নির্বাচন নিয়ে একটি দল ষড়যন্ত্র করছে
খুলনার জনসভায় তারেক রহমান
Printed Edition
খুলনা ব্যুরো ও যশোর অফিস
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একমাত্র বিএনপি আগামী দিনে সরকার গঠন করলে তার প্রথম দায়িত্ব হবে দেশ পুনর্গঠন। বিএনপির পক্ষেই সম্ভব দেশকে সঠিক পথে পরিচালনা করা। তিনি বলেন, নির্বাচন নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। একটি দল যারা সব বিষয়ে মিথ্যা কথা বলে তারাই ষড়যন্ত্র করছে। মানুষ তাদের মিথ্যা ধরে ফেলেছে। যেকোনো পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে এবং দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে দেশকে বের করে আনতে হবে। তিনি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সব ভোটারকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেয়ার আহ্বান জানান।
গতকাল সোমবার খুলনার খালিশপুরের প্রভাতী স্কুল মাঠে বিএনপি আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন।
খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম মনার সভাপতিত্বে বেলা ১১টায় সভা শুরু হয়। পৌনে ১টায় বক্তব্য শুরু করে প্রায় আধ ঘণ্টার বক্তৃতায় তারেক রহমান বিএনপির আগামীর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি প্রতিপক্ষের তৎপরতায় নানা আশঙ্কার কথাও তুলে ধরেন। সভায় খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার ১৪টি আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন তিনি।
বিএনপির চেয়ারম্যান দীর্ঘ এক যুগ ভোট দিতে না পারার কথা স্মরণ করিয়ে বলেন, কেউ যাতে সে অধিকার কেড়ে নিতে না পারে সেজন্য সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নির্বাচন সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক দলের নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, একটি দল প্রকাশ্যে নারীর নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না বলেছে। সম্প্রতি ওই দলের নেতা কর্মসংস্থানে নিয়োজিত মা-বোনদের উদ্দেশে এমন কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা বলতেও লজ্জা লাগে। এটি পুরো দেশের জন্যই কলঙ্ক। তিনি বলেন, ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে ওই রাজনৈতিক দল আইডি হ্যাক হওয়ার অজুহাত দিয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা পরিষ্কারভাবে জানিয়েছেন, এভাবে আইডি হ্যাক হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, যারা নারীদের অসম্মান করে, যারা মিথ্যার আশ্রয় নেয় এবং যারা জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে, তারা কখনো দেশপ্রেমিক বা জনদরদি হতে পারে না।
তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। এর মধ্যে অন্তত ১০ কোটি নারী। এই বিশাল নারীসমাজকে পেছনে রেখে যত বড় পরিকল্পনাই করা হোক না কেন, দেশকে সামনে নেয়া সম্ভব নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে স্কুল থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে তারা শিক্ষিত হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের লক্ষাধিক নারী পোশাকশিল্পে কাজ করে দেশের অর্থনীতি সচল রেখেছেন। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতে স্বামীর পাশাপাশি কাজ করছেন। অথচ তাদেরই আজ অপমান করা হচ্ছে।
তারেক রহমান আরো বলেন, আগামী ১২ তারিখের সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে আজ বিএনপি ও ধানের শীষের এই জনসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিগত ১৫-১৬ বছরে বিএনপি বহু আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছে। এই সময়ে দলের অসংখ্য নেতাকর্মী গুম, খুন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। হাজার হাজার, লাখো নেতাকর্মী বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা গায়েবি মামলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ টানা ১৬ বছর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, এমনকি স্থানীয় নির্বাচনেও জনগণ তাদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেনি। এই দীর্ঘ সময়ে মানুষ তাদের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারেননি। কেউ কথা বলার চেষ্টা করলে তাকে রাতের আঁধারে তুলে নেয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে কিংবা খুন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে দল-মত নির্বিশেষে দেশের মানুষ রাজপথে নেমে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে। আজ সময় এসেছে অধিকার আদায়ের। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের মানুষ সেই অধিকার প্রয়োগ করবে।
বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেয়ার ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে, যাতে তারা কারো মুখাপেক্ষী হয়ে না থাকে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক সময়ের শিল্পনগরী খুলনা মৃতপ্রায়। বিএনপি সরকার গঠন করলে এই অঞ্চলকে আবার জীবন্ত শিল্পনগরীতে রূপান্তর করা হবে, নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। তরুণ সমাজের জন্য আইটি পার্ক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলা হবে। কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড চালু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে ঋণ, সার, বীজ ও কীটনাশক সহজে পাওয়া যাবে। বর্তমানে যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে।
নির্বাচনী জনসভায় আরো বক্তব্য রাখেন বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক ও খুলনা-৩ আসনের প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল, খুলনা-২ আসনে প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু, বিএনপির তথ্যবিষয়ক সম্পাদক ও খুলনা-৪ আসনে প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল, বিএনপির মহানগর শাখার সাবেক আহবায়ক ও খুলনা-৫ আসনে প্রার্থী আলী আসগার লবি, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, কৃষিবিদ শামীমুর রহমান শামীম, যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না, বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুন্ডু, সাবেক এমপি নেওয়াজ হালিমা আরলি, কেসিসির সাবেক মেয়র মনিরুজ্জামান মনি, খুলনা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু, খুলনা-১ আসনের প্রার্থী আমির এজাজ খান, জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব ও খুলনা-৬ আসনে প্রার্থী এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী, সাতক্ষীরার তিন প্রার্থী কাজী আলাউদ্দিন, আব্দুর রউফ ও ডা: মনিরুজ্জামান, বাগেরহাটের চার প্রার্থী লায়ন ফরিদুল ইসলাম, সোমনাথ দে, ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ও কপিল কৃষ্ণ মন্ডল।
‘ভোট গণনায় সময়ক্ষেপণ করে সুযোগ নিতে চাইলে প্রতিহত করা হবে’
যশোর অফিস জানায়, ভোট গণনার নামে কেউ অহেতুক সময়ক্ষেপণ করে যদি কোনো সুযোগ নিতে চায় তাহলে তাদেরকে প্রতিহত করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের খননকৃত যশোরের উলাসী খালসহ এ অঞ্চলের খাল-বিল পুনঃখনন এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে জিকে প্রকল্প আবার চালু করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে সব প্রকল্প নেয়া হবে মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য। মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন ও অন্য ধর্মের পুরোহিতদের রাষ্ট্র সম্মানী দেবে।
গতকাল সোমবার দুপুরে যশোর উপশহর ডিগ্রি কলেজ মাঠে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এসব কথা বলেন।
উন্নয়নের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার গঠন করলে যশোরের ফুল বিদেশে রফতানির উদ্যোগ নেয়া হবে। জনসভায় বক্তৃতার মধ্যে যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চলের সাত জেলার ২২টি আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থীদের হাতে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দিয়ে তাদেরকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান তারেক রহমান।
জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে জনসভায় বক্তৃতা করেন বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমি, ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নিতাই রায় চৌধুরী, অধ্যাপক নার্গিস বেগম, ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক (খুলনা বিভাগ) অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক অমলেন্দু দাস অপু, সহতথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক আমিরুজ্জামান খান শিমুল, কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্যসচিব জাকির হোসেন সরদার, নড়াইল জেলা বিএনপির সভাপতি বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম, মাগুরা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আলী আহমদ, ঝিনাইদহ জেলা বিএনপির সভাপতি এম এ মজিদ, যশোর জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু প্রমুখ। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন জনসভা পরিচালনা করেন।