সিলেট বিভাগে শিক্ষার উন্নয়নে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান

শিক্ষামন্ত্রীর সাথে মতবিনিময় সভায় এন্তার অভিযোগ

Printed Edition
3rd-2
শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সিলেট শিক্ষা বোর্ড এবং সিলেট অঞ্চলের মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কেন্দ্র সচিবদের সাথে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন : পিআইডি

শাহেদ মতিউর রহমান সিলেট ঘুরে এসে

উপজেলায় প্রতিষ্ঠা হচ্ছে মাল্টিপারপাস পরীক্ষা কেন্দ্র

শিক্ষক সঙ্কটের পাশাপাশি শিক্ষা খাতে অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে শিক্ষা বিস্তারে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে পুরো সিলেট বিভাগ। গত কয়েক বছরের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতির হারও অনেক বেড়েছে। বিশেষ করে মেয়েদের থেকে ছেলেদের ঝরে পড়ার হারও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল বুধবার সকালে সিলেটের জালালাবাদ গ্যাস অডিটোরিয়ামে আয়োজিত আসন্ন এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার কেন্দ্র সচিবদের নিয়ে মতবিনিময় সভায় সিলেটের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, বর্তমান মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, শিক্ষক প্রতিনিধি, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা সবাই শিক্ষামন্ত্রীর উপস্থিতিতে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন এবং বিদ্যমান সমস্যা সমাধানেও আশু পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান। পরে মন্ত্রী তার বক্তব্যে সরকারের নেয়া বেশ কিছু শিক্ষা সংস্কারের পদক্ষেপের বিষয়ে আশ্বস্ত করেন।

গতকাল সিলেটের এ সভাটি মূলত আয়োজন করা হয়েছিল আসন্ন এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা আয়োজনের প্রস্তুতি গ্রহণের সার্বিক বিষয়ে নিয়ে। সভায় আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে অংশ নেয়া মোট সাড়ে ৮৯ হাজার পরীক্ষা কেন্দ্রের কেন্দ্র সচিব ও সমমানের পরীক্ষা আয়োজনের সাথে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। শিক্ষামন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সকাল থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ও সিলেটের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী এবং বিএনপির সংসদ সদস্যরা। সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো: আনোয়ার হোসেন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য রাখেন সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমেদ চৌধুরী, সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ কয়ছর আহমেদ, সিলেট জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোভিসি ড. এ এম সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিঞা মো: নুরুল হক, কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো: রুহুল আমিন, সিলেট মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েল লোদী এবং সাধারণ সম্পাদক এমদাদ হোসেন চৌধুরী।

আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, সিলেটে প্রাথমিকের ৮৫০টি প্রধান শিক্ষকের পদের সবগুলোই শন্য। ভারপ্রাপ্ত দিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান চালানো হচ্ছে। এ ছাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৫০টি প্রধান শিক্ষকের পদ খালি থাকলেও এগুলোও পূরণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। জেলাপর্যায়ে শিক্ষা কর্মকর্তার পদ আছে ৪০টির মধ্যে ২৯টি পদই শূন্য। অন্য দিকে উপজেলাপর্যায়ে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদ আছে মোট ৪০টি। এগুলোর মধ্যে অনেক পদ ফাঁকা রয়েছে। এ ছাড়া শুধু নামেই মাত্র সিলেটের আলিয়া মাদরাসা রয়েছে, এখানে অনেক পদ খালি। সিলেটে দীর্ঘ দিনের একটি দাবি ছিল সিলেট প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালু করার। সেই উদ্যোগও এখন আর নেয়া হচ্ছে না। তিনি ওই বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানান।

সিলেট জেলা প্রশাসক মো: সারওয়ার আলম বলেন, গত কয়েক বছরের এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফল তুলনা করলে দেখা যায় সিলেট বোর্ডে শিক্ষার্থীরা আইসিটি এবং ইংরেজিতে ফেল করছে বেশি। এর কারণও আমরা বের করেছি। স্কুল ও কলেজের শিক্ষকদের অনেকে জানিয়েছেন এ দু’টি বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের সঙ্কটের কারণেই মূলত শিক্ষার্থীদের রেজাল্ট খারাপ হচ্ছে। তাই শিক্ষক সঙ্কট সমাধানে দ্রুত উদ্যোগ নেয়া জরুরি।

সিলেট শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মো: আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, সিলেটে প্রাথমিক থেকে শুরু করে এসএসসি পর্যন্ত সব পর্যায়েই ড্রপআইটের হার বেশি। তিনি উল্লেখ করেন, আসন্ন এসএসসি পরীক্ষায় সিলেট বোর্ডে ২২৫ কেন্দ্রে মোট ৮৯ হাজার ৪২১ জন পরীক্ষার্থী অংশ নেবে।

শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, আমরা চেষ্টা করছি আগামী বাজেটে জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ রাখব। এ ছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষকের পদ পূরণের জন্য যে মামলা জটিলতা রয়েছে, সেখানে একটি সুরাহা হবে এবং এসব পদে নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ করা যাবে। এ ছাড়া মাধ্যমিকে ও উচ্চ মাধ্যমিকের পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান প্রধান এবং সহ প্রধান পদেও এনটিআরসিএর মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হবে। তিনি আরো জানান, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের উন্নয়ন কাজের জন্য যে ১৮টি স্কুল ভাঙা পড়বে, সেখানে এসব স্কুলের জন্য কেউ জায়গা দিলে তার নামেই নতুন স্কুলের নামকরণ করা হবে।

শিক্ষামন্ত্রী বলে সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ২২৫টি, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৫২টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৩৪টি কেন্দ্রে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় যাতে নিয়মিত শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত না হয়, সে জন্য দেশের প্রতিটি উপজেলায় একটি করে আধুনিক ‘মাল্টিপারপাস পরীক্ষা কেন্দ্র’ নির্মাণ করবে সরকার। তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান পরীক্ষা পদ্ধতির কারণে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে মূল্যবান দু’টি বছর ঝরে যাচ্ছে, যা ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড অর্জনে বড় বাধা। তিনি বলেন, আমরা শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং শিক্ষার গুণগত মান ও সংস্কারে গুরুত্ব দিচ্ছি। প্রতিটি ক্লাসরুমে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে, যাতে পাঠদানের মান নিশ্চিত করা যায়। আমি সংসদ সদস্যদের অনুরোধ করব, আপনারা নিজ নিজ এলাকার স্কুলের সিসি ক্যামেরা কোড নিয়ে স্মার্টফোনের মাধ্যমেই তদারকি করুন। এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নিয়ে একটি ‘পুল’ গঠন করা হচ্ছে, শিক্ষক সঙ্কট থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদেরকে পার্ট টাইম শিক্ষক হিসেবে কাজে লাগানো হবে।