নওগাঁর ভোটের সমীকরণ বদলাচ্ছে
বিদ্রোহী প্রার্থীর চাপে বিএনপি ৩ আসনে এগিয়ে জামায়াত
Printed Edition
আব্দুর রশীদ তারেক নওগাঁ
জাতীয় সংসদের ছয়টি আসন নিয়ে গঠিত নওগাঁ জেলা দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। বিগত দিনগুলোতে অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে জেলার ছয়টি আসনই ছিল বিএনপির দখলে। তবে ব্যতিক্রমও ছিল। ১৯৯১ সালে নওগাঁ-৪ আসনে জামায়াত এবং একবার নওগাঁ-৫ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মরহুম আব্দুল জলিল সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নওগাঁর রাজনৈতিক মাঠে দৃশ্যত নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে। ছয়টি আসনে জামায়াত, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, বিএনএফ, বিআরপি, কমিউনিস্ট পার্টি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীসহ মোট ৩২ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে তিনটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থীরা শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন, যা দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে বিএনপির ভোট বিভক্ত হচ্ছে। আর সেই কারণে তিনটি আসনে জামায়াত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। অন্য তিন আসনেও জামায়াত শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
জেলাজুড়ে বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রচার-প্রচারণায় সরগরম নির্বাচনী পরিবেশ। তবে জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী সময়ে বিএনপির কিছু নেতাকর্মীর অপকর্ম, আধিপত্য বিস্তার ও আচরণগত কারণে দলটির ইমেজ ক্ষুণœ হয়েছে বলে স্থানীয় ভোটারদের একাংশ মনে করছেন। বিপরীতে জামায়াতের প্রতি সাধারণ ভোটারদের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে বেড়েছে।
স্থানীয় নির্বাচনী কমিশন সূত্রে জানা যায়, ১১টি উপজেলা, তিনটি পৌরসভা, ৯৯টি ইউনিয়ন ও ছয়টি সংসদীয় আসন নিয়ে গঠিত নওগাঁ জেলায় মোট ভোটার ২৩ লাখ ২৯ হাজার ৫৯২ জন।
নওগাঁ-১ (পোরশা-সাপাহার-নিয়ামতপুর) : ২০টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৬৫ জন। এখানে পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এ আসন থেকে তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য ও সদ্য বহিস্কৃত নিয়ামতপুর থানা বিএনপির সভাপতি বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী ডা: ছালেক চৌধুরী (মোটরসাইকেল) শক্ত অবস্থানে থাকায় মূল বিএনপি প্রার্থী (নিয়ামতপুর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক) মোস্তাফিজুর রহমান (ধানের শীষ) চাপের মধ্যে পড়েছেন। ধারণা করা হচ্ছে, স্বতন্ত্র প্রার্থী বিএনপির ২০-২৫ শতাংশ ভোট কেটে নিতে পারেন। ফলে এখানে জামায়াত প্রার্থী অধ্যক্ষ মোহা: মাহবুবুল আলমের জয়ের সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি।
নওগাঁ-২ (পতœীতলা-ধামইরহাট) : এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭২ হাজার ৪৩৬জন। মোট তিনজন প্রাথী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তারা হলেন- জামায়াতের মো: এনামুল হক (দাঁড়িপাল্লা), বিএনপির তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য সামসুজ্জোহা খান (ধানের শীষ) ও এবি পার্টির মতিবুল ইসলাম (ঈগল)। এখানে বিএনপি-জামায়াতের প্রচার-প্রচারণা তুঙ্গে। এ আসনেও জামায়াত বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। জামায়াত ও বিএনপির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
নওগাঁ-৩ (মহাদেবপুর-বদলগাছী) : ১৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৪০ হাজার ৭৮৫ জন। মোট প্রার্থী আটজন। তারা হলেন- বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) আব্দুল্লাহ আল মামুন সৈকত (টেলিভিশন), বাসদের কালিপদ সরকার (মই), ইসলামী আন্দোলনের নাসির বিন আজগর (হাতপাখা), বিএনপির বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী (কলস), বিএনপি মনোনীত প্রার্থী বদলগাছী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ফজলে হুদা বাবুল (ধানের শীষ), জাতীয় পার্টির মাসুদ রানা (লাঙল), জামায়াতের মাহফুজুর রহমান (দাঁড়িপাল্লা) ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সাদ্দাম হোসেন (জাহাজ)। এ আসনে সাবেক ডেপুটি স্পিকার ও তিনবারের সংসদ সদস্য মরহুম আখতার হামিদ সিদ্দিকীর ছেলে পারভেজ আরেফিন সিদ্দিকী জনি ২০১৮ সালের নির্বাচনে ধানের শীষ নিয়ে নির্বাচন করে পরাজিত হন। এবার দল থেকে তাকে মনোনয়ন না দেয়ায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী কোণঠাসায় পড়েছেন। এ আসন থেকে বিদ্রোহী প্রার্থী পঁচিশ-ত্রিশ শতাংশ বিএনপির ভোট কেটে নিবে বলে মনে করছেন সচেতন মহল। এ আসনেও জামায়াত, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর (জনি) মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই হবে।
নওগাঁ-৪ (মান্দা) : উপজেলার ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৬০ জন। মোট ভোট কেন্দ্র ১১৭টি। জামায়াত, বিএনপি, স্বতন্ত্রসহ বিভিন্ন দলের মোট ছয়জন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তারা হলেন- বিএনপি নেতা ডা: ইকরামুল বারী টিপু (ধানের শীষ), নওগাঁ জেলা জামায়াতের আমির মো: আব্দুর রাকিব (দাঁড়িপাল্লা), বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির ডা: এস এম ফজলুর রহমান (কাস্তে), স্বতন্ত্র প্রার্থী মোসা: আরফানা বেগম (কলস), জাতীয় পার্টির মো: আলতাফ হোসেন (লাঙল) ও ইসলামী আন্দোলনের সোহরাব হোসেন (হাতপাখা)। আসনটি নির্বাচনী প্রচারণায় বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে। বর্তমানে জামায়াতের কয়েকজন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ও মেম্বার থাকায় এ আসনে জামায়াতের শক্ত অবস্থান ও ভোট ব্যাংক রয়েছে। অল্প ভোটের ব্যবধানে দাঁড়িপাল্লা ও ধানের শীর্ষের মধ্যে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
নওগাঁ-৫ (সদর) : একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৬৩ হাজার ৩০ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১১৮টি। মোট পাঁচজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তারা হলেন- জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট আবু সাদাত সায়েম (দাঁড়িপাল্লা)), জাতীয় পার্টির আনোয়ার হোসেন (লাঙল), ইসলামী আন্দোলনের আব্দুর রহমান (হাতপাখা), সাবেক জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ধলু (ধানের শীষ) ও বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির নওগাঁ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক শফিকুল ইসলাম (কাস্তে)। আসনটি পুনরুদ্ধারে বিএনপি মরিয়া হয়ে উঠলেও দলটির অন্তর্দ্বন্দ্বের কারণে জামায়াত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। এ আসনে জামায়াত-বিএনপির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে রাজনৈতিক সচেতন মহল মনে করছে।
নওগাঁ-৬ (রানীনগর-আত্রাই) : মোট ১৬টি ইউনিয়ন নিয়ে নওগাঁ-৬ আসনটি গঠিত। ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৪১৬ জন। ভোট কেন্দ্রের সংখ্যা ১১৫টি। এ আসনে মোট পাঁচজন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তারা হলেন- জামায়াতের খবিরুল ইসলাম (দাঁড়িপাল্লা), আত্রাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মো: রেজাউল ইসলাম (ধানের শীষ), বিএনপির থেকে সাবেক তিনবারের সংসদ সদস্য ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী (স্বতন্ত্র প্রার্থী) আলমগীর কবির (মোটরসাইকেল), বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির (বিআরপি) আতিকুর রহমান রতন মোল্লা (হাতি) ও ইসলামী আন্দোলনের রফিকুল ইসলাম (হাতপাখা)। এখানে সাবেক প্রতিমন্ত্রী আলমগীর কবিরের ভোট ব্যাংক রয়েছে। ফলে বিএনপির ২০-২৫ শতাংশ ভোট আলমগীর কবিরের ঝুলিতে পড়বে। এই সুযোগটাই জামায়াত প্রার্থী কাজে লাগাতে পারবেন বলে সাধারণ ভোটারদের অভিমত। এ ছাড়া জামায়াতের ভোটও আগের তুলনায় অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন এ আসনে ত্রিমুখী লড়াই হবে।
সব মিলিয়ে নওগাঁর ছয়টি আসনে এবারের নির্বাচন অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হতে চলেছে। বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা যেখানে দলটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে জামায়াত সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে একাধিক আসনে শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, জেলার রাজনীতিতে উত্তাপও তত বাড়ছে।