেখ হাসিনা সরকারের সাথে ভারতের কৌশলগত প্রতিশ্রুতিগুলো বিরোধী শক্তির কাছে রাজনৈতিকভাবে অবৈধ হয়ে উঠেছে। ভারত যেগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক অর্জন হিসেবে দেখেছিল, সেগুলো ক্রমে শাসনসংযুক্ত ব্যবস্থার মতো মনে হচ্ছে।

নিরাপত্তা লাভের ভ্রান্ত নিশ্চয়তা : একসময় মনে করা হতো বাংলাদেশের সাথে ভারতের নিরাপত্তা সহযোগিতা- সন্ত্রাসবাদ দমন, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য ট্রানজিট সুবিধা- অপরিবর্তনীয়। বাস্তবে তা কখনোই ছিল না। এসব সহযোগিতা চুক্তির ওপর নয়, বরং ঢাকার ভেতরের রাজনৈতিক ঐকমত্যের ওপর নির্ভর করে, যা বর্তমানে অনুপস্থিত।

১৯৭১ সালের আবেগগত ফাঁদ: ভারতের বাংলাদেশ নীতিতে আবেগ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারতের ভূমিকা এবং সাংস্কৃতিক ঘনিষ্ঠতা ভারতকে একটি নৈতিক অধিকার ও বিশেষ দায়বদ্ধতার অনুভূতি দিয়েছে- যা পাকিস্তান, নেপাল বা শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। এই আবেগ একসময় বিশ্বাস গড়ে তুললেও সময়ের সাথে তা পরিবর্তিত বাস্তবতা বোঝার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

১৯৭১-এর পর জন্ম নেয়া প্রজন্ম ভারতকে আর মুক্তিদাতা হিসেবে নয়, বরং একটি শক্তিশালী প্রতিবেশী হিসেবে দেখে। তবুও ভারত প্রায়ই এমন আচরণ করে যেন ঐতিহাসিক সদিচ্ছা চিরস্থায়ী রাজনৈতিক সারিবদ্ধতার নিশ্চয়তা দেয়। এমনকি ভারতপন্থী সরকারগুলোও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতবিরোধী বয়ান ব্যবহার করার প্রণোদনা পেয়েছে। অবকাঠামো প্রকল্প, ট্রানজিট চুক্তি ও জ্বালানি আমদানির মতো উদ্যোগ- যেগুলো বাস্তবে বাংলাদেশকে উপকৃত করে- বিরোধী শক্তির কাছে ‘ভারতের প্রতি ছাড়’ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, যা শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে বিরোধীদের দমন করতে সহায়তা করেছে।

চীন ও যুক্তরাষ্ট্র : অতিরঞ্জিত ভয়, দুর্বল কৌশল : বাংলাদেশ নিয়ে ভারতীয় কৌশলগত চিন্তায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব গভীর, কিন্তু অনেক সময় অতিরঞ্জিত। ইমরান খান ও শেখ হাসিনা- উভয়েই তাদের পতনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছেন, যা ষড়যন্ত্রমূলক ব্যাখ্যাকে উসকে দিয়েছে। একইভাবে খালেদা জিয়াকে চীনপন্থী ও শেখ হাসিনাকে ভারতঘেঁষা হিসেবে দেখানোর সরলীকৃত বয়ান বাস্তবতার জটিলতা আড়াল করে।

নিঃসন্দেহে চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগকারী। তবে ঢাকায় চীনের প্রভাব আদর্শিক নয়; এটি মূলত লেনদেনভিত্তিক। বিদ্রƒপাত্মকভাবে, চীন ও পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশ হারানোর ভয় ভারতের দরকষাকষির অবস্থানকে দুর্বল করেছে। ঢাকা এই প্রতিযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে কারো প্রতি অতিরিক্ত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ না হয়ে অর্থনৈতিক সুবিধা আদায় করতে শিখেছে।

একই সময়ে, রাজনৈতিক সহিংসতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার প্রশ্নে ভারতের নীরবতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো পশ্চিমা শক্তিকে নৈতিক ও কূটনৈতিক জায়গা করে দিয়েছে। ভিসা নিষেধাজ্ঞা ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্য সমালোচনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সঙ্কট আন্তর্জাতিকীকরণ পেয়েছে, যেখানে ভারতের ঐতিহ্যবাহী নীরব দ্বিপক্ষীকতা ক্রমেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

সংযোগ ব্যবস্থা : সামাজিক বৈধতার ঘাটতি : রেল, অভ্যন্তরীণ নৌপথ, মোংলা ও চট্টগ্রাম বন্দর এবং বিদ্যুৎ গ্রিড সংযোগে ভারতের বিনিয়োগ বাস্তবিক অর্থে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশের সংযোগ ব্যবস্থাকে রূপান্তরিত করেছে। কিন্তু এসব প্রকল্পের সামাজিক বৈধতা দুর্বল। ঢাকায় এগুলোকে প্রায়ই ভারতের কৌশলগত অগ্রাধিকার পূরণের হাতিয়ার হিসেবে দেখা হয়, যেখানে সাধারণ বাংলাদেশীর উপকারিতা কম দৃশ্যমান। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া অবকাঠামো প্রকল্প রাজনৈতিকভাবে দুর্বলই থেকে যায়।

শাসনব্যবস্থার প্রবেশাধিকার বনাম রাষ্ট্রীয় স্থিতিস্থাপকতা : ভারতের দ্বিধার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি কাঠামোগত প্রশ্ন- ভারত কি বর্তমান শাসনব্যবস্থার সাথে ঘনিষ্ঠতাকে অগ্রাধিকার দেবে, নাকি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক স্থিতিস্থাপকতায় বিনিয়োগ করবে? এখন পর্যন্ত নয়াদিল্লি প্রথম পথটিই বেছে নিয়েছে। ঝুঁকিটাও স্পষ্ট- শাসনের বৈধতা ক্ষয় হলে ভারত সরকারগুলোর কাছাকাছি থেকেও সমাজ থেকে দূরে সরে যেতে পারে।

বাংলাদেশ ভেঙে পড়ছে না; এটি রূপান্তরিত হচ্ছে। রাজনীতি আরো অস্থির, সমাজ আরো সচেতন এবং আন্তর্জাতিক পরিবেশ আরো হস্তক্ষেপকারী হয়ে উঠছে। এই বাস্তবতা ভারতের ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির সীমাবদ্ধতা উন্মোচন করে। একসময় ভারতের সবচেয়ে আরামদায়ক প্রতিবেশী বাংলাদেশ আজ তার সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং প্রতিবেশীতে পরিণত হচ্ছে- যা নয়াদিল্লিকে একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি করছে :

অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে উপেক্ষা করে গড়া কৌশলগত অংশীদারিত্ব শেষ পর্যন্ত কৌশলগত দায়বদ্ধতায় পরিণত হয়।