নিউ ইয়র্কে বাংলাদেশী যুবককে গুলির মুহূর্তের নাটকীয় ভিডিও পুলিশের
Printed Edition
আবু সাবেত, নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি
নিউ ইয়র্ক পুলিশের বডি-ক্যামেরার ফুটেজ দেখলেই বেড়ে যাবে হৃদস্পন্দন। গত সপ্তাহে কুইন্সের একটি বাড়ির ভেতরে ছুরি হাতে থাকা মানসিকভাবে অসুস্থ ২২ বছর বয়সী বাংলাদেশী এক যুবককে নিউ ইয়র্ক পুলিশের এক কর্মকর্তা গুলি করে আহত করেন।
গত ২৬ জানুয়ারি সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত বাংলাদেশী যুবক জাবেজ চক্রবর্তীকে গুলি করার ঘটনায় তার পরিবার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে এবং এর ফলে মেয়র মামদানির প্রস্তাবিত ‘ডিপার্টমেন্ট অব কমিউনিটি সেফটি’র মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য সঙ্কট মোকাবিলার দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে।
গত মঙ্গলবার নিউ ইয়র্ক পুলিশ প্রকাশিত এই ভিডিও ক্লিপটি শুরু হয় অভিযুক্তের এক নারী আত্মীয়ের করা ৯১১ কল দিয়ে। তিনি চক্রবর্তীর জন্য ‘ইনভলান্টারি ট্রান্সপোর্টেশন’ (জোরপূর্বক হাসপাতালে নেয়া) অনুরোধ করেন এবং জানান, তিনি দেয়ালের দিকে কাচ ছুঁড়ে মারছিলেন।
পরিবারের ওই সদস্য শুরুতে শুধু ইএমএস (জরুরি চিকিৎসা সেবা) চেয়েছিলেন, পুলিশ নয়। তিনি আগের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন, যেখানে কর্মকর্তারা চক্রবর্তীর ব্যাপারে সাড়া দিয়েছিলেন এবং তখন তাকে বলা হয়েছিল পুলিশ নয়, অ্যাম্বুলেন্স ডাকাই উচিত ছিল। কর্মকর্তারা চক্রবর্তীকে ‘মানসিক সমস্যার ইতিহাস রয়েছে’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
তিনি বলেন, গতবার এমন কিছু হলে আমরা পুলিশ ডেকেছিলাম, আর তারা বলেছিল আমাদের অ্যাম্বুলেন্স ডাকা উচিত ছিল।’ কিন্তু অপারেটর জানান, সাধারণত এ ধরনের ঘটনায় ‘উভয় পক্ষ’ অর্থাৎ নিউ ইয়র্ক পুলিশ ও নিউ ইয়র্ক দমকল বাহিনী সাড়া দেয়। এরপর ফুটেজে দেখা যায়, দুই পুলিশ কর্মকর্তা যাদের একজন টাইরি হোয়াইট ব্রায়ারউড এলাকার পারসন্স বুলেভার্ড ও ৮৫তম অ্যাভিনিউয়ের কাছে বাড়ির দরজায় এসে কড়া নাড়েন এবং কিছুটা পিছিয়ে যান।
হোয়াইটকে বলতে শোনা যায়, ভিডিও দেখা শুরু করার পর থেকে আমি আর দরজার কাছে দাঁড়াই না।
দ্বিতীয় কর্মকর্তা জবাব দেন, হ্যাঁ, কখন কী হয় বলা যায় না, তাই তো?
এক নারী দরজা খুললে ইউনিফর্ম পরা পুলিশরা তাকে অনুসরণ করে বসার ঘরে ঢোকেন। ঠিক তখনই চক্রবর্তী রান্নাঘর থেকে একটি ছুরি তুলে নেন এবং হোয়াইটের দিকে এগিয়ে আসতে থাকেন।
এক নারী আত্মীয় তার সামনে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে তাকে আটকানোর চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি ছুরি হাতে এগিয়ে যেতে থাকেন। হোয়াইটকে বারবার চিৎকার করতে শোনা যায়, ‘ছুরিটা নামাও! ছুরিটা ফেলে দাও’।
ফুটেজে দেখা যায়, হোয়াইট ভেস্টিবিউলে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেন যাতে চক্রবর্তী তার দিকে এগোতে না পারেন। কিন্তু চক্রবর্তী দরজা ঠেলে আবারো ছুরি হাতে হোয়াইটের দিকে এগিয়ে আসেন।
ঠিক তখনই হোয়াইট গুলি চালান এবং চক্রবর্তী চারবার গুলিবিদ্ধ হন। পরিবারের সদস্যরা চিৎকার ও কান্না করতে থাকেন। চক্রবর্তীকে জামাইকা হাসপাতাল মেডিক্যাল সেন্টারে নেয়া হয়, যেখানে তাকে স্থিতিশীল অবস্থায় রাখা হয়েছে বলে জানানো হয়।
পুলিশ বেনেভোলেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্যাট্রিক হেন্ড্রি এক বিবৃতিতে বলেন, ঘটনার সাথে জড়িত কর্মকর্তারা ‘ভয়াবহ পরিস্থিতিতেও পেশাদারিত্ব ও সংযমের সাথে তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ইউনিয়ন প্রধান বলেন, ভিডিওটি স্পষ্টভাবে দেখায় যে এই পুলিশ কর্মকর্তারা এক অনিশ্চিত, দ্রুত পরিবর্তনশীল ও বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে পড়েছিলেন। কাজ করার আগে পরিস্থিতি শান্ত করার মতো তাদের কোনো সময় বা সুযোগ ছিল না।’
তবে আহত যুবকের পরিবার পুলিশের প্রতিক্রিয়ার তীব্র সমালোচনা করে। বুধবার দেয়া এক বিবৃতিতে তারা দাবি করেন, কর্মকর্তারা ‘অপ্রয়োজনীয়ভাবে এবং খুব দ্রুত পরিস্থিতিকে আরো উত্তপ্ত করে তুলেছেন। তারা বলেন,পরিস্থিতি শান্ত করার পরিবর্তে ওই কর্মকর্তা বরং বন্দুক বের করে জাবেজের দিকে চিৎকার করে নির্দেশ দিয়ে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করেছেন।
পরিবার আরো জানায়, নিউ ইয়র্ক পুলিশ আসার এক মিনিটের মধ্যেই জাবেজকে একাধিকবার গুলি করা হয় এবং সে প্রায় মারা যাচ্ছিল, অথচ কয়েক মিনিট আগেও সে শান্তভাবে খাবার খাচ্ছিল। এ কারণেই চিকিৎসা সহায়তার ফোন কলে পুলিশের সাড়া দেয়া উচিত নয়।’ পরিবার কুইন্স জেলা অ্যাটর্নির দফতরের কাছে তাদের ছেলের বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানায়।
এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়ায় নিউ ইয়র্ক পুলিশের এক মুখপাত্র বুধবার বলেন, ৯১১ নম্বরে ফোন করা ব্যক্তি জোরপূর্বক হাসপাতালে নেয়ার অনুরোধ করেছিলেন। ইএমএস কাউকে জোর করে স্থানান্তর করতে পারে না, তাই সেখানে নিউ ইয়র্ক পুলিশের উপস্থিতি জরুরি ছিল।
মঙ্গলবার মামদানি বলেন, তিনি মনে করেন না চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ আনা উচিত। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পুলিশের বডি-ক্যামেরার ফুটেজ দেখলে আমার কাছে স্পষ্ট হয় যে জাবেজের প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা, কোনো জেলা অ্যাটর্নির মাধ্যমে ফৌজদারি মামলা নয়। তিনি যুক্তি দেন, চক্রবর্তীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাটি একটি ভিন্ন ধরনের মানসিক স্বাস্থ্যভিত্তিক প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থার জরুরি প্রয়োজনকে সামনে এনেছে। তিনি বলেন, এই কারণেই আমি ‘ডিপার্টমেন্ট অব কমিউনিটি সেফটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছি, যাতে প্রতিরোধমূলক, ধারাবাহিক যতœ এবং বাস্তব সঙ্কট মোকাবিলার ওপর ভিত্তি করে একটি মানসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তৈরি করা যায়, যাতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে পুলিশকে আর একা সব সামলাতে না হয়।