ইরান নিয়ে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টায় রাশিয়া

রাশিয়া বৈশ্বিক সঙ্ঘাত চায় না : মেদভেদেভ

Printed Edition

রয়টার্স

ইরান ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজনা কমিয়ে আনতে রাশিয়া এখনো চেষ্টা করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে ক্রেমলিন। তেহরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রক্রিয়াজাত কিংবা সংরক্ষণের দায়িত্ব নিতে রাশিয়া অনেক আগে থেকেই প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে বলেও জানিয়েছে তারা।

ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মস্কোর নিয়ন্ত্রণে নেয়ার বিষয়টি নিয়ে রাশিয়া তেহরান ও ওয়াশিংটনের সাথে কথা বলেছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে গতকাল সোমবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেছেন, “দীর্ঘদিন ধরেই এই এজেন্ডা আলোচনায় রয়েছে। অনেক দেশের গাত্রদাহ কমানোর সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে রাশিয়া অনেক দিন ধরেই এ দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব দিয়ে আসছে।

ইরানের ওপর কোনো হামলা হলে তা আঞ্চলিক সঙ্ঘাতে রূপ নেবে বলে শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সতর্ক করার পর ক্রেমলিনের এ ভাষ্য এলো। খামেনি বলেছেন, “আমেরিকানদের জানা উচিত, তারা যদি যুদ্ধ শুরু করে, তবে এবার তা হবে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধ।”

এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান ‘গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায়’ রয়েছে এবং তা ‘গ্রহণযোগ্য’ ফল বয়ে আনবে বলে তিনি আশাবাদী। অন্য দিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি সিএনএনকে বলেছেন, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব বলে তিনি ‘আত্মবিশ্বাসী’।

তা ছাড়া ক্রেমলিনের ঊর্ধ্বতন নিরাপত্তা কর্মকর্তা দিমিত্রি মেদভেদেভ বলেছেন, বিশ্ব ক্রমেই খুবই বিপজ্জনক হয়ে উঠলেও রাশিয়া কোনো বৈশ্বিক সঙ্ঘাত চাইছে না। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ ও একে কেন্দ্র করে যা চলছে, তাকে স্নায়ুযুদ্ধের টানটান উত্তেজনা পরবর্তী সময়ে মস্কো ও পশ্চিমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সঙ্ঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূতরা এখন পারমাণবিক শক্তিধর রাশিয়া ও তার প্রতিবেশীর মধ্যে সঙ্ঘাত অবসানে জোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের ডেপুটি চেয়ারম্যান মেদভেদেভ এজন্য ট্রাম্পের প্রশংসাও করেছেন এবং বলেছেন, ওয়াশিংটনের সাথে যে ফের যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে তা অনুপ্রেরণাদায়ক। রাশিয়ার এ নিরাপত্তা পরিষদ অনেকটা আধুনিককালের পলিটব্যুরোর মতো যেখানে দেশটির সবচেয়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তারা বসেন।

কিয়েভ ও বিভিন্ন পশ্চিমা শক্তির দিকে নিয়মিত আক্রমণাত্মক বক্তব্য ছোঁড়া, যুদ্ধের উত্তেজনা পারমাণবিক ‘প্রলয়ের’ দিকে নিয়ে যেতে পারে বলে সতর্ক করা মেদভেদেভের অভিযোগ, পশ্চিমারা বারবারই রাশিয়ার স্বার্থকে উপেক্ষা করেছে। “পরিস্থিতি খুবই বিপজ্জনক। সহ্যক্ষমতা ক্রমেই কমছে বলেই মনে হচ্ছে। আমরা বৈশ্বিক সঙ্ঘাতে আগ্রহী নই। আমরা পাগল নই। কিন্তু বৈশ্বিক সঙ্ঘাত উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না,” মস্কোতে নিজের বাসভবনে বার্তা সংস্থা রয়টার্স, তাস ও রুশ ব্লগাল ওয়ারগনজোকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এমনটাই বলেছেন ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করা মেদভেদেভ।

রাশিয়ার নীতির ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনই সাধারণত শেষ কথা বলে থাকেন। তারপরও মেদভেদেভের কথা থেকে রুশ প্রভাবশালী অভিজাতদের মধ্যে কট্টরপন্থি অংশ কী ভাবছে তার আন্দাজ পাওয়া যায় বলে মত অনেক কূটনীতিকের। মেদভেদেভ যেখানে সাক্ষাৎকারে দিয়েছেন, সেখানে ঝোলা এক কার্টুনে সাবেক এ রুশ প্রেসিডেন্টকে ইউরোপীয় নেতাদের দিকে সাবমেশিনগান ধরে থাকতে দেখা গেছে। কড়া কড়া কথা আর হুমকি দেয়ার ক্ষেত্রে সুপরিচিত এ সাবেক আইনজীবী পুতিনের শহর সেন্ট পিটার্সবার্গেই বেড়ে উঠেছেন।

পুতিন ও ট্রাম্প বারবারই ইউক্রেন যুদ্ধ বিস্তৃত অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে এমন আশঙ্কার কথা বলেছেন। তবে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ধারণা, মস্কো খুবই দক্ষতার সাথে এই ‘উত্তেজনা ছড়ানোর আশঙ্কার’ কার্ড খেলে ইউক্রেনের মিত্রদেরকে যুদ্ধে খুব বেশি সক্রিয় হওয়া থেকে বিরত রেখেছে।

“তারা বলে ‘না, রাশিয়া সব বানিয়ে বানিয়ে বলছে, তারা মিথ্যা ভয়ের গল্প শোনাচ্ছে, তারা কিছুই করবে না’। কিন্তু রাশিয়া যে তার নিজের স্বার্থের জন্য রুখে দাঁড়াতে পারে ইউক্রেইনে বিশেষ সামরিক অভিযানই তা দেখাচ্ছে,” বলেছেন মেদভেদেভ।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের দেখা সবচেয়ে প্রাণঘাতী এ যুদ্ধের জন্য কিইভ ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা মস্কোকেই দায়ী করছে। তাদের ভাষ্য, রাশিয়া সাম্রাজ্যবাদী কায়দায় ইউক্রেইনের ভূখণ্ড দখলে মত্ত। আর যদি রাশিয়া ইউক্রেইনে জয় পায়, তাহলে এক দিন তারা নেটোকেও আক্রমণ করে বসবে। মস্কো এসব অভিযোগকে ‘অযৌক্তিক’ আখ্যা দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। ২০১৪ সালে ইউক্রেনে ময়দান বিপ্লবে রুশপন্থী এক প্রেসিডেন্ট ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মস্কো ও কিইভের মধ্যে সঙ্ঘাতের সূচনা হয়। রাশিয়া ওই বছরই ক্রাইমিয়া উপদ্বীপ দখল করে নেয়। এরপর ইউক্রেইনের পূর্বাঞ্চলে মস্কো সমর্থিত বিদ্রোহীদের সাথে কিইভের সশস্ত্রবাহিনীর কয়েক বছরের লড়াই শুরু হয়। ২০২২ সালে রাশিয়া ওই বিদ্রোহীদের সমর্থন জানিয়ে ইউক্রেনে পূর্ণাঙ্গ সামরিক অভিযানে নামে।

সাক্ষাৎকারে মেদভেদেভকে জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলা, গ্রিনল্যান্ড ও বিশ্বের অন্যান্য জায়গায় যেসব উত্তেজনা হয়েছে সেসব বিষয়ে বলতে বলা হলে তিনি বলেন, এগুলো ‘বাড়াবাড়ি’ হয়েছে। রাশিয়ার মিত্র হিসেবে পরিচিত ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যদি একইরকম উপায়ে কোনো বিদেশি শক্তি ট্রাম্পকে ‘তুলে নিয়ে যেত’ তাহলে যুক্তরাষ্ট্র একে ‘যুদ্ধ ঘোষণা’ হিসেবেই দেখত। রাশিয়া ও চীন গ্রিনল্যান্ডের জন্য হুমকি বলে পশ্চিমারা যা প্রচার করছে তাকে ‘ভুতুড়ে গালগল্প’ বলেও অভিহিত করেছেন মেদভেদেভ। পশ্চিমা নেতারা নিজেদের কর্মকাণ্ডকে জায়েজ করতে এসব করছে, বলেছেন তিনি।