মানিলন্ডারিং অনুসন্ধানে বাধা : বহুজাতিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চলমান অনুসন্ধানে প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহে বিলম্ব করায় বহুজাতিক ব্যাংক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের (এসসিবি) বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে কমিশন। ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) চেয়ারম্যান মো: শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে এসসিবির কাছে যেসব গুরুত্বপূর্ণ নথি চাওয়া হয়েছিল, তা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরবরাহ না করায় কমিশন একাধিক দফায় তাগিদপত্র পাঠিয়েছে। সর্বশেষ তাগিদপত্রে স্পষ্টভাবে আইনি ব্যবস্থার ইঙ্গিতও দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনুসন্ধান শুরুর পর প্রথম দফায় শওকত আলী চৌধুরীর নামে পরিচালিত সব ব্যাংক হিসাবের বিবরণী, হিসাব খোলার ফর্ম, গ্রাহক পরিচিতি সংক্রান্ত তথ্য (কেওয়াইসি), অভ্যন্তরীণ অনুমোদন নথি এবং দেশী-বিদেশী লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ চাওয়া হয়। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এসব নথি সরবরাহ না করায় কমিশন দ্বিতীয় দফায় স্মারক চিঠি পাঠায়।
পরবর্তী চিঠিতে অনুসন্ধানের পরিধি আরো বিস্তৃত করা হয়। এতে শওকত আলী চৌধুরীর স্ত্রী তাসমিয়া আম্বারীন, সন্তান নামরীন ও মো: জারান আলী চৌধুরী এবং নিকট আত্মীয়দের নামে থাকা হিসাব, পারিবারিক সদস্যদের মাধ্যমে পরিচালিত লেনদেন, সংশ্লিষ্ট দেশী ও বিদেশী প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব এবং এসব ক্ষেত্রে বর্ধিত যাচাই সংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়। দুদকের মতে, পরিবারভিত্তিক আর্থিক নেটওয়ার্ক মানিলন্ডারিং ও অবৈধ সম্পদ গোপনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দ্বিতীয় দফার চিঠির পরও প্রয়োজনীয় নথি সম্পূর্ণভাবে সরবরাহ করা হয়নি। এতে অনুসন্ধান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় কমিশন সর্বশেষ একটি কড়া ভাষার তাগিদপত্র পাঠায়। ওই পত্রে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ধারা ১৯(৩) উল্লেখ করে বলা হয়, কমিশনের নির্দেশ অমান্য করা বা তথ্য প্রদানে বাধা দেয়া দণ্ডনীয় অপরাধ, যার শাস্তি হিসেবে অনূর্ধ্ব তিন বছর কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
সূত্র জানায়, নথি সরবরাহে বিলম্বের পেছনে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) একটি প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, শওকত আলী চৌধুরী ও তার সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত একাধিক বৈদেশিক লেনদেনে এসসিবি বাধ্যতামূলক বর্ধিত যাচাই যথাযথভাবে সম্পন্ন করেনি। বিশেষ করে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসের মতো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের সাথে সংশ্লিষ্ট লেনদেনে গ্রাহকের প্রকৃত মালিকানা অর্থের উৎস এবং লেনদেনের উদ্দেশ্য পর্যাপ্তভাবে যাচাই করা হয়নি বলে উল্লেখ করা হয়।
বিএফআইউর পর্যবেক্ষণে আরো বলা হয়, একাধিক ক্ষেত্রে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ বিদেশী বিচারব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত লেনদেন হলেও ঝুঁকিভিত্তিক পুনর্মূল্যায়ন করা হয়নি। ট্যাক্স হেভেন হিসেবে পরিচিত অঞ্চলে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডার কাঠামো জটিল হলেও ব্যাংকটি বাড়তি সতর্কতা নেয়নি। একই সাথে অস্বাভাবিক লেনদেনের ধরন, পারিবারিক ও ঘনিষ্ঠ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে অর্থপ্রবাহ এবং ঘোষিত ব্যবসায়িক কার্যক্রমের তুলনায় অস্বাভাবিক পরিমাণের লেনদেনের বিষয়গুলোকে সম্ভাব্য মানিলন্ডারিংয়ের আলামত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
অনুসন্ধানে আরো উঠে এসেছে তথাকথিত ‘শওকত-নাফিজ আরাফাত’ সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব। দুদক-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আওয়ামী লীগ আমলের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী চৌধুরী নাফিজ শারাফাত ও তৎকালীন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের সাথে শওকত আলী চৌধুরীর একটি শক্তিশালী আর্থিক ও প্রভাবভিত্তিক নেটওয়ার্কের তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তে দেখা যায়, ২০২৪ সালের ৩ মার্চ ইস্টার্ন ব্যাংকের বোর্ড সভায় নাফিজ শারাফাতের প্রতিষ্ঠান ‘স্ট্র্যাটেজিক ফাইন্যান্সে’র ঋণের শর্ত শিথিল করা হয়। একই সময়ে ‘সিডনেট কমিউনিকেশনসে’র তিন লাখ শেয়ার শওকত আলীর একটি প্রতিষ্ঠানের নামে হস্তান্তর করা হয়, যেখানে এম এ আরাফাত ও তার স্ত্রী শেয়ারহোল্ডার ছিলেন।
এ ছাড়া ইস্টার্ন ব্যাংক থেকে নাফিজ শারাফাতের প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রন্টিয়ার টাওয়ার্স বাংলাদেশ’-কে ২২০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়, যার মালিকানা কাঠামোর সাথে গোপনে যুক্ত ছিলেন শওকত আলী ও তার স্ত্রীর মালিকানাধীন ‘জেড এন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড। অন্য দিকে ন্যাশনাল টি কোম্পানির (এনটিসি) শেয়ার বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে শওকত আলীর সন্তানদের কাছে হস্তান্তরের ঘটনাও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় মালিকানা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এসব তথ্যই প্রমাণ করে যে অনুসন্ধান কেবল একটি ব্যক্তিগত হিসাবের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং একটি বিস্তৃত পারিবারিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও আন্তর্জাতিক আর্থিক নেটওয়ার্ক যাচাইয়ের প্রয়োজন রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটেই স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের কাছে বিস্তারিত কেওয়াইসি, ইডিডি এবং লেনদেনসংক্রান্ত নথি চাওয়া হয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, তাগিদপত্রের পরও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহ না করা হলে বহুজাতিক ব্যাংকটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় রয়েছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, এটি কেবল একটি মামলার প্রশ্ন নয়, বরং দেশের মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ ব্যবস্থা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং বহুজাতিক ব্যাংকগুলোর জবাবদিহিতার একটি বড় পরীক্ষাও বটে।