সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন ঘিরে সরকারি দলে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা

প্রার্থী চূড়ান্তে তোড়জোড় সম্ভাব্যদের শর্ট লিস্ট প্রধানমন্ত্রীর হাতে

Printed Edition

মোহাম্মদ জাফর ইকবাল

আগামী ১২ মে অনুষ্ঠেয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকারি দলের নারী নেত্রীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা যাচ্ছে। এরই মধ্যে গত দু’দিনে সাত শতাধিক ফরম বিক্রি এবং শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। আজ রোববার ফরম কেনা ও জমা দেয়ার শেষ দিন। এ দিকে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করতে তোড়জোড় শুরু করেছে বিএনপি। তবে কিভাবে এই বাছাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে সে বিষয়ে এখনো দলের হাইকমান্ড কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি।

সূত্র মতে, বিএনপি গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটি নির্বাচনে মনোনয়ন চূড়ান্ত করার এখতিয়ার রাখে। যদিও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মাঝে কোনো মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হয়নি। দল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। পরবর্তীতে তৃণমূলের আবেদনের প্রেক্ষিতে কয়েকজন প্রার্থী পরিবর্তনও করেছে। তবে ব্যতিক্রম দেখা যাচ্ছে সংরক্ষিত মহিলা আসনের মনোনয়ন নিয়ে। এখানে চূড়ান্তভাবে মনোনয়ন না দিয়ে আগ্রহীদের কাছ থেকে আবেদন নেয়া হচ্ছে। আজ রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত আগ্রহীরা মনোনয়ন ফরম কেনা এবং জমাও দিতে পারবেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য নয়া দিগন্তকে বলেন, সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনের জন্য দলের পক্ষ থেকে আগ্রহীদের কাছ থেকে আবেদন নেয়া হচ্ছে। ব্যাপক উৎসাহের মধ্য দিয়ে আগ্রহীরা ফরম কিনছেন এবং জমাও দিচ্ছেন। তবে কি প্রক্রিয়ায় এসব ফরম যাছাই বাছাই হবে, তা এখনো ঠিক করা হয়নি। তিনি বলেন, দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে হয়তো এ নিয়ে আলোচনা হবে। আমাদের এ বিষয়ে এখনো কিছু জানানো হয়নি।

আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য জানান, জমা হওয়া আবেদনগুলো যাছাইবাছাই শেষে স্থায়ী কমিটিতে উত্থাপন করা হবে। এই কমিটিকে সম্ভাব্য মনোনয়ন প্রত্যাশীদের একটি শর্ট লিস্ট করতে বলা হবে। এ ক্ষেত্রে গত ১৭ বছরে যারা রাজপথে ছিলেন, যাদের দলে অবদান রয়েছে, যারা সংসদে দল ও দেশের জন্য ভূমিকা রাখতে পারবেন শিক্ষিত এমন সদস্যদেরই অগ্রাধিকার দেয়া হবে।

তবে বিএনপির সিনিয়র একাধিক নেতা জানান, মহিলা আসনে কারা মনোনয়ন পাবেন সেটি দলের চেযারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানই ঠিক করবেন। এরই মধ্যে স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের একটি শর্ট লিস্ট প্রধানমন্ত্রীর কাছে দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে ক্লীন ইমেজ, শিক্ষিত, রাজপথের ভূমিকা, দলের পরিবারের অবস্থান, সংসদে কথা বলার দক্ষতা এসব বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। দলের চেয়ারম্যান এখান থেকে আলোচনার মাধ্যমে যাদের নির্বাচিত করবেন, তারাই সংরক্ষিত মহিলা আসনের জন্য চূড়ান্ত মনোনয়ন পাবেন। তারা জানান, সংরক্ষিত মহিলা আসনে দলের বাইরে জোটের একাধিক সদস্যও মনোনয়ন পাবেন।

গত শুক্রবার ফরম বিক্রি কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী। আগ্রহী প্রার্থীরা আজ ১২ এপ্রিলের মধ্যে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ ও জমা দিতে পারবেন। প্রতিটি ফরমের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে দুই হাজার টাকা এবং জমা দেয়ার সময় জামানত হিসেবে দিতে হবে ৫০ হাজার টাকা।

নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী প্রতি ছয়জন সাধারণ আসনের বিপরীতে একটি করে সংরক্ষিত আসন বণ্টন করা হবে। সেই হিসেবে বিএনপি জোটের ভাগে ৩৬টি আসন পড়ছে বলে নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে। বাকি আসনগুলোর মধ্যে জামায়াত জোট ১৩টি এবং স্বতন্ত্ররা একটি আসন পেতে পারেন। সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন সরাসরি জনগণের ভোটে নয়, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে শুধু সংসদ সদস্যদের ভোটেই নির্বাচিত হবেন প্রার্থীরা।

এ দিকে গতকাল সকালে জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত মহিলা আসনে সরকারি দল বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে ইচ্ছুক প্রার্থীর সংখ্যা ছয় শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে বলে জানান রুহুল কবির রিজভী। যদিও দিন শেষে তা সাত শতাধিকে পৌঁছায়।

কিভাবে এসব আবেদন যাছাইবাছাই হবে এমন প্রশ্নের জবাবে রিজভী বলেন, দলের পক্ষ থেকে ঊর্ধ্বতন নেতারা, সিনিয়র নেতাদের সমন্বয় যে বোর্ড আছে সেখানে তাদের আবেদনটি যাবে এবং কি পদ্ধতিতে এই প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে এটি হয়তো জানা যাবে আজকালের মধ্যেই।

রিজভী বলেন, আমরা প্রত্যাশা করছি যে, গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুযায়ী বরাবরই বিএনপি যেভাবে তার সংসদ সদস্যদের বাছাই করেন ঠিক একইভাবে এবারো সেই পদ্ধতিটি অবলম্বন করা হচ্ছে। অর্থাৎ যারা প্রার্থী হতে ইচ্ছুক তাদের দলের যে মনোনয়ন ফর্ম সেটি আমরা বিতরণ করছি এবং তারা সেটি পূরণ করে যা যা চাওয়া হয়েছে সেই ডকুমেন্টগুলোসহ আমাদের কাছে জমা দিবেন।

মনোনয়ন ফরম বিক্রি বেশি ইঙ্গিত করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব বলেন, এবারের প্রত্যাশা অত্যন্ত বেশি এই কারণেই যে দীর্ঘ ১৬/১৭ বছর এক ভয়ানক দুর্বিষহ পরিস্থিতি অতিক্রম করে আজকের এই জায়গায় উপনীত হয়েছে। একটা অবাধ এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য দীর্ঘ লড়াই করতে হয়েছে। ১৫/১৬ বছরের লড়াইয়ের পর আমরা গণতান্ত্রিক চর্চা রীতিনীতি এবং এটি অনুশীলন করার যে পরিবেশটি পাওয়া গেছে সেটির সর্বোচ্চ ব্যবহার আমাদের করতে হবে।

মনোনয়ন ইচ্ছুক প্রার্থী চূড়ান্তের বিষয়ে রিজভী বলেন, বিগত আন্দোলনে মহিলাদের অনেক অবদান রয়েছে। কেউ যদি ফেসবুকে কোনো স্বাধীন মতামত পেশ করেছেন তাকে গভীর রাতে পুলিশ গ্রেফতার করে নিয়ে গেছে এবং যারা অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন রাজপথে তাদের উপরে চলেছে বর্বরোচিত অত্যাচার, নিপীড়ন নির্যাতন এবং মিথ্যা মামলা দিয়ে নিপীড়ন-নির্যাতনের শেষ ছিল না, অব্যাহত গতিতে নিপীড়ন নির্যাতন তাদের সহ্য করতে হয়েছে। আমি মনে করি দলের আন্দোলন সংগ্রামে যাদের ভূমিকা রয়েছে এবং যাদের দক্ষতা রয়েছে পার্লামেন্টে কথা বলার অত্যন্ত যুক্তি সহকারে এবং সমাজে যাদের অত্যন্ত সুনাম আছে তাদেরই নিশ্চয়ই দল বাছাই করবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সময় কম। দ্রুতই দলীয় প্রক্রিয়াটা আমাদের সম্পন্ন করতে হবে। কারণ চূড়ান্ত তালিকার প্রার্থীদের আবার নির্বাচন কমিশনে গিয়ে তাদের কাজ আছে।

গতকাল শনিবারও নয়া পল্টনের কার্যালয়ে শিক্ষক, আইনজীবী, শিল্পী, ছাত্র দলের সাবেক নেত্রীরাও মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। তাদের মধ্যে আছেন, কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা, বেবী নাজনীন, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি মরহুম শফিউল বারী বাবুর সহধর্মিণী বীথিকা বিনতে হোসাইনসহ সাবেক সংসদ সদস্যরা।

গত বুধবার সকালে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। মনোনয়ন দাখিলের শেষ তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ২১ এপ্রিল। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ২২ ও ২৩ এপ্রিল। বাছাই নিয়ে কোনো আপত্তি থাকলে আপিল করা যাবে ২৬ এপ্রিল, আর সেই আপিল নিষ্পত্তি করা হবে ২৭ ও ২৮ এপ্রিল। চূড়ান্ত প্রার্থীদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে ৩০ এপ্রিল। এরপর ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ মে। নির্বাচন কমিশন বলছে, নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন সম্পন্ন করতে সব ধরনের প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। আসন বণ্টনে বিএনপি জোট ৩৬টি, জামায়াতে ইসলাম জোট ১৩টি, স্বতন্ত্ররা মিলে পাবে একটি আসন।

এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে এসে তোপের মুখে পড়েছেন কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা। শনিবার সকালে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে মনোনয়ন ফরম কেনার সময় তিনি বিএনপি নেত্রীদের তোপের মুখে পড়েন। তবে নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে তিনি তার মনোনয়ন ফরমটি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছেন। মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে আসা বগুড়া জেলা বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় মহিলা দলের নির্বাহী সদস্য সুরাইয়া জেরিন রনি বলেন, কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা বিএনপির কে? সে কি দল করেছে? যারা আন্দোলনে ছিল, ১৭ বছর দলের হয়ে আমরা খেটেছি। জেরিন রনি বলেন, বগুড়ার রাজপথে, ঢাকার রাজপথে ছিলাম। ১৭ বার জেলে গিয়েছি। মহিলাদের মধ্যে সর্বোচ্চ মামলা খেয়েছি। কনকচাঁপা এতদিন কোথায় ছিল? আমাদেরকে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে কেন? কনকচাঁপা কে? আমরা সুবিধাবাদীদের দেখতে চাই না। রাজপথে যারা লড়াই সংগ্রাম করেছে আমরা তাদের চাই। কনকচাঁপা কয়টা মামলা খেয়েছে? কয়টা লড়াই সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছে?

উল্লেখ্য, বিএনপি এবার সংরক্ষিত আসনের মনোনয়নে বিগত আন্দোলনে ত্যাগী ও যোগ্য নেত্রীদের অগ্রাধিকার দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কনকচাঁপা এর আগেও ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন।