নিউ ইয়র্ক মাতিয়ে ফেলছে ইকুয়েডরিয়ানরা
Printed Edition
ক্রীড়া প্রতিবেদক, নিউ ইয়র্ক থেকে
প্রথম ম্যাচেই আইভোরি কোস্টের কাছে হার। এরপর এবারের বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটা কুরাসাওয়ের সাথে ড্র করা। এতে একেবারেই অনিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল ইকুয়েডরের নক আউট পর্বে উঠাটা। পরের ম্যাচের প্রতিপক্ষ শক্তিশালী এবং চারবারের বিশ্বকাপ জয়ী জার্মানি। যাদের বিপক্ষে জয়ের আশা করাটা অনেক বেশি দুঃসাহসের বিষয়। অথচ এই কাজটিই করে ছেড়েছে ইকুয়েডর। নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সির ম্যাট লাইফ স্টেডিয়ামে হারিয়ে দিয়েছে জার্মানিকে। ল্যাটিন আমেরিকান দেশটিকে এই ২-১ গোলের জয়েই ‘এ’ গ্রুপের তৃতীয় দল হিসেবে নিয়ে গেছে নক আউটে। আর এই জয়ের পর পুরো নিউ ইয়র্ক মাতিয়ে রেখেছে ইকুয়েডোরিয়ানরা।
দুই যুগ ধরে ল্যাটিন আমেরিকান ফুটবলের অন্যতম শক্তি এই ইকুয়েডর। আমরা ইকুয়েডর বললেও দেশটির লোকদের মুখে এটি ‘ইকুয়াদর’। ২৫ জুন ম্যাট লাইফ স্টেডিয়ামে রেফারির শেষের বাঁশি বাজানোর সাথে সাথেই গ্যালারিতে উল্লাস ইকুয়েডরের সমর্থকদের। তাদের মাতামাতি শুরু হয় সমতাসূচক গোলের পর থেকেই। ২ মিনিটে জার্মানির লেরয় সানে গোল করার পর ৯ মিনিটে নেলসন এনগুরো ম্যাচে ফেরান ইকুয়েডরকে। এরপর গনজালো প্লাটা যখন ৭৭ মিনিটে লিড এনে দিলেন, তখন থেকে আর থামানো যাচ্ছিল না তাদের। তখন শুরু হয় তাদের কখন শেষ হবে খেলার সময় গননা। যখন শেষবারের মতো রেফারি বাঁশিতে ফুক দিলেন, তখন মাঠে বাঁধভাঙ্গা উল্লাস ইকুয়েডরের ফুটবলারদের। আর গ্যালারিতে হলদে রঙের জার্সি গায়ে দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর পশ্চিম অংশের প্রশান্ত মহাসাগরের পাড়ের দর্শকদের মাতামাতি। ‘ভামো ইকুয়াদর’ বলে চলতে থাকে তাদের সেøাগান। সাথে স্প্যানিশ ভাষায় অন্য সেøাগানও।
একে তো এই জয় তাদের নিয়ে গেছে নক আউটে। সেই সাথে প্রথমবারের মতো জার্মানিকে হারানো। তা বিশ্বকাপে। তাই বারবারই তারা বলছিল একটি কথা, ‘আমরা চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নকে হারিয়েছি।’ ৭০ বছর বয়সী অ্যাঞ্জেলিনা এবং তার ৮০ বছর বয়সী স্বামী এডোয়ার্ডো। দু’জনই ইকুয়েডর থেকে এসেছেন নিউ ইয়র্কে। এডোয়ার্ডো হাঁটতে পারেন না। হুইল চেয়ারে বসেই খেলা দেখতে গেছেন। তাদের মেয়ে নিউ ইয়র্কে থাকে। মেয়েটির বন্ধু ভারতীয়। এডোয়ার্ডো এবং অ্যাঞ্জেলিনা জানান, ‘এটিই আমাদের জীবনে প্রথম বিশ্বকাপ দেখা। আর সেই ম্যাচে ইকুয়াদর (ইকুয়েডর) চারবারের বিশ্বকাপ জয়ী জার্মানিকে হারিয়েছে। তা প্রথমবারের মতো। অবশ্যই আমার জীবনের সেরা মুহূর্ত এটি।’
গুয়াতেমালার দম্পতি মার্গারেটা ও আলভারো। তাদের গায়ে ইকুয়েডরের জার্সি। প্রথমে তাদের ইকুয়েডরিয়ার ভেবে ভুলই করেছিলাম। এরপর নিজ থেকেই তারা জানান, ‘আমরা গুয়াতেমালার নাগরিক। কিন্তু যেহেতু ল্যাটিন দেশ খেলছে তাই আমরা আঞ্চলিকতা এবং স্প্যানিশ ভাষাভাষির কারণে ইকুয়েডরকে সমর্থন করেছি। দারুণ লাগছে যে ইকুয়েডর হারিয়ে দিয়েছে হট ফেবারটি এবং চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন জার্মানিকে। এগিয়ে যায় ইকুয়াদর।’
স্টেডিয়ামের উল্লাস পর্ব শেষ করে যখন নিউ ইয়র্ক শহরে আসা তখন দর্শকদের বহনকারী ট্রেনে ইকুয়েডরের লোকদের ‘ভামো ইকুয়াদর’ বলে বলে সেøাগান। সাথে মাতামাতি। তাদের সাথেই একই ট্রেনে ফিরছিল জার্মানির সমর্থকরা। দল হেরে যাওয়ায় তারা মাথানত করেই বসেছিল। কয়েকজন মাথা উঁচু করে দেখছিল প্রতিপক্ষ দেশের ফুটবলপ্রেমীদের আনন্দঘন মুহূর্ত।
নিউ ইয়র্কের প্যান স্টেশনে ট্রেন থেকে নেমে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে ইকুয়েডরের লোকদের উল্লাসের ধরণটা। এবার তাদের সাথে যোগ দিতে দেখা গেল মার্কিন পুলিশকে। তিনি অবশ্য তাদের সাথে সরাসরি যোগ দেননি। পাশে থেকেই মুখে দুই হাত রেখে চিৎকার দিয়ে দিয়ে ভামো ইকুয়াদর বলে যাচ্ছিলেন। গতকালও দেখা গেল ইকুয়েডর জাতীয় দলের জার্সি গায়ে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে তাদের সমর্থকরা। আর একটু পরপরই বলছে ‘ভামো ইকুয়াদর।’
জার্মানদের বিপক্ষে ইকুয়েডরের এটি প্রথম জয় হলেও অন্য বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষেও তাদের জয়ের কৃতিত্ব আছে। গত বছরই বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে তারা ১-০ গোলে হারিয়েছিল তিনবারের বিশ্বকাপ জয়ী আর্জেন্টিনাকে। এ বছর মার্চ মাসে তারা প্রীতি ম্যাচে ড্র করেছিল নেদারল্যান্ডস, মরক্কোর সাথে। পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে হারিয়েছিল ২০০১ ও ২০০৪ সালে। গত বছর বিশ্বকাপ বাছাই পর্বেও করেছিল ড্র। ব্রাজিলের সাথে সর্বশেষ চার ম্যাচের তিনটিতে ড্র করেছে তারা। হার অপরটিতে। দুইবারের বিশ্বকাপ জয়ী উরুগুয়েকে ২০১৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত চারবার হারের লজ্জা দিয়েছে। দুই দলের সর্বশেষ মোকাবেলাতেও অপরাজিত ইকুয়েডর। সুতরাং ইকুয়েডরের এই জয় মোটেই চমক নয়। এই জয় তাদের ২০০৬ সালের পর ফের নিয়ে গেছে নক আউটে।
অবশ্য এই জয়গুলো ছাড়া বড় আর কোনো অর্জনই নেই তাদের। ভেনেজুয়েলার মতো তারাও এখন পর্যন্ত কোপা আমেরিকায় চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি।
আরেকটি বিষয়। ভাগ্যটা ভালো জার্মানির। তারা গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে হেরেছে ইকুয়েডরের কাছে। এই হারটা আরো আগে হলে হয়তো গত দুই বিশ্বকাপের মতো প্রথম পর্ব থেকেই ছিটকে পড়তে হতো। এবার অবশ্য প্রথম দুই ম্যাচ জিতেই নক আউট নিশ্চিত করেছে জার্মানরা।