সাক্ষাৎকার : ইরানের শাহর ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্কের প্রধান নওরোজি
যুদ্ধ শেষ হবে ইরানের ইচ্ছায়
ইরানের অফিস-আদালতের তৎপরতা স্বাভাবিক রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্কুল বন্ধ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস দূর-শিক্ষণের মাধ্যমে অব্যাহত রয়েছে।
Printed Edition
ইরানের শাহর ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্কের প্রধান মোহাম্মদ নওরোজি চলমান যুদ্ধ প্রসঙ্গে বলেছেন, ইহুদিবাদী ইসরাইলের হামলা সত্ত্বেও ইরানের জনজীবনে কোনো ছন্দ পতন হয়নি। নিত্যপণ্য মজুদ করার কোনো প্রবণতা কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ইরানের অফিস-আদালতের তৎপরতা স্বাভাবিক রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে স্কুল বন্ধ থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস দূর-শিক্ষণের মাধ্যমে অব্যাহত রয়েছে। চলমান যুদ্ধ কবে বন্ধ হবে জানতে চাওয়া হলে শহীদ জেনারেল সোলাইমানির বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ইসরাইল যুদ্ধ শুরু করতে পারবে, কিন্তু শেষ হবে ইরানের ইচ্ছায়।
দৈনিক নয়া দিগন্তকে তেহরানের জমজমে নিজ দফতর থেকে টেলিফোনে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মোহাম্মদ নওরোজি এ কথা বলেন। ইরানের ইসলামী বিপ্লব সফল হওয়ার পর ইরাকের চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছেন নওরোজি। সম্মুখযুদ্ধে তিনি আহতও হয়েছেন।
নয়া দিগন্ত : আপনি ইরান-ইরাক যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। সেই যুদ্ধের সাথে ইহুদিবাদী ইসরাইলের চলমান যুদ্ধের তুলনামূলক আলোচনা করবেন কি?
মোহাম্মদ নওরোজি : ধন্যবাদ। ইসলামী বিপ্লবের পরপরই আট বছরের লড়াইটি ইরাক শুরু করেছিল। সে সময় ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের মাধ্যমে ইসলামী প্রজাতন্ত্র মাত্র গঠিত হয়েছে। সদ্যজাত রাষ্ট্র বলা যায় তখনকার ইরানকে। সে সময় ইরানের সেনাবাহিনী যথাযথভাবে শক্তিশালী ছিল না। রণ-অভিজ্ঞতাও তাদের ছিল না। ইরানি সেনাবাহিনীর সে সক্ষমতা এখন অনেক বেড়েছে। এখন যা আছে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় তা ছিল না। ইরানের সামরিক শক্তিমত্তা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রশিক্ষণসহ সব ক্ষেত্রেই ব্যাপক উন্নতি হয়েছে। সামরিক দিকে থেকে ইরান বিশ্ব শক্তির সমতুল্য হয়েছে। ক’দিন আগে ইরানের ওপর ইহুদিবাদী শাসকগোষ্ঠী যে হামলা চালিয়েছে, তা এই গোষ্ঠীর জন্য মারাত্মক ভুল হয়েছে। এই শাসকগোষ্ঠী ইরানের সামরিক সক্ষমতাকে বিবেচনায় নেয়নি। ইরানের শক্তিমত্তাকে বিবেচনায় নেয়নি। ইরানের রাহবার (সর্বোচ্চ নেতা) আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি এ তৎপরতাকে তেলআবিবের জন্য মারাত্মক ভুল হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ জন্য ইসরাইলকে চড়া মূল্য দিতে হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।
নয়া দিগন্ত : যুদ্ধের শুরুতেই ইরানের কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা ও পরমাণুবিজ্ঞানী নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করেন। এসব ঘটনাকে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে?
মোহাম্মদ নওরোজি : ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়নি। এর আগে হুমকি দেয়া হয়েছে। এ হুমকিই ইরান গুরুত্বের সাথে নেয়নি বলা যাবে না। গুরুত্বের সাথেই নিয়েছে। যুদ্ধের সময় মুশকিল দেখা দিতেই পারে। ইসরাইলি হামলার প্রথম দিকে ইরানের বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা চট করে সক্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এ অবস্থা সামলে নেয়া হয়; অর্থাৎ শুক্রবারে দুপুরের পর থেকে ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলোকে লক্ষ্য করে বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলা শুরু হতে থাকে। ইরান একই সাথে প্রতিরক্ষার ঢেউকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। এই ঢেউকে ইসরাইলের ওপর হামলার বা চড়াও হওয়ার ঢেউয়ে পরিণত করেছে।
নয়া দিগন্ত : জি। কিন্তু যুদ্ধের শুরুতেই সেরা সেরা শীর্ষ সেনাকর্মকর্তাদের শাহাদতের ঘটনা ঘটানো কিভাবে সম্ভব হলো?
মোহাম্মদ নওরোজি : যুদ্ধের শুরুতেই যেসব ঘটনা ঘটেছে তা অনাকাক্সিক্ষত। ইসরাইলের হামলা ছিল কাপুরুষোচিত। ইসলামী বিপ্লবী রক্ষী বাহিনীর কর্মকর্তা এবং পরমাণুবিজ্ঞানীদের আবাসিক ভবনে হামলা করেছে ইহুদিবাদী ইসরাইল। ইসলামী বিপ্লবী রক্ষী বাহিনী বা পরমাণুবিজ্ঞানীদের ওপর হামলার পাশাপাশি সাধারণ বেসামরিক ইরানিদের ওপরও হামলা করা হয়েছে এবং তারা শহীদ হয়েছেন। তাদের ওপর ইসরাইল কাপুরুষোচিত হামলা করেছে। ইহুদিবাদী গোষ্ঠীটি আগে থেকেই এ ধরনের হামলার নীলনকশা এঁকে ছিল। সব মিলিয়ে যেসব ঘটনা ঘটেছে তা সত্যিই ন্যক্কারজনক, খারাপ এবং মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়। একটি দেশ বা সেনাবাহিনীর জন্য এ ধরনের ঘটনা সত্যিই খুব কঠিন। কিন্তু ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের সেনাবাহিনী কালবিলম্ব না করে নেতৃত্বের শূন্যস্থান পূরণ করেছে। ফলে বিপ্লবী বাহিনী বা ইরানের সশস্ত্রবাহিনীর জন্য কোনো রকম সমস্যা দেখা দেয়নি। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা শহীদ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হাতে তুলে নিয়েছেন। ইসলামী প্রজাতন্ত্র, বিপ্লবী বাহিনী বা ইরানের সশস্ত্রবাহিনীর কোনো ক্ষয়ক্ষতি হতে দেয়নি। তাদের সামনে যে দায়িত্ব এসেছে, তা দ্রুত পালন করেছেন। ইসরাইলে পাল্টা হামলা দ্রুততার সাথে শুরু করেছেন তারা। শাহাদতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শহীদ সেনানায়কদের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব হাতে তুলে নিয়ে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।
নয়া দিগন্ত : এসব শাহাদতের ঘটনা ইরানে কী ধরনের প্রভাব ফেলেছে?
মোহাম্মদ নওরোজি : দুনিয়ার দৃষ্টিতে এসব শাহাদতের ঘটনাবলি ইরান বা ইরানি বাহিনীর ওপর কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া তো ফেলেনি, বরং ভালো প্রভাবের সৃষ্টি করেছে। তারা বিপদ ভালোভাবে বুঝতে পেরেছে। সামরিক বাহিনীর অবদান অনুধাবন করতে পেরেছে।
নয়া দিগন্ত : মানে তাদের এই আত্মত্যাগের মাধ্যমে ইরানের জনগণ জেগে উঠেছে?
মোহাম্মদ নওরোজি : ঠিক তা না। ইরানের জনগণের জানা আছে যে শত্রু কখনোই ইরানের জন্য কল্যাণ কামনা করে না। আসলে আমেরিকার সাথে ইরান আলোচনায় ছিল। আমেরিকানরা নিজেরাই বলেছে যে এই আলোচনার সুফল পাওয়া যাবে। খুবই ভালো ফলাফল হবে। আর এই আলোচনার মধ্যেই আমেরিকা ও ইসরাইলের তৎপরতা আমরা দেখতে পাই। ইসরাইলের হামলা দেখতে পাই। ইহুদিবাদী ইসরাইলকে সব দিক থেকে আমেরিকা মদদ দিয়ে চলেছে তাও দেখতে পাচ্ছি। ইরান বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছে যে আমেরিকা আলোচনায় আগ্রহী নয়। বন্দুক বা কামানের নল দিয়ে ইরানের কাজ তারা শেষ করতে এবং তাদের মতলব হাসিল করতে ইচ্ছুক। ইরান এই আলোচনার মাধ্যমে নিজের শুভ উদ্দেশ্যের পরিচয় দিয়েছে। একই সাথে রক্তিম রেখা অতিক্রম না করার বিষয়ও পরিষ্কার করেছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ হলো ইরানের লাল রেখা। এই রেখা ইরান অতিক্রম করবে না। এ বাবদ ইরান কোনো রকম হীনতার আশ্রয় নেয়নি।
নয়া দিগন্ত : যুদ্ধে আমেরিকা ঠিক কী করেছে?
মোহাম্মদ নওরোজি : আমেরিকা ও ইসরাইল ইরানের ব্যাপারে কাজ ভাগ করে নিয়েছিল। আলোচনার মাধ্যমে ইরানকে ব্যস্ত রাখবে আমেরিকা, অন্য দিকে সামরিক হামলার মতো কাজটি করবে ইসরাইল। পশ্চিমাদের সংবাদমাধ্যম পর্যন্ত এ কথা এখন বলাবলি করছে। ইরানের ভেতরে গুপ্ত ড্রোন ঘাঁটি গড়ে হামলা করেছে বলে নেতানিয়াহু যে দাবি করেছে, তা নির্জলা মিথ্যা।
নয়া দিগন্ত : এই যুদ্ধ কত দিন চলতে পারে?
মোহাম্মদ নওরোজি : গত রাতে ইসরাইলের ওপর ইরান যে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে, তা দেখে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমও বিস্মিত হয়েছে। গাজার যুদ্ধে, লেবাননের যুদ্ধে বা ইয়েমেন থেকে ক্ষেপণাস্ত্রের হামলায় এমন ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতির মুখে ইসরাইল পড়েনি। ইসারাইলের কেন্দ্রীয় জ্বালানি ঘাঁটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কেন্দ্র, তেল শোধনাগার, পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র সবই ইরানের হামলার মুখে পড়েছে। এসব হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিশেষ করে সামরিক কৌশলগত কেন্দ্রে হামলায় দুই শতাধিক নিহত হয়েছে। মনে করা হচ্ছে নিহতরা প্রায় সবাই ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সদস্য। তারা ইরানের ওপর হামলার দিকনির্দেশনায় ব্যস্ত ছিল। এর মধ্য অন্তত ৩৫-৪০ জন এখনো নিখোঁজ রয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে যুদ্ধ বিরতি হতে পারে। তবে যুদ্ধ বিরতি হলেই তা ইরান মানবে না। ইরানের শর্ত মেনে নেয়া হলেই যুদ্ধ বিরতি গ্রহণ করবে ইরান। লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত এই যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা ইরানের পুরোপুরি রয়েছে।
নয়া দিগন্ত : যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের পরিস্থিতি কী রকম হয়েছে?
মোহাম্মদ নওরোজি : ইসরাইলিদের শুরু করা যুদ্ধ ইরানের জনজীবনের স্বাভাবিকতার কোনো ছন্দ পতন ঘটায়নি। কখনো পানি বা বিদ্যুৎ বন্ধ হয়নি। অন্য দিকে ইসরাইলের ভেতরে চিত্র ভিন্ন। বিভিন্ন শহরে মানুষ আশ্রয়কেন্দ্র ছুটতে বাধ্য হয়েছে। জীবন গতিহীন হয়ে পড়েছে। ইসরাইলের মানুষ শহর থেকে পালিয়ে গেছে। ইরানে গতকাল বিশাল শোভাযাত্রা হয়েছে। তেহরানে ময়দানে ইমাম হোসেন থেকে ময়দানে আজাদি পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার শোভাযাত্রা করেছে লাখো লাখো মানুষ। শোভাযাত্রায় এত মানুষ হয়েছে ঠিকমতো হাঁটাও কষ্টকর ছিল। ইরানে নিত্যপণ্য কিনে মজুদ করার প্রবণতা নেই। অফিস আদালত স্বাভাবিকভাবেই চলছে। স্কুল কোথাও কোথাও বন্ধ রয়েছে। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে।
শহীদ জেনারেল সোলাইমানির বক্তব্য দিয়ে এ সাক্ষাৎকার শেষ করেন তিনি। সোলাইমানি বলেছেন, ‘যুদ্ধ ওরা শুরু করতেই পারে, তবে তা শেষ হবে ইরানের ইচ্ছায়।’